ফেনীর পরশুরাম সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে নিহত ইয়াছিন হোসেন লিটন (৪০) ও জাকির হোসেন মিল্লাতের (২১) মৃত্যুর এক বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে স্বজন হারানোর বেদনা এতটুকুও ম্লান হয়নি। পাশাপাশি দুটি কবরের সামনে দাঁড়িয়ে আজও অশ্রু ঝরে পরিবারের সদস্যদের। জীবিকার সন্ধানে সীমান্তে যাওয়া লিটন ও মিল্লাতের মৃত্যু শুধু দুটি প্রাণই কেড়ে নেয়নি, অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে তাদের পরিবারের সদস্যদেরও। প্রিয়জন হারানোর শোক আর অভাব-অনটনের বাস্তবতায় পরিবার দুটির সবার জীবন যেন এখনো থমকে আছে সেই রাতে।
গত বছরের ২৪ জুলাই রাতে পরশুরাম উপজেলার বাসপদুয়া সীমান্তে মাছ ধরতে গিয়ে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন একই গ্রামের ইয়াছিন হোসেন লিটন ও জাকির হোসেন মিল্লাত। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পথে মিল্লাত মারা যান। আর লিটনের মরদেহ নিয়ে যায় বিএসএফ। পরদিন ২৫ জুলাই রাতে বিলোনিয়া ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে লিটনের মরদেহ বাংলাদেশে ফেরত দেয় বিএসএফ।
নিহত মিল্লাত ছিলেন বাসপদুয়া গ্রামের মোহাম্মদ ইউসুফের ছেলে। আর লিটন ছিলেন একই গ্রামের গাছি মিয়ার ছেলে। যেখানে তাদের গুলি করা হয়েছিল, সেখান থেকে অল্প দূরের বাসপদুয়া উত্তরপাড়া কবরস্থানে পাশাপাশি দুটি কবরে তাদের দাফন করা হয়। এক বছর পরও সেই জোড়া কবর যেন দুই পরিবারের শোকের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। প্রায়ই সেখানে যান স্বজনরা। কেউ দোয়া করেন, কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন, আবার কেউ অশ্রুসিক্ত চোখে ফিরে আসেন।
লিটন বাসপদুয়া উত্তরপাড়ায় আজিজুর নেছার মাটির ঘরে কেয়ারটেকার হিসেবে পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। সংসারে ছিলেন স্ত্রী, তিন মেয়ে ও এক ছেলে। তার মধ্যে বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন। পরিবারের মুখে স্বচ্ছলতার হাসি ফোটানোর আগেই সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে থেমে যায় তার জীবন। নিজের কোনো ঘর-ভিটাও ছিল না। স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের নিয়ে চরম অর্থকষ্টে পড়েন স্ত্রী আনোয়ারা বেগম। শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নিতে হয় বাবার বাড়িতে। একই উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের মধ্যম মনিপুর গ্রামের মৃত মফিজুর রহমানের মেয়ে আনোয়ারার বাবাও আর বেঁচে নেই। ভাই বাদশা মিয়া টমটম চালিয়ে বোন ও তার সন্তানদের সহযোগিতার চেষ্টা করেন। আর আনোয়ারা মানুষের বাড়িতে কাজ করে কোনোমতে সংসারের খরচ চালিয়ে নিচ্ছেন।
লিটনের প্রতিবেশী মনোয়ারা বেগম বলেন, লিটন মারা যাওয়ার পর ছেলে-মেয়েদের নিয়ে তার স্ত্রী এখানে খুব কষ্টে ছিল। খাওয়া-দাওয়ার অভাবে শেষ পর্যন্ত বাবার বাড়ি চলে গেছে। এখন সেখানে মানুষের বাড়িতে কাজ করে ছেলে-মেয়েদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে।
লিটনের ভাবি হাসিনা আক্তার বলেন, মাঝেমধ্যে তার স্ত্রী ছেলে-মেয়েদের নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসে।স্বামীর কবর দেখে যায়। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর নীরবে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যায়।
একই গ্রামের আরেকটি পরিবারও বয়ে বেড়াচ্ছে সেই রাতের বিভীষিকা। পরিবারের মেজো ছেলে জাকির হোসেন মিল্লাত অল্প বয়সেই বাবার পাশে দাঁড়িয়ে সংসারের হাল ধরেছিলেন। বিয়ে করে নতুন সংসার গড়ার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে সেই স্বপ্ন থেমে যায়।
মিল্লাতের বাড়িতে গিয়ে কথা বলতে চাইলে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা মোহাম্মদ ইউসুফ। তিনি বলেন, ছেলেকে খুব মনে পড়ে। ভুলতে পারি না। প্রতিদিন কবরের পাশে গিয়ে তাকে দেখে আসি।
কথা বলতে বলতেই প্রতিবেদকের হাত ধরে বাসপদুয়া উত্তরপাড়া কবরস্থানে নিয়ে যান তিনি। পাশাপাশি দুটি কবর দেখিয়ে বলেন, এখানেই আমার মিল্লাত, পাশে লিটন। দুইজনকে একসঙ্গে হারানোর কষ্ট গ্রামের মানুষও ভুলতে পারেনি।
মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, মিল্লাত মারা যাওয়ার পর কোনো ধরনের সহযোগিতা পাইনি। কাজ পেলে করি, না হলে বসে থাকি। ছোট ছেলে নুরুন্নবী পারভেজ শারীরিকভাবে অসুস্থ। সংসার চালাতে এখন খুব কষ্ট হচ্ছে।
মিল্লাতের মা পারভিন আক্তার বলেন, সেদিন রাতে মাছ ধরতে গিয়েছিল। গুলি করার পর হাসপাতালে নেওয়ার পথে ‘মা, মা’ বলতে বলতে আমার ছেলেটা চোখের সামনে মারা যায়। সেই দৃশ্য কোনো দিন ভুলতে পারব না।
স্থানীয় বাসিন্দা জয়নাল আবেদিন বলেন, লিটন গাড়ি চালানোর পাশাপাশি টিউবওয়েল মেরামতের কাজ করে সংসার চালাত। এক রাতে লিটন ও মিল্লাতকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এলাকাবাসীর সহযোগিতায় লিটনের এক মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুটি পরিবারকে দেখার এখন কেউ নেই।
অন্যদিকে এ ঘটনার পর সীমান্ত হত্যা বন্ধ, নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই দাবিগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ স্বজনদের।
তারেক চৌধুরী/আরকে
