বিজ্ঞাপন

নাক-কান ফোঁড়ানো ও খতনায় অনিরাপদ যন্ত্র, হেপাটাইটিস সংক্রমণের নীরব ফাঁদ

নাক-কান ফোঁড়ানো ও খতনায় অনিরাপদ যন্ত্র, হেপাটাইটিস সংক্রমণের নীরব ফাঁদ

বরগুনার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে খতনার কাজ করেন মো. বাদশা মিয়া। পেশায় একজন চায়ের দোকানের ব্যবসায়ী হলেও তিনি দীর্ঘদিন ধরেই করছেন বিশেষ এই কাজ। কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিভিন্ন যন্ত্রপাতির মাধ্যমে খতনার কাজ করেন তিনি। আর এ কাজের জন্য তিনি বর্তমানে সার্জিক্যাল ব্লেড ব্যাবহার করলেও পরিবর্তন করেন না বাকি অনেক যন্ত্রপাতি। এ ছাড়া পুনরায় ওই যন্ত্রপাতি ব্যবহারের আগে জীবাণুমুক্ত করার বিষয়েও নেই তার সঠিক কোনো ধারণা। ফলে একই যন্ত্রপাতি একাধিকবার ব্যবহারে হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন মরণব্যবধিতে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হচ্ছে সেবাগ্রহীতাদের। 

শুধু বাদশা মিয়া একাই নয়, বরিশাল বিভাগের সব জেলার বিভিন্ন এলাকায় খতনার কাজ করা হাজাম বা ওস্তাদ নামে পরিচিত প্রায় সবারই একই অবস্থা। বংশপরম্পরায় দীর্ঘ বছর ধরে তারা খতনার কাজ করেন। তবে সঠিক উপয়ে যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করার বিষয়ে কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ বা সঠিক উপায় জানা নেই তাদের। ফলে নিজেদের অজান্তে একই যন্ত্রপাতি বিভিন্ন মানুষের শরীরে একাধিকবার ব্যবহারে মরনব্যধী সংক্রমণে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছেন তারা। এ ছাড়া অস্ত্রোপচারের পর রোগীদের বিভিন্ন ধরনের ওষুধও লিখে দেন এসব ওস্তাদরা। 

দীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে খতনার কাজ করেন বরগুনা সদর উপজেলার কদমতলা এলাকার বাসিন্দা মো. বাদশা মিয়া। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, গ্রাম্য চিকিৎসকরা বলেছে গরম পানি দিয়ে একাধিকবার ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করতে হবে। এর বাইরে আর কোনো প্রশিক্ষণ আমরা পাইনি। তবে হাত ও যন্ত্রপাতি হ্যাক্সিসল দিয়ে পরিষ্কার করি। 

খতনার পর যদি ব্যথা হয়, তাহলে তারাই ওষুধ লিখে দেন জানিয়ে খতনার কাজ করা পিরোজপুর জেলার লোকমান নামে আরেক ওস্তাদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমি পুরাতন কোনো ব্লেড বা ছুড়ি ব্যবহার করি না। সার্জিক্যাল ব্লেড ব্যবহার করি। যা শুধু একবারই ব্যবহার করা হয়।

শুধু খতনার কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি নয়, সঠিকভাবে জীবাণুমুক্ত না করে বর্তমানে মেশিনের মাধ্যমে নাক-কান ফোরানোর কাজও করা হয়। বিশেষ করে বিভিন্ন বয়সী মেয়েরা স্বর্ণালংকার ব্যবহার করতে নাক ও কান ফোঁড়ান। একসময় বাসাবাড়িতে এ কাজ করলেও এখন বেশিরভাগই করা হয় বিভিন্ন বিউটি পার্লারে। ফলে একটি ছোট মেশিন ব্যবহার করে একাধিক মানুষের নাক ও কান ফোঁড়ানো হয়। আর এ কারণেই একটি মেশিন একাধিক মানুষের সংস্পর্শে আসায় এবং সঠিকভাবে জীবাণুমুক্ত না করায় হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন সংক্রমণব্যাধিতে সংক্রমিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়।

বরগুনার কলেজ রোড এলাকায় রোজ বিউটি পার্লারের মালিক লিনা ঢাকা পোস্টকে বলেন, নাক-কান ফোরানোর জন্য যখন কেউ আসে তখন হ্যাক্সিসল দিয়ে পরিষ্কার করি। এরপর একটি মেশিনে নাক বা কানের ফুল সেট করে তা পুশ করা হয়। একটি মেশিনের মাধ্যমেই একাধিকবার এ কাজ করা হয়।  

কান ফোরানো ও খতনাসহ ছোট অস্ত্রোপচারে জীবাণুমুক্ত যন্ত্রের ব্যবহার নিশ্চিত করে হেপাটাইটিস সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রচার প্রচারণার কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন জানিয়ে বরগুনা জেলা স্বাস্থ্য অধিকার ফোরামের সভাপতি মনির হোসেন কামাল ঢাকা পোস্টকে বলেন, ছোটখাটো অস্ত্রোপচার যারা করছেন এবং একই সিরিঞ্জ ও সুইসহ একই যন্ত্রপাতি যারা ব্যবহার করছেন তাদেরকে সচেতন করার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের একটি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। স্বাস্থ্য বিভাগেরও অনেকে জেনেশুনে এ কাজ করছেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

তিনি আরও বলেন, একই যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে মানুষের শরীরে হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন মরণব্যাধি সংক্রমিত হওয়ার শঙ্কা থাকে। সাধারণ নাগরিকদের পক্ষে আমাদের দাবি, যারা এই কাজ করছেন তাদেরকে সচেতন করতে হবে। আর যারা জেনেশুনে এ কাজ করছেন তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন এবং মানুষকে সচেতন করতে স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রচার-প্রচারণার কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন। 

স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, মানুষ নানা ধরনের হেপাটাইটিসে সংক্রমিত হতে পারে। এর মধ্যে হেপাটাইটিস (বি) অত্যন্ত ছোঁয়াচে রক্তবাহিত ভাইরাস। আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তের সংস্পর্শে আসা যে কোনো যন্ত্র সঠিকভাবে জীবাণুমুক্ত না করে অন্য কারো শরীরে ব্যবহার করলে সুস্থ মানুষের শরীরে এ সংক্রমণ হতে পারে। অনেকে আবার না জেনে সাধারণ সাবান বা অ্যালকোহল দিয়ে যন্ত্রপাতি মুছে একাধিকবার  চিকিৎসাকাজে ব্যবহার করেন। এতে সুচ বা ধারালো যন্ত্র সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত হয় না। বিশেষ করে ছোট অস্ত্রোপচারের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করতে অটোক্লেভ বা অটোমেটিক স্টিম স্টারলাইজেশন করতে হবে বলেও জানান চিকিৎসকরা।

বরগুনার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মাহমুদ মুরশিদ আল-মামুন শুভ ঢাকা পোস্টকে বলেন, হেপাটাইটিস (বি) একটি সংক্রামক ব্যাধি। এটি একজন মানুষের শরীর থেকে আরেকজন মানুষের মধ্যে ছড়ানো কয়েকটি মাধ্যম আছে। তার মধ্যে মা থেকে বাচ্চার শরীরে, রক্তের সংক্রমণ, অনিরাপদ যৌন আচরণ। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, ছোটখাটো অপারেশনের সময় অনিরাপদ ও অপরিষ্কার যন্ত্রপাতির ব্যবহার। আমরা সবাইকে সচেতন করে বলতে চাই, নাক-কান ফোরানো ও দাঁত তোলাসহ ছোটখাটো অপারেশনের আগে অবশ্যই যন্ত্রপাতি পরিষ্কার কি-না সে বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে। এসব যন্ত্রপাতি অটোক্লেভের মাধ্যমেই একমাত্র নিরাপদ করা সম্ভব। আমরা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের অপারেশন থিয়েটারে এটা সর্বোচ্চ মানার চেষ্টা করি।

বরগুনা জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ ঢাকা পোস্টকে বলেন, হেপাটাইটিস একটি মরণব্যাধি রূপ ধারণ করতে পারে যদি আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলি। সাধারণত হেপাটাইটিস (এ) এবং (সি) দূষিত খাবার থেকে ছড়ায়। আর হেপাটাইটিস (বি) মূলত রক্তের মাধ্যমে ছড়ায়। কান ফোঁড়ানো, একই সিরিঞ্জ দিয়ে মাদক গ্রহণ, পরীক্ষা ছাড়া রক্ত গ্রহণ, একই ব্লেড একাধিক ব্যক্তির ব্যবহার—এসব কারণেও হেপাটাইটিস (বি) সংক্রমণ ঘটতে পারে। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে আমরা এ সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকতে পারবো। এ ছাড়া আমাদের ইপিআই টিকা কার্যক্রমের শিডিউলে হেপাটাইটিসের টিকা রাখা হয়েছে। সংক্রমণ রোধে এ টিকা কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে।

হেপাটাইটিসের সংক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকতে মানুষকে সচেতন হতে হবে জানিয়ে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. লোকমান হাকিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের টিকা কার্যক্রমের মধ্যে হেপাটাইটিসের টিকা আছে। শিশুদের টিকা দেওয়া হয়। তবে বয়স্করাও পরীক্ষা করে হেপাটাইটিস সংক্রমিত হয়েছে কি-না তা জেনে  টিকা ক্রয় করে গ্রহণ করতে পারেন। তবে আগে নিশ্চিত হতে হবে তার শরীরে হেপাটাইটিসের সংক্রমণ আছে কিনা।

তিনি আরও বলেন, হেপাটাইটিস (বি) বেশিরভাগ সময়ে একাধিক যৌন সঙ্গীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন, সংক্রামিত কোনো ব্যক্তির রক্ত গ্রহণ করা, একই সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তির ব্যবহার করার মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটে। এ ছাড়া সংক্রমিত মায়ের গর্ভের সন্তানও হেপাটাইটিসে সংক্রমিত হতে পারে। হেপাটাইটিস রোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি পরীক্ষা ছাড়া কোনো ব্যক্তির রক্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে।    

এএমকে

বিজ্ঞাপন