বিজ্ঞাপন

ড্রেজিং প্রকল্পের বালু লুট, গাইবান্ধায় ঝুঁকিতে কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব

ড্রেজিং প্রকল্পের বালু লুট, গাইবান্ধায় ঝুঁকিতে কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব

গাইবান্ধার সাঘাটা ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় বাঙালী নদীর ড্রেজিং প্রকল্প থেকে উত্তোলিত বিপুল পরিমাণ বালু নিলাম না হওয়ায় তা এখন লুটের শিকার হচ্ছে। এতে সরকার হারাচ্ছে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব। 

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, জেলা মাটি/বালি নিলাম কমিটির দীর্ঘসূত্রতা, গাফিলতি ও কার্যকর তদারকির অভাবেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সাত সদস্য বিশিষ্ট এ কমিটির আহ্বায়ক জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও সদস্য সচিব পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ‘বাঙালী-করতোয়া-ফুলজোর-হুরাসাগর নদীর সিস্টেম ড্রেজিং/ পুন:খননসহ তীর সংরক্ষণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও গাইবান্ধায় ২১৭ কিলোমিটার নদী খনন কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৯ সালে। যা অর্পিত ক্রয়কার্য খনন কাজ পরিচালনা করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। ওই ২১৭ কিলোমিটারের মধ্যে গাইবান্ধার সাঘাটা ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় বাঙালী নদীর ২৪ কিলোমিটার ড্রেজিং সম্পন্ন হয়। পরে ড্রেজিংকৃত বালু নদীর তীরবর্তী ও দূরবর্তী এলাকায় ডাইকের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হয় এবং তা পর্যায়ক্রমে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করে সেনাবাহিনী সংশ্লিষ্ট বিভাগ। 

পরবর্তীতে নদী ড্রেজিংয়ে উত্তেলিত নিলাম যোগ্য এসব মাটি/বালু/বালুর মূল্য ও পরিমাণ নির্ধারণ এবং নিলাম কার্যক্রম (দরপত্র প্রস্তুত, দরপত্র আহ্বান, দরপত্র ঊম্মুক্তকরণ ও মূল্যায়ন) পরিচালনার জন্য ডব্লিউ-৬/৯২৩/১(৬৬) নং স্মারকে ২০২৩ সালের ৩ এপ্রিল ৫ সদস্য এবং পরে একই বছরের ১৭ আগস্ট জেলার পানি সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক এই কমিটি পুন:গঠন করে ৭ সদস্যের কমিটিতে রুপান্তর করা হয়।

যার আহ্বায়ক গাইবান্ধার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব এবং সদস্য সচিব গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী। এছাড়া কমিটিতে নির্বাহী প্রকৌশলী সড়ক ও জনপদ, এলজিইডি,  সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন বিগ্রেড কর্তৃক মনোনিত একজন সদস্য এবং দুই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা রয়েছেন।

পরে এই নিলাম কমিটি ৯০৯ নম্বর স্মারকে প্রথম ২০২৩ সালের ১৭ জুলাই থেকে সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২২ মে পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে নিলাম কার্যক্রম পরিচালনা করে। এতে সরকারের উল্লেখযোগ্য অর্থ রাজস্ব অর্জন হয়।

সূত্র জানায়, সর্বশেষ রাজস্ব শাখার ৬৩৮ নম্বর স্মারকে আহ্বান করা নিলাম বিজ্ঞপ্তির ১৫টি প্যাকেজের মধ্যে অবশিষ্ট থাকা ৯টি প্যাকেজ এবং এর সঙ্গে সেনাবাহিনী হস্তান্তর করা আরও তিনটিসহ মোট ১২টি প্যাকেজ ২০২৫ সালের ২২ মে তারিখের পরে আর নিলাম প্রক্রিয়ায় যায়নি।

অভিযোগ রয়েছে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রাজস্ব শাখার বর্তমান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আল মামুনের ক্ষমতার অপব্যবহারের বলি এসব লুট হওয়া বালু।

নাম-পরিচয় গোপন রাখার শর্তে মাটি/বালি নিলাম সংশিষ্ট অপর একটি সূত্র ঢাকা পোস্টকে জানায়, পাউবো থেকে কয়েক দফায় নিলাম বিষয়ে এডিসি রাজস্বের সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বিষয়টাতে তার সম্মতি নেই। এমনকি সচিব পর্যায়ের রেফারেন্স অবগত করা হলেও তিনি ধমকিয়ে সব রাখতে বলেছেন।

এ কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি নিয়ে গত ৩১ মার্চ ডিসি স্যার সরাসরি নির্বাহী প্রকৌশলীকে ফোন করে বালুর খোঁজ-খবর নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। পরদিনই ডাইকগুলোর খোঁজ নিয়ে এডিসির কাছে যাওয়া হয় কিন্তু তিনি পাত্তাই দেননি। ফলে নিলাম প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাচ্ছে না।

সম্প্রতি সরেজমিনে এসব বালুর ডাইক এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সাঘাটার দোহাইল-১ ও দোহাইল-২ এর সম্পূর্ণ বালু লুট করে নেওয়া হয়েছে। বালুর ডাইকের সেখানে কোনো চিহ্নই নেই। আংশিক লুট বা চুরি করা হয়েছে দাঙাবাড়ি ও কিংকরপুর ডাইকের বালু। অপরদিকে, সাঘাটার পাকুরতলা, কিংকর ও গোবিন্দগঞ্জের পারসোনাইডাঙা ডাইক নদী তীরবর্তী হওয়া ডাইকের অনেক বালু নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

এছাড়া কিছু ডাইকে ইতোমধ্যে গাছ লাগানো, ঘাস জন্মানো এমনকি জমির মালিকানার দাবি করে দখলের চেষ্টা চলছে। এতে করে সরকারি সম্পদ ব্যক্তি মালিকানায় চলে যাওয়ারও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, পুরোপুরি লুট হওয়া দুইটি ডাইকসহ অন্যান্য ডাইক থেকে চুরি এবং নদীতে বিলীনসহ অন্তত থেকে ১০ থেকে ১২ লাখ ঘনফুট বালু ক্ষতি হয়ে গেছে, যার বাজারমূল্য কমপক্ষে ৩০ লাখ টাকারও বেশি। এছাড়া অতিবৃষ্টির কারণে অনেক বালু নদীতে ভেসে যাচ্ছে, যা সরাসরি রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়।

ইতোপূর্বে এসব বালু নিলাম প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট গাইবান্ধা পাউবোর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) ওয়ালিদ আরশাদ রিওন বলেন, অবশিষ্ট ডাইকগুলোর কয়েক দফায় পুনরায় নিলাম করা হয়েছিল। কিন্তু ডাইকগুলো নদীর তীরবর্তী ও দূরবর্তী হওয়া এবং পরিবহনে সহজ যোগাযোগ না থাকায় নিলামে তেমন আগ্রহ না থাকায় সেগুলো অবিক্রিত থেকে যায়। আমরা আবারও নিলামের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।

তবে, স্থানীয়রা বলছেন, বর্তমানে পরিস্থিতি পাল্টেছে। নিকটবর্তী ডাইকের বালু শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন এসব অবিক্রিত ডাইকের বালুর চাহিদা বেড়েছে। তবে আশ্চর্যের বিষয়, গত ১ বছর বেশি সময় ধরে এই ডাইকগুলো নিলামের কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে রাতের আঁধারে এবং দিনের আলোতেও চুরি ও লুটপাটের শিকার হয়েছে এসব সরকারি বালু। যেন এসব সম্পদ রক্ষা বা দেখার কেউই নেই।

স্থানীয়দের দাবি, নিলাম প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় একটি সিন্ডিকেট সুযোগ নিয়ে দিনে-রাতে বালু লুট করছে। সরকারি সম্পদ কিভাবে লুট হতে পারে, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সঙ্গে তাদের যোগসাজস আছে কি-না বা প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে আগেই বিপুল পরিমাণ বালু সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কি-না তাও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

ড্রেজিং করা এসব বালু চুক্তি করে রাখা জমির মালিক ও স্থানীয় কৃষক মোনারুল ইসলাম বলেন, দিনে-রাতে এসব বালু কাকড়ায় (ট্রাক্টর) করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিভাবে নিয়ে গেছে আমরা জানি না। এসময় তাদের (লুটকারীদের) নাম-পরিচয় বলতে রাজি হননি এই কৃষক।

নিলাম কমিটির সদস্য গাইবান্ধা স্থানীয় সরকার বিভাগের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বলেন, এ ব্যাপারে আমার কিছুই জানা নেই, আমি গত বছরের নভেম্বরে যোগদান করি। এরপর এ সংক্রান্ত কোনো মিটিং হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। এসময় তিনি বলেন, তবুও যদি কমিটির গাফিলতির কারণে সরকারি সম্পদ লুট হয়ে থাকে তাহলে তো আমরাই দায়ী থাকব। আর যদি অন্য কোনো কারণে হয়ে থাকে সেটিরও সচ্ছতা থাকা উচিত।

নতুন যোগদানের একই কথা জানিয়ে কমিটির আরেক সদস্য সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল কবীর বলেন, এ সংক্রান্ত কোনো মিটিং হলে অথবা কোনো নির্দেশনা থাকলে সিদ্ধান্ত মোতাবেক কাজ করা হবে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিলাম কমিটির সদস্য সচিব ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে দ্রুতই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এতো দিনেও কেন নেওয়া যায়নি? এমন প্রশ্নে তিনি সঠিক উত্তর না দিয়ে দ্রুতই ব্যবস্থা নেওয়ার কথাই জানান।

এসব বিষয়ে কমিটির আহ্বায়ক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আল মামুনকে রোববার বিকেল সোয়া ৩টার দিকে ফোন করা হলে প্রকল্পের নাম শুনেই গুরুত্বপূর্ণ জুম মিটিংয়ে থাকার কথা বলে ফোন কেটে দেন। পরে কার্যালয়ে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ একাধিকবার ফোন, ক্ষুদেবার্তা এবং হোয়াটসআ্যপে ম্যাসেজ করলেও তিনি কোনো উত্তর করেননি। 

গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনের এমপি আব্দুল ওয়ারেস বলেন, সরকারি সম্পদ লুটপাট অবশ্যই সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের উদাসিনতা। এসব খতিয়ে দেখা দরকার।

গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লা ঢাকা পোস্টকে বলেন, সরকারি সম্পদ লুটপাট বা চুরি হওয়ার ঘটনায় যাদেরই দায়িত্বে অবহেলা পাওয়া যাবে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসময় এতদিনও কেন নিলাম হলো না, দায়ী কারা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।

মাসুম বিল্লাহ/আরকে

বিজ্ঞাপন