৩৬ বছর বয়সী আকিবুর রহমানের চোখে এখন শুধু অসহায়ত্ব। লিভার সিরোসিস ও কিডনির জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের শয্যায় দিন কাটছে তার। অথচ রোগের শুরুতে বিষয়টি বুঝতেই পারেননি তিনি। জন্ডিস ভেবে শুরু করেছিলেন কবিরাজি চিকিৎসা। পরে জানা যায়, দীর্ঘদিনের হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসের সংক্রমণ থেকেই তৈরি হয়েছে তার এই জটিলতা।
তার বাবা আতিয়ার রহমানের বলছেন, ‘জন্ডিস হয়েছে আগে তো বুঝতে পারিনি। বোঝার পরে কবিরাজের চিকিৎসা করিয়েছিলাম। তারপর খুলনা, ঢাকায় চিকিৎসা করিয়েছি। কোলকাতায় নিয়েও চিকিৎসা করানো হয়েছে। সেখান থেকে আসার পরে, তিন বছর ভালো ছিল। কিন্তু আবার অসুস্থ হয়ে গেছে।’ সর্বশেষে চিকিৎসার আশায় তারা এসেছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে আকিবুরের লিভার সিরোসিস এবং কিডনির জটিলতা তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, গ্রামীণ এলাকায় জন্ডিসের চিকিৎসায় এখনো কবিরাজি ও ভেষজ পদ্ধতির প্রচলন রয়েছে। রোগীর জন্ডিস প্রকাশ পাওয়ার প্রথম পর্যায়ে সাধারণত তাদের কবিরাজের ওপর আস্থা রাখতেই বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান জন্ডিসকে কোনো রোগ নয়, বরং রোগের লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে হেপাটাইটিস ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’সহ বিভিন্ন ধরনের ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, লিভারের রোগ, পিত্তনালির সমস্যা বা অন্যান্য শারীরিক জটিলতার কারণে জন্ডিস হতে পারে।
এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আধুনিক চিকিৎসা ও কবিরাজি চিকিৎসার মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কবিরাজদের দাবি, বিভিন্ন ভেষজ গাছের রস, তাবিজ, হালুয়া বা ভিটামিন জাতীয় উপাদান ব্যবহার করে জন্ডিস ভালো করা সম্ভব এবং এ রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। তাদের মতে, রোগীর শারীরিক লক্ষণ দেখেই জন্ডিস শনাক্ত করা যায়।
তবে আধুনিক চিকিৎসকদের মতে, জন্ডিসের প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে রক্ত পরীক্ষাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা অপরিহার্য। কারণ, জন্ডিসের চিকিৎসা মূলত এর অন্তর্নিহিত কারণের ওপর নির্ভর করে। শুধু বাহ্যিক লক্ষণ দেখে চিকিৎসা দিলে রোগীর জটিলতা বাড়তে পারে। জন্ডিস নিজে কোনো রোগ নয়, বরং এটি লিভারের সমস্যার একটি বাহ্যিক লক্ষণ মাত্র। এর প্রধান কারণ হলো হেপাটাইটিস ভাইরাস।
হেপাটাইটিস কী, তার ধরণ ও চিকিৎসা
হেপাটাইটিস ভাইরাসের সংক্রমণে যে রোগ হয়, তাকে ভাইরাল হেপাটাইটিস বলা হয়। ভাইরাল হেপাটাইটিসের পাঁচটি ধরন রয়েছে- হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি ও ই।
হেপাটাইটিস ‘এ’ সাধারণত দূষিত খাবার এবং পানির মাধ্যমে ছড়ায়। এটি একটি তীব্র সংক্রমণ, যা সাধারণত কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়। লিভারের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করে না। এর জন্য টিকা রয়েছে।
হেপাটাইটিস ‘বি’ সংক্রামিত ব্যক্তির রক্ত, বীর্য, শারীরিক তরল এবং গর্ভাবস্থায় বা প্রসবের সময় মা থেকে শিশুর শরীরে ছড়ায়। এটি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ফলে লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সারের মতো মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। তবে এর সুরক্ষায়ও টিকা পাওয়া যায়।
হেপাটাইটিস ‘সি’ মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা সুচের (যেমন: ড্রাগস নেওয়ার সিরিঞ্জ, ট্যাটু বা দূষিত সুচ) মাধ্যমে ছড়ায়। এটিও একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ যা লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। এর কোনো ভ্যাকসিন নেই, তবে আধুনিক অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের মাধ্যমে এটি পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব।
হেপাটাইটিস ‘ডি’ ভাইরাসটি একা ছড়াতে পারে না। এটি কেবল তাদেরই আক্রান্ত করে যারা ইতোমধ্যে হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। টিকা নিলে এই রোগ থেকেও সুরক্ষা পাওয়া যায়। আর হেপাটাইটিস ‘ই’ সাধারণত অনিরাপদ ও দূষিত পানি এবং খাবার গ্রহণের মাধ্যমে ছড়ায়। এটি সাধারণত মৃদু প্রকৃতির হয়, তবে গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।
রামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে হাসপাতালে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ২৭৩ জন রোগী। এর মধ্যে হেপাটাইটিস ‘এ’-তে আক্রান্ত ছিলেন ২৯৯ জন (২৩ শতাংশ), হেপাটাইটিস ‘বি’-তে ৮৭ জন (৬ দশমিক ৮ শতাংশ) এবং হেপাটাইটিস ‘সি’-তে ৩৯ জন। এছাড়া অন্যান্য ধরনের হেপাটাইটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৮৪৮ জন।
একই সময়ে হেপাটাইটিসজনিত জটিলতায় মারা গেছেন ১৭ জন রোগী। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, মোট ভর্তি রোগীর তুলনায় মৃত্যুহার ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ। মৃতদের মধ্যে হেপাটাইটিস ‘এ’-তে তিনজন, হেপাটাইটিস ‘বি’-তে চারজন, হেপাটাইটিস ‘সি’-তে একজন এবং অন্যান্য ধরনের হেপাটাইটিসে ৯ জন মারা গেছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীতে হেপাটাইটিস ‘এ’ রোগীর সংখ্যা বেশি দেখা যায়। গেল এক বছরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২৯৯ জন হেপাটাইটিস ‘এ’ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এতে মৃত্যু হয়েছে তিনজনের।
চিকিৎসকরা জানান, হেপাটাইটিস ‘এ’ ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট। এটি সহজেই অন্যদের কাছে সংক্রামিত হয়। মূলত দূষিত খাবার এবং পানির মাধ্যমে ছড়ায়। এটি হেপাটাইটিসের অন্যান্য রূপের মতো দীর্ঘস্থায়ী লিভারের ক্ষতি করে না। তবে লিভারের রোগীর গুরুতর অসুস্থতা বাড়িয়ে দেয়।

হেপাটাইটিস ‘এ’ এর ঝুঁকিতে কারা?
হেপাটাইটিস ‘এ’ ভাইরাসের সংস্পর্শে এলে যে কেউ আক্রান্ত হতে পারেন। তবে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে বসবাস, দূষিত খাবার বা পানি গ্রহণ, নির্দিষ্ট ধরনের যৌন আচরণ (যেমন: ওরাল-এনাল সেক্স), ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ, হেপাটাইটিস ‘এ’ ভাইরাসে আক্রান্ত প্রাইমেট নিয়ে কাজ করা এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
রাজশাহীতে হেপাটাইটিস ‘এ’ তুলনামূলক বেশি হওয়ার পেছনে দূষিত পানি ও খাদ্যগ্রহণকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন চিকিৎসকেরা। তাদের ভাষ্য, অনেক মানুষ খোলা জায়গার পানি পান করেন এবং রাস্তার পাশের খোলা দোকানের খাবার ও পানি গ্রহণ করেন। এসব কারণে হেপাটাইটিস ‘এ’ ভাইরাস সহজেই ছড়িয়ে পড়ছে।
রোগী-স্বজনদের প্রথম আস্থা কবিরাজি চিকিৎসায়
জন্ডিসের চিকিৎসায় এখনো অনেক রোগী ও তাদের পরিবারের আস্থা কবিরাজি চিকিৎসার ওপর। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় আধুনিক চিকিৎসার পাশাপাশি ভেষজ ও লোকজ চিকিৎসার প্রচলন দীর্ঘদিনের।
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার সোনাতলা ও আফতাবনগর গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে জন্ডিসের চিকিৎসা দিয়ে আসছেন বাবুল প্রামাণিক ও শাহজাহান আলী নামে দুই কবিরাজ। তাদের কাছে প্রতিদিনই পাবনাসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। রোগীদের দাবি, চিকিৎসা নিয়ে অনেকেই সুস্থ হয়েছেন এবং পুনরায় অসুস্থ হলে তাদের কাছেই আবার চিকিৎসা নিতে আসেন।
সোনাতলায় গিয়ে চিকিৎসার বিষয়ে কথা হয় জাকিয়া খাতুন, সুজানগরের সাবিনা খাতুন, রফিকুল ইসলাম, আখলিমা আখতারের সঙ্গে। তাদের দাবি, এই চিকিৎসায় তাদের রোগ ভালো হবে। অতীতেও অনেকেই তাদের থেকে জন্ডিসের চিকিৎসা নিয়েছে সুস্থ হয়েছেন।
রোগী জাকিয়া খাতুন বলেন, পাবনার সোনাতরায় দীর্ঘদিন থেকে কবিরাজ চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। তার হাতে রোগী ভালো হয়। তাই অনেক দূর-দূরান্ত থেকে রোগী আসে। এখানে চিকিৎসা নিয়ে যদি রোগী ভালো না হতো তাহলে তো কেউ আসতো না।
সাবিনা খাতুন তার মেয়েকে নিয়ে কবিরাজের কাছে এসেছেন চিকিৎসার জন্য। তার দাবি, মেয়ের জন্ডিস হলে তিনি এখানে চিকিৎসা করান। এর আগেও তার মেয়ের জন্ডিস হয়েছিল। এখানে চিকিৎসা করে সুস্থ হয়েছে। এখানে হালুয়া ছাড়াও বিভিন্ন গাছ-গাছড়া দেয়। তাতে জন্ডিস ভালো হয়ে যায়। এছাড়া চুনের পানি দিয়ে হাত ধোয়ায়। এতে শরীর থেকে জন্ডিস নেমে যায়। কখনও কখনও মালা পরানো হয়।
সোনাতলা গ্রামের কবিরাজ মো. শাজাহান আলী জানান, তিনি প্রায় ৪০ বছর ধরে জন্ডিসের চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। অন্যদিকে আফতাবনগর এলাকার কবিরাজ মো. বাবলু প্রামাণিকও গত ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে একই ধরনের চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। তবে তাদের কারোরই নেই ড্রাগ লাইসেন্স বা এ বিষয়ক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা।
কবিরাজ বাবুল প্রামাণিক বলেন, জন্ডিস রোগীর চিকিৎসা ৩০ বছর আগে আমার বাবা করতেন। বাবা বৃদ্ধ হয়েছেন। বিগত ১০-১২ বছর ধরে আমি করি। রোগী আসে ঢাকা, পাবনা, কাজিরহাট, নগরবাড়ি, সিরাজগঞ্জ, উল্লপাড়া থেকে। আমরা শুধু জন্ডিসের চিকিৎসাই করি। এই চিকিৎসায় গাছ-গাছালি দিয়ে হালুয়া তৈরি করি। হালুয়াটার সঙ্গে ভিটামিন জাতীয় লিভারের ওষুধ দেওয়া হয়। ওষুধে আল্লাহ ভালো করে দেয়। এসব ওষুধের দাম ২০০ থেকে ৫০০ টাকা। তবে যার জন্ডিস নেই সে এসে ফিরে যায়।
তিনি বলেন, আমরা পৌরসভার লাইসেন্সে ব্যবসা করছি। ৪০ বছর আগে থেকে এই ব্যবসা করি। কোনো বাধাবিঘ্ন আসেনি। জন্ডিসের গাছ তুলে রস করা হয়। রসে গুড় দিয়ে মসলা দিয়ে হালুয়া তৈরি করা হয়। পরে হালুয়াটা প্যাকেট করে ১০০ টাকা করে বিক্রি করা হয়। এছাড়া ইউনানী ওষুধগুলো রাজশাহী, বগুড়া ও ঢাকা থেকে নিয়ে এসে বিক্রি করা হয়। আমাদের এখানের চিকিৎসায় রোগী ভালো হয়। তাই তো দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই আসে।

কবিরাজিতে কি হেপাটাইটিস ভালো হয়? যা বলছেন চিকিৎসকরা
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডে জন্ডিসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। রোববার (২৬ জুলাই) দুপুরে ওই ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, রোগীতে প্রায় পূর্ণ ওয়ার্ড। চিকিৎসক ডা. মাকামাম মাহমুদ ভর্তি রোগীদের খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং তাদের চিকিৎসার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
রোগীদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বারবার জানান, সরকারি হাসপাতালে হেপাটাইটিসের পরীক্ষা, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় টিকা (যেখানে প্রযোজ্য) পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এরপরও অনেক মানুষ কবিরাজি চিকিৎসার ওপর নির্ভর করেন। এতে রোগের সঠিক চিকিৎসা বিলম্বিত হয়। অনেক রোগী সুস্থ হওয়ার বদলে আরও জটিল অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন। এতে একদিকে যেমন রোগীর জীবনঝুঁকি বেড়ে যায়, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে আর্থিক ক্ষতিরও মুখে পড়তে হয়।
এই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২২ বছরের সাদিক। তার বাড়ি কুষ্টিয়া জেলায়। তার দাদি শাহনাজ বেগম জানান, তার নাতির জন্ডিস এর আগে ধরা পরেছিল। তখন কবিরাজের কাছে চিকিৎসা করা হয়। এতে সে ভালো হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সপ্তাখানেক আগে আবার জন্ডিস হয়েছে। তখন তাকে আবার কবিরাজের কাছে নিয়ে গিয়ে গাছ খাওয়ানো হয়েছিল। তাতেও শারীরিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় তাকে রাজশাহী মেডিকেলে ভর্তি করা হয়েছে।
হেপাটাইটিস নিয়ে সচেতনতার অভাব
চিকিৎসকদের মতে, বাংলাদেশে হেপাটাইটিস সম্পর্কে সচেতনতার অভাবের অন্যতম কারণ হলো অনেকেই রোগটিকে সাধারণ জন্ডিস হিসেবে দেখে অবহেলা করেন। পাশাপাশি সামাজিক কুসংস্কার ও প্রচলিত ভুল ধারণার কারণে অনেক রোগী শুরুতেই আধুনিক চিকিৎসার পরিবর্তে কবিরাজি বা ভেষজ চিকিৎসার ওপর নির্ভর করেন। তাদের ধারণা, জন্ডিস একটি সাধারণ অসুখ, যা এসব চিকিৎসাতেই সেরে যায়। অথচ অনেক ক্ষেত্রে জন্ডিস লিভারের গুরুতর সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এটি লিভার সিরোসিস, লিভার ফেইলিউর, এমনকি লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
ডা. শেখ শামীম আহমেদ বলেন, হেপাটাইটিস ও জন্ডিসকে এক মনে করাও বড় একটি সমস্যা। জন্ডিস নিজে কোনো রোগ নয়। এটি মূলত লিভারের বিভিন্ন রোগের একটি লক্ষণ। অন্যদিকে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসকে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। কারণ, শরীরে সংক্রমণ ঘটার পরও বছরের পর বছর কোনো লক্ষণ নাও দেখা দিতে পারে। অনেক সময় চোখ বা ত্বক হলুদ হওয়ার মতো উপসর্গ প্রকাশের আগেই লিভারের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়ে যায়।
চিকিৎসকদের মতে, বিশেষ করে গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় জন্ডিসের লক্ষণ দেখা দিলে অনেক মানুষ ঝাড়ফুঁক, পানিপড়া, ডাবপড়া, গাছের রস বা মালা পরানোর মতো প্রচলিত চিকিৎসার আশ্রয় নেন। এতে রোগ নির্ণয় ও বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হয়। ফলে রোগ আরও জটিল হয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসার সাফল্যের সম্ভাবনা কমে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে হেপাটাইটিসসহ সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে পর্যাপ্ত আনুষ্ঠানিক স্বাস্থ্য শিক্ষা নেই। ফলে রোগের কারণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা সম্পর্কে অনেকের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতি থেকে যায়। বিশেষ করে অশিক্ষিত ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে হেপাটাইটিস ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি এবং অসচেতনতা তুলনামূলক বেশি।
তারা আরও বলছেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য হেপাটাইটিস শনাক্তে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো অনেক সময় ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। পাশাপাশি সরকারি ব্যবস্থাপনায় এসব পরীক্ষা এখনো সর্বস্তরের মানুষের জন্য সহজলভ্য ও বিনামূল্যে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে অনেক রোগী দেরিতে শনাক্ত হন এবং চিকিৎসা শুরু করতেও বিলম্ব হয়।
সচেতনতার অভাবে শেষ ভরসা হাসপাতাল
রোগের প্রথম অবস্থায় গ্রাম্য চিকিৎসা বা কবিরাজির ওপর নির্ভর করে অনেকেই হেপাটাইটিসের চিকিৎসা শুরু করেন। চিকিৎসকদের মতে, এসব পদ্ধতিতে অনেক সময় সাময়িকভাবে উপসর্গ কমলেও শরীরে থাকা ভাইরাসের চিকিৎসা হয় না। ফলে রোগ ধীরে ধীরে জটিল আকার ধারণ করে। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে হাসপাতালে আসতে হয় রোগীদের। তবে তখন অনেকেই সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন।
রামেক হাসপাতালের ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন বাগমারার রমজান আলী (৫০) তাদেরই একজন। দীর্ঘদিন ধরে জন্ডিসে ভুগছেন তিনি। তার ছেলে মেহেদী হাসান জানান, স্থানীয়ভাবে কবিরাজের দেওয়া ওষুধ ডাবের সঙ্গে মিশিয়ে এবং বিভিন্ন গাছ থেকে তৈরি ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে। কিন্তু কোনোভাবেই তার বাবার অবস্থার উন্নতি হয়নি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
রামেক হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. শেখ শামীম আহমেদ বলেন, হেপাটোরেনাল সিনড্রোম বা হেপাটিক এনকেফালোপ্যাথির মতো জটিলতা তৈরি হলে রোগীকে বাঁচানো অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় রোগীদের আইসিইউসহ বিভিন্ন ধরনের সাপোর্ট দিতে হয়। অনেক রোগী চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ফিরলেও দেরিতে হাসপাতালে আসার কারণে ঝুঁকি বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে এসেও মানুষ যেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাইরে গিয়ে কবিরাজি চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করেন। হেপাটাইটিস ‘বি’-এর চিকিৎসার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় টিকাও নেওয়া যায়।
রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এস.আই.এম রাজিউল করিম বলেন, হেপাটাইটিসের চিকিৎসা মূলত বিশেষায়িত হাসপাতালে হয়ে থাকে। স্বাস্থ্য বিভাগ কবিরাজি চিকিৎসাকে নিরুৎসাহিত করে, কারণ এ রোগের বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। হেপাটাইটিস প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়ার সুযোগও রয়েছে।
আরকে
