বিজ্ঞাপন

লাশের সঙ্গে পড়ে থাকা সেই মিঠু, এক চোখেই লড়াই করছেন জীবনযুদ্ধে

লাশের সঙ্গে পড়ে থাকা সেই মিঠু, এক চোখেই লড়াই করছেন জীবনযুদ্ধে

প্রতিদিন সকালে কাজে বের হওয়ার আগে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে তিন ধরনের ড্রপ নিতে হয় আব্দুল্লাহ আল বাকি মিঠুকে। ওষুধ দেওয়া শেষ না হলে বাইরে বের হওয়ার সাহস পান না। একদিন ড্রপ দিতে ভুল হলেই শুরু হয় অসহনীয় যন্ত্রণা। চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরে, রোদের দিকে তাকাতে পারেন না, এমনকি ভালো থাকা ডান চোখেও ঝাপসা দেখতে শুরু করেন। তারপরও জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন কর্মস্থলে ছুটে যান।

নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার হাটগোবিন্দপুর গ্রামের যুবক আব্দুল্লাহ আল বাকি মিঠুর (৩৪)। দুই বছর আগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেশের জন্য এক চোখের দৃষ্টি হারিয়ে এমন সংকটাপন্ন অবস্থায় উদ্ধার হয়েছিলেন যে, তাকে মৃত ভেবে হাসপাতালে লাশের সঙ্গে ফেলে রাখা হয়েছিল। 

অভ্যুত্থানে তার এক চোখের আলো চিরতরে নিভে গেলেও থেমে থাকেননি তিনি। আবার ফিরেছেন সিরাজগঞ্জের বেতিল বাসস্ট্যান্ড এলাকার ড্যাফোডিল স্পেশালাইজড হাসপাতালে। যেখানে আন্দোলনের আগে সিটিস্ক্যান অপারেটর হিসেবে তিনি কর্মরত ছিলেন। এখন এক চোখের দৃষ্টির ওপর ভর করেই সেই পুরোনো দায়িত্ব পালন করছেন।

মিঠু জানান, মুখ ও বাম চোখের ভেতরে এখনো একাধিক ছররা গুলি রয়ে গেছে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিদিন নিয়ম করে তিন ধরনের চোখের ড্রপ ব্যবহার করতে হয়। একদিন ওষুধ না দিলেই চোখে তীব্র ব্যথা শুরু হয়। অনেক সময় ডান চোখেও ঝাপসা দেখতে পান। রোদে বের হওয়াও কষ্টকর হয়ে পড়ে। তবু পরিবার ও নিজের দায়িত্বের কথা ভেবে নিয়মিত কাজে যোগ দিচ্ছেন।

তিনি বলেন, দেশের আলো ফেরাতে গিয়ে একটা চোখের আলো হারিয়েছি। কিন্তু জীবন তো থেমে থাকে না। কষ্ট হয়, তবুও জীবনের প্রয়োজনে কাজে ফিরেছি।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় পুরো সংসারের দায়িত্ব এখনও মিঠুর কাঁধে। তার বাবা আব্দুল খালেক ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে আক্রান্ত। হার্টে রিং পরানো হয়েছে। শারীরিক অবস্থার কারণে তিনি কোনো কাজ করতে পারেন না। মা জুলেখা খাতুনও বিভিন্ন রোগে ভুগছেন।

মিঠুর বাবা আব্দুল খালেক বলেন, অনেক চিকিৎসার পরেও ছেলের চোখের অবস্থা আগের মতো হয়নি। নিয়মিত ওষুধ ব্যবহার করতে হয়। এক চোখে কাজ করলেও সংসারের দায়িত্ব পালন করছে। সরকারও অনেক ভাবে সহযোগিতা করছে। নিয়মিত ভাতা দেয়। তবে, চোখের দৃষ্টি তো অমূল্য। 

মা জুলেখা খাতুন বলেন, ঘটনার পর থেকে ছেলেকে নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এক চোখে দেখতে পায়না, অন্য চোখেও সমস্যা রয়েছে। তারপরও পরিবারের কথা চিন্তা করে চাকরি করছে। ওর সুস্থতা আর স্বাভাবিক জীবনটাই আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া।

দুই বছর পর পেছনে ফিরে তাকিয়ে মিঠুর কণ্ঠে যেমন আক্ষেপ, তেমনি রয়েছে প্রাপ্তির অনুভূতি। তিনি মনে করেন, তাদের আত্মত্যাগের কারণেই স্বৈরাচার সরকার দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। নিজের চোখের দৃষ্টি হারানোর কষ্ট থাকলেও দেশের পরিবর্তন দেখতে পেরে তিনি স্বস্তি খুঁজে পান।

মিঠু বলেন, চোখের আলো হারিয়েছি, কিন্তু দেশের মানুষ নতুন আলো পেয়েছে। এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। সরকার আহত ও নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। আশা করি, যারা জীবন দিয়েছে কিংবা আহত হয়েছে, সবাই একসময় যথাযথ মর্যাদা ও পুনর্বাসন পাবে।

দুই বছর আগের সেই ভয়াবহ দিনের কথা মনে পড়লেই এখনো শিউরে ওঠেন তিনি। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সিরাজগঞ্জের বেলকুচি থানার কেজির মোড়ে আন্দোলনে যোগ দিতে গিয়ে ছররা গুলিতে গুরুতর আহত হন মিঠু। শরীরের বিভিন্নস্থানে তার গুলি লাগে। স্থানীয়রা উদ্ধার করে তাকে সিরাজগঞ্জের খাজা ইউনুস আলী হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তার অবস্থা এতটাই সংকটাপন্ন ছিল যে, মৃত ভেবে লাশের পাশে ফেলে রাখা হয়েছিল। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে নিজেই চিৎকার করে জানান, তিনি বেঁচে আছেন। এরপর চিকিৎসকেরা তার চিকিৎসা শুরু করেন।

প্রথমে শরীরের বিভিন্নস্থান থেকে কিছু ছররা গুলি বের করা হলেও চোখ, মুখ ও কপালে আটকে থাকা গুলিগুলো রয়ে যায়। পরদিন তাকে ঢাকার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নেওয়া হয়। কয়েক দফা অস্ত্রোপচারেও আশানুরূপ ফল না পাওয়ায় পরে সরকারের সহায়তায় উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় সিঙ্গাপুরে। সেখানে চোখ ও মুখে থাকা আটটি ছররা গুলির মধ্যে চারটি বের করা সম্ভব হলেও মুখ ও বাম চোখের ভেতরে থাকা কয়েকটি গুলি এখনো শরীরেই রয়ে গেছে। চিকিৎসকদের মতে, সেগুলো আর অপসারণ করা সম্ভব নয়। গুলির আঘাতে বাম চোখের দৃষ্টি স্থায়ীভাবে হারিয়েছেন তিনি।

একসময় যে যুবক সুস্থ দুটি চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতেন, আজ তিনি একটি চোখের দৃষ্টি হারিয়ে জীবনকে নতুনভাবে দেখতে শিখেছেন। রাষ্ট্র বদলেছে, সময় বদলেছে, কিন্তু তার শরীরের ক্ষত, পরিবারের সংগ্রাম আর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি।

আশিকুর রহমান/আরকে