পাবনা শহরের আব্দুল হামিদ রোডের শহীদ চত্বরে সেই ৪ আগস্টের রক্তের দাগ যেন এখনও শুকায়নি। এখনও ছেলে হারানোর আর্তনাদ করছেন বাবা-মায়েরা। এখনও ঘর থেকে বের হওয়া সেই সন্তানের অপেক্ষায় প্রহর গোনেন তারা। সন্তান না ফিরলেও ফিরেছে ছেলে হত্যার সেসব আসামি ও কুশীলবরা। এখন গোটা পাবনা শহরে তাদের পদচারণা। আসামিদের অনেকেই এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে, আর এ বিষয়ে পুলিশও স্পষ্ট তথ্য দিতে অনীহা দেখাচ্ছে।
ছেলে হারোনোর এসব বেদনার কথা বলছিলেন ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে পাবনার আব্দুল হামিদ রোডের ট্রাফিক মোড়ে (বর্তমানে শহীদ চত্বর) নিহত দুই শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম (১৯) এবং মাহবুবুল হোসেন নিলয়ের (১৬) বাবা-মায়ের। হত্যাকাণ্ডের দুই বছরে পেরিয়ে গেছে, কবে মিলবে ছেলে হত্যার বিচার সেই আশায় বুক বেঁধে আছেন তারা।
বাবা-মায়ের নিষেধ সত্ত্বেও ২০২৪ এর ৪ আগস্ট জাহিদুল ইসলাম এবং মাহবুবুল হোসেন নিলয় যোগ দিয়েছিলেন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের সামনে থেকে বেলা ১১টার দিকে হাজারো ছাত্র-জনতার মিছিল এসে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নেন ট্রাফিক মোড়ে। দুপুর পর্যন্ত স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা পাবনা শহর। তখনও শান্তিপূর্ণ অবস্থান ছিল ছাত্র-জনতার মাঝে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি রূপ নেয় রক্তাক্ত ময়দানে। উত্তরপাশ থেকে সহযোগীদের নিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর এলোপাথারি গুলি বর্ষণ করেন পাবনা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ভাড়ারা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবু সাঈদ খান। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন জাহিদ এবং নিলয়। আহত হোন অসংখ্য মানুষ।
সরকার পতনের পর নিহত জাহিদুল ইসলামের বাবা দুলাল উদ্দিন বাদী হয়ে পাবনা সদর থানায় উপজেলার ভাঁড়ারা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাইদকে প্রধান আসামি এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পাবনা-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্স, সাবেক সদর উপজেলার চেয়ারম্যান আলহাজ মোশারোফ হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক প্রচার সম্পাদক কামিল হোসেনসহ ১০৩ জনের নাম উল্লেখ্য করে অজ্ঞাতনামা অনেকের নামে হত্যা মামলা করেন। তদন্ত শেষে আওয়ামী লীগের ১৩৬ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ। মামলার বিচারিক কার্যক্রম এগোলেও অধিকাংশ অভিযুক্তের বর্তমান অবস্থান, কতজন গ্রেপ্তার, কতজন কারাগারে এবং কতজন জামিনে রয়েছেন এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে স্পষ্ট চিত্র মিলছে না। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
আসামিদের গ্রেপ্তারের সংখ্যা, কারাবন্দি ও জামিনপ্রাপ্তদের সংখ্যা নিয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পাবনা সদর থানার পরিদর্শক সঞ্জয় কুমার বলেন, আমি এগুলো জানি না। কোর্ট বিষয়গুলো জানে। তবে ৩৫ জনের মতো গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
বর্তমান তদন্তকারী সংস্থা পাবনা জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওসি রাশেদুল ইসলামের সঙ্গে বার বার যোগাযোগ করেও তিনি তথ্য দিতে পারেননি। তিনি বলেন, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এটি বলতে পারবে আমার জানা নেই।
পাবনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট গোলাম সরোওয়ার খান জুয়েল বলেন, পাবনায় শুধু হত্যা মামলাটার চার্জশিট হয়েছে বাকিগুলোর হয় নাই। বাদ বাকি পাঁচটি বৈষম্য বিরোধী মামলার শুধু আমিনপুরেরটার চার্জশিট হয়েছে। আর বাকিগুলোর চার্জশিট হয়নি।
জাহিদুল ইসলামের বাবা বলেন, আমার তিন ছেলে এক সঙ্গে আন্দোলনে যেত। আমি নিষেধ করার সত্ত্বেও তারা প্রতিনিয়ত আন্দোলনে যুক্ত হতো। ৪ আগস্টের সকালবেলাও বলেছিলাম আজ আন্দোলনে যেতে হবে না, তবুও তারা তিনজন আন্দোলনে যায়। দুপুরের দিকে অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন আসে এবং অপর পাশ থেকে বলেন, আপনি কি জাহিদের বাবা জাহিদ তো মারা গিয়েছে।
হত্যা মামলা সম্পর্কে তিনি বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তীতে আমি বাদী হয়ে ১০৩ জনের নাম উল্লেখ করে এজাহার দায়ের করি। তবে এখন পর্যন্ত মামলার কোনো অগ্রগতি দেখছি না।
আসামি পক্ষ থেকে হুমকি পাচ্ছেন দাবি করে তিনি আরও বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে এখনো কোনো পদক্ষেপ দেখছি না, সেক্ষেত্রে আমি বাদী হওয়াটাই এখন ঝুঁকিপূর্ণ। আসামিদের পক্ষ হয়ে বিভিন্ন মহল আমাদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন করছে। বাকি ছেলেমেয়েদের নিয়ে এখন আমার চিন্তা হয় তাদের ভবিষ্যৎ কি। আসামিদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে আমাদের মত সন্তানহারা বাবা-মায়ের আত্মা শান্ত করার আহ্বান সরকারের কাছে।
জাহিদের ভাই তৌহিদুল ইসলাম বলেন, জাহিদের সঙ্গে আমিও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করেছি। তবে দুঃখের বিষয় আন্দোলনে গিয়ে আমার ভাই শহীদ হয়েছেন। এখন পর্যন্ত কিছু আসামি গ্রেপ্তার করা হলেও তাদের জামিন হয়ে গিয়েছে। সেক্ষেত্রে আমরা যারা শহীদ পরিবার এবং আহতরা আছি তাদের বিভিন্ন ভয়-ভীতি মধ্যে চলতে হচ্ছে। রাষ্ট্রের কাছে আমাদের এতটুকুই চাওয়া যেন সঠিক দোষীদের উপযুক্ত বিচার করা হয়।
জাহিদের প্রতিবেশী সহযোদ্ধা মেহেদী হাসান বলেন, আমাদের একই এলাকায় বাড়ি। একসঙ্গেই প্রতিদিন ছয় থেকে সাত জন আন্দোলনে যেতাম। ৪ আগস্ট এর দিনও আমরা একসঙ্গেই বাড়ি থেকে বের হই, তবে সবাই সুস্থভাবে বাড়ি ফিরলেও আমার ভাই জাহিদ ফিরতে পারেনি। ঘাতক কুলাঙ্গার
সাঈদের গুলিতে সে শহীদ হয়েছেন। আমরা এর উপযুক্ত বিচার চাই।
অপরদিকে মাহাবুবুল হোসেন নিলয়ের মা বলেন, আমি সবসময়ই ছেলে-মেয়েদেরকে আন্দোলনের যেতে উৎসাহ দিতাম। আমার ছেলে নিলয় পাবনা থেকে আন্দোলন করেছে। আমার মেয়ে ঢাকা থাকতো আমি তাকেও আন্দোলনে যেতে উৎসাহ দিতাম। তবে আমার ছেলে নিলয় শহীদ হবে এটি কখনোই কল্পনা করিনি। সন্তানহারা সব বাবা-মায়ের মতো আমারও চাওয়া আমার সন্তানের হত্যাকারীর সঠিক বিচার হোক।
আসামিদের প্রকাশ্যে ঘোরাঘুরি আমাদের জন্য লজ্জার জানিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পাবনা জেলার সাবেক আহ্বায়ক বরকতউল্লাহ ফাহাদ বলেন, এই হত্যা মামলার আসামিদের এখন পর্যন্ত প্রশাসন গ্রেপ্তার করতে পারে নাই, এটি আমাদের কাছে খুবই উদ্বেগের এবং হতাশার বিষয়। কারণ এরা শুধু শহীদ পরিবারকে ভয় ভীতি দেখাচ্ছে এমনটা নয় বিভিন্ন সময় আমাদেরকেও হুমকি দিয়ে আসছে। আমরা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ভুগছি। এক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যাশা দোষীদের অতি দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করুক প্রশাসন। তিনি আরো বলেন, শহীদ পরিবারের সঙ্গে আমরা সর্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি।
শহীদ পরিবারের পুনর্বাসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত পরশুদিন জাতীয় নাগরিক পার্টির চেয়ারম্যান নাহিদ ইসলাম বর্তমান সরকারের কাছে প্রত্যেক শহীদ পরিবারকে ন্যূনতম ১ কোটি টাকা দেওয়ার দাবি করেছেন। আমরাও মনে করি একটি শহীদ পরিবারকে ন্যূনতম এই পরিমাণ আর্থিক সহায়তা করলে তারা স্বাবলম্বী হতে পারবে এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত হবে।
পাবনা পুলিশ সুপার ছুফি উল্লাহ বলেন, আমি অল্প কিছুদিন হল পাবনাতে এসেছি। আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে এ ধরনের অভিযোগ পরিবারের কাছ থেকে আসেনি। তবে অভিযোগ করলে আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
আরকে
