বিজ্ঞাপন

আফালের সঙ্গে সুনামগঞ্জবাসীর আজন্ম লড়াই

আফালের সঙ্গে সুনামগঞ্জবাসীর আজন্ম লড়াই

হাওরের বুকজুড়ে বইছে বাতাস আর বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একের পর এক আফাল (হাওরের উত্তাল ঢেউ) আছড়ে পড়ছে বসতভিটার গায়ে। প্রতিটি ঢেউয়ে কেঁপে উঠছে মাটি। ঘরের পাশে ভেসে আসা কচুরিপানা, খড়কুটা আর বাঁশের খুঁটি জড়ো করে আফালের বিরুদ্ধে লড়াই করছে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের বাহাদুর গ্রামের বাসিন্দা হিমাংশু বর্মণ। কয়েক হাত দূরে খেলছে তার দুই বছরের সন্তান। এই ভিটাটুকুই তার পরিবারের শেষ আশ্রয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, শুধু হিমাংশু বর্মণ নন, বাহাদুর গ্রামের ১১১টি পরিবারের সবার গল্পই প্রায় একই। একদিকে ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল, অন্যদিকে আফাল। বর্ষা এলেই ৫০ থেকে ১০০ ফুট প্রস্থের এই গ্রামটি চারদিক থেকে পানিতে ঘিরে যায়। হাঁটার মতো শুকনো জায়গা থাকে না। আফালের একের পর এক আঘাতে বসতভিটার মাটি ধসে পড়ে হাওরে। ইতোমধ্যে এই গ্রামের ২০টির মতো ঘর আফালে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

হিমাংশু বর্মণ বলেন, আমার বাপ-দাদারাও এভাবেই জীবন কাটিয়ে গেছেন। এবারও বোরো ফসলটা নষ্ট হয়ে গেল। এখন আফাল থেকে ঘর বাঁচানোর লড়াই করছি। হাত গুটিয়ে বসে থাকলে আমাদের শেষ সম্বলটুকুও ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে বছরের একমাত্র বোরো ফসলের ওপর। কিন্তু চলতি বছর অপরিকল্পিত ফসল রক্ষা বাঁধ, অকাল জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ি ঢলে হাজার কোটি টাকার আধাপাকা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যায়। ফসলহানির ক্ষত শুকানোর আগেই বর্ষায় শুরু হয় আফালের সঙ্গে নতুন যুদ্ধ, বসতভিটা বাঁচানোর যুদ্ধ।

একই গ্রামের গৃহিণী অলোক বর্মণ বলেন, হাওরে আফাল উঠলেই বুক কেঁপে ওঠে। বড় বড় ঢেউ যখন ঘরের গায়ে আঘাত করে, তখন মনে হয় এই বুঝি সব শেষ। সন্তানদের নিয়ে সারারাত জেগে থাকি।

সুনামগঞ্জের হাওরবাসীর কাছে বর্ষা মানেই শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, টিকে থাকার যুদ্ধও। একদিকে ফসল হারানোর বেদনা, অন্যদিকে আফালের আঘাত থেকে বসতভিটা রক্ষার লড়াই। শুধু বসতভিটা নয়, থমকে যায় শিক্ষা, চিকিৎসা আর স্বাভাবিক জীবনও। বছরের পর বছর এই লড়াই চলছে। এ জন্য সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে দুর্যোগের আরেক নাম হয়ে উঠেছে আফাল। 

শিক্ষার্থী রিপন বর্মণ বলেন, আফালের সময় পুরো গ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। স্কুলে যেতে পারি না। কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নেওয়াও অনেক কষ্টের। আমরাও চাই অন্য এলাকার মানুষের মতো স্বাভাবিক জীবন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি হলেও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের অভাবে হাওরবাসীর কষ্ট কমছে না। টেকসই ফসল রক্ষা বাঁধ, নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বসতভিটা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানান তারা।

হাওর ও জলবায়ু গবেষক সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, বর্ষা মৌসুমে হাওরে সৃষ্টি হওয়া ঢেউ বসতভিটার সবচেয়ে বড় হুমকি। বছরের পর বছর আফালের আঘাতে গ্রামের ভিটামাটি ক্ষয় হচ্ছে। এই ক্ষয় কমাতে গ্রামের চারপাশে হিজল, করচসহ দেশীয় জলসহিষ্ণু গাছ লাগাতে হবে। এসব গাছ প্রাকৃতিকভাবে আফালের শক্তি কমিয়ে বসতভিটা রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইমদাদুল হক বলেন, বর্ষা মৌসুমে আফাল ও পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকি থাকে। ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপত্তার বিষয়েও সচেতন থাকতে হবে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, আফালে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য উপজেলা পর্যায়ে ঢেউটিন বরাদ্দ রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি সহায়তাও দেওয়া হবে।

তামিম রায়হান/আরকে