দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের কুইন্সটাউনে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৬ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৫ জনের বাড়িই নারায়ণগঞ্জে। তাদের মধ্যে ৩ জনই সদর উপজেলার আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকেরচর গ্রামের বাসিন্দা।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকালে মৃত্যুর খবর নারায়ণগঞ্জে পৌঁছানোর পর নিহতদের বাড়িতে স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয়দের ভিড় জমে। বিশেষ করে একই গ্রামের ৩ জনের মৃত্যুতে ক্রোকেরচর গ্রামে শোকের মাতম নেমে আসে।
স্থানীয় সূত্র ও নিহতদের স্বজনরা জানান, সোমবার (২৭ জুলাই) দিবাগত রাতে কুইন্সটাউনে আলীরটেক ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রওশন আলীর মালিকানাধীন একটি দোকানে আগুন লাগে। সে সময় দোকানের ভেতরে ৭ জন বাংলাদেশি কর্মী অবস্থান করছিলেন। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় তারা বের হওয়ার সুযোগ পাননি। এতে ৬ জন ঘটনাস্থলেই মারা যান। একজন জীবিত উদ্ধার হয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
নিহতরা হলেন- আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকেরচর গ্রামের মনির হোসেনের ছেলে মো. ফাহিম (২৯), আলী মিয়ার ছেলে আপন আহমেদ (২৩), মৃত শরব আলীর ছেলে নূর মোহাম্মদ (৫৫), একই ইউনিয়নের তৈলখিরার চর গ্রামের ফারুক হোসেনের ছেলে মো. ফয়সাল (২৬), ফতুল্লার বক্তাবলী ইউনিয়নের কানাইনগর এলাকার শাহিন (৩০) এবং মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিম পৌরসভার কালিন্দিপাড়ার বাসিন্দা রাজ্জাক (৫৫)।
নিহত আপন আহমেদের বাবা আলী মিয়া বলেন, সংসারের অভাব দূর করতে ৪ বছর আগে ছেলেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাঠিয়েছিলাম। ও ছিল আমাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় ভরসা। ওর পাঠানো টাকায় আমাদের সংসার চলত। এখন সব শেষ হয়ে গেল।
তিনি আরও বলেন, সকাল থেকে বিদেশ থেকে ফোন আসছিল। পরে আগুনের ভিডিও দেখে তিনি বুঝতে পারেন বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিছুক্ষণ পর নিশ্চিত হন, তার ছেলে আর নেই।
স্বজনরা জানান, নিহত ফাহিম প্রায় ১১ বছর ধরে দক্ষিণ আফ্রিকায় ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য কাজ করছিলেন। দেশে ফিরে নতুনভাবে জীবন শুরু করার স্বপ্ন ছিল তার।
নিহত নূর মোহাম্মদ, ফয়সাল, শাহিন ও রাজ্জাকও নিজ নিজ পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকায় কর্মরত ছিলেন। একটি দুর্ঘটনায় মুহূর্তেই ৬টি পরিবার তাদের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে মরদেহ উদ্ধার করে অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করে স্থানীয় পুলিশ। তবে আগুন লাগার কারণ এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
দোকানটির মালিক ও আলীরটেক ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রওশন আলী বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। তিনি বলেন, ভিডিও কলে আগুনের ভয়াবহতা দেখেছি। তখন দোকানের ভেতরে ৭ জন কর্মী ছিলেন। ৬ জনকে হারিয়েছি। তারা সবাই আমার প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। এই ক্ষতি কখনো পূরণ হওয়ার নয়। নিহতদের পরিবারের পাশে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী নিহতদের মধ্যে ৫ জন নারায়ণগঞ্জের এবং ১ জন মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
মেহেদী হাসান সৈকত/এমএমবি
