‘ব্যাটা (ছেলে) তুমাক (তোমাকে) বুলনু (বললাম) তুমি বাঁশ লিয়ে (নিয়ে) নামো গাঙ্গে (নদীতে)। কিন্তু তুমি শুনলে না। ওগো আমি তুমাকে (তোমাকে) বুলনু চরাট (বাঁশের মাচা) নিয়ে নামে। তুমি অতো পানিতে লহালুট করলে। পশ্চিমপাড়ার লায়ে (নৌকা) চড়লে আমার স্বামী হারাতো না। আমার জানেরা চোখের সামনে পানিতে তলি (তলিয়ে) গেলে।’
এভাবেই আহাজারি করছিলেন পদ্মায় নিখোঁজ হওয়া কাউসার আলীর (৬০) স্ত্রী ও জিয়ারুল ইসলামের (৪০) মা জাহেরা বেগম (৫৫)। জাহেরা বেগম ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। নৌকাডুবির সময় তিনি একই নৌকাতে ছিলেন। চোখের সামনে স্বামী-সন্তানকে হারিয়েছেন তিনি। ঘটনার সেই মুহূর্তের কথা মনে করে বিলাপ করছেন তিনি।
বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, স্রোতের কারণে নৌকার ডুবে যাওয়া দেখে আমার ব্যাটা ভ্যাবাচ্যাকা (দিশেহারা) খ্যাঁ গেছে। আমি বুলছি পশ্চিমে লা (নৌকা) করো পশ্চিমে লা (নৌকা) করো। আর হ্যালে (বৈঠা) কথা শুনেনি। পেছন থেকে পানি উঠে গেছে। আমি বুলছি ওরে তুমরা (তোমরা) ঝাও ফেলে দাও। গ্যারাপি লিয়ে ব্যাটা ঝাওয়ের গাছে লাথি খুচে দিসে। আমি বুলছি ব্যাটা (ছেলে) হলো না। ব্যাটা (ছেলে) তুমি বাঁশ ধরে ভাসো। স্বামীকে বুলছে- তুমি চরাটখান লি (নিয়ে) ভাসো। পাশে চরাট লি (নিয়ে) একটা প্যাট (শ্রমিক) ভ্যাসি (ভেসে) আছে। ওই (স্বামী) বুলছে- এই তুমি চরাট লি (নিয়ে) দূরে ভ্যাসি (ভেসে) যাও। বলে ধাক্কা দি (দিয়ে) পানিতে ডুবি গেলো। মেলাখুন সাঁতরিয়ে (সাঁতার দিয়ে) আর মুখ জাগাতে পারেনি। আমি আর দেখতে পানুনে (পেলাম না)।’
এর আগে মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দুপুর চরখানপুরের পদ্মা নদীর চর থেকে ঝাওগাছ নৌকায় বোঝাই করে নিয়ে আসার পথে নৌকাডুবিতে পবা উপজেলার শ্যামপুরের শান্তিনগর এলাকার কাউসার আলী (৬০) তার ছেলে জিয়ারুল ইসলাম (৪০) নিখোঁজ হন। এ ঘটনায় জিয়ারুলের মা জাহেরা বেগম (৫৫) প্রাণে বেঁচে যান। তারা রাজশাহীর বড়কুঠি এলাকায় নৌকাডুবিতে নিখোঁজ হলেও স্রোতের বিষয়টি মাথায় রেখে আশপাশের এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে রাজশাহী ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরী দল।
বিকেলে আফছার আলীর পবা উপজেলার শ্যামপুরের শান্তিনগর এলাকার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, স্বজনদের সঙ্গে স্থানীয়দের ভিড়। বাড়িতে কান্না করছেন নিখোঁজ দুইজনের স্ত্রী। সঙ্গে কান্না করছেন তাদের সন্তানেরাও। তাদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন প্রতিবেশী-স্বজনরা। একই পরিবারে এমনভাবে দুইজনের হারিয়ে যাওয়াতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো এলাকায়। যদিও তারা বর্তমানে নিখোঁজ রয়েছেন। তবে ঘটনার ৬ ঘণ্টা অতিবাহিত হয়েছে। তাই নদীর পানিতে ডুবে যাওয়া ব্যক্তিদের জীবিত ফেরার সম্ভাবনা কম। তবে ফায়ার সার্ভিস বলছে- নিখোঁজরা কি অবস্থায় আছে। তাদের খুঁজে না পওয়ায় পর্যন্ত মৃত বলা যাচ্ছে না। তাই আমরা তাদের নিখোঁজ বলছি।
সবুজ নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, তারা পদ্মার চর থেকে ঝাওগাছ ও খর কেটে নিয়ে আসেন। তারপর সেগুলো বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। এমনভাবে তারা দীর্ঘ বছর ধরে এই কাজ করে আসছেন। তবে সাধারণত তারা বাবা-ছেলে ও শ্রমিকরা যান। কিন্তু ঘটনা চক্রে আজ জিয়ারুলের মা জাহেরা বেগম গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে আসার সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে। একই পরিবারের দুই সদস্যের এইভাবে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না তারা।
রাজশাহী ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা নদীতে জেগে উঠা চরে ঝাওগাছ কাটতে গিয়েছিলেন তারা। সেখানে কাজ শেষে একটি ছোট ডিঙ্গি নৌকায় তারা ফিরছিলেন। সেই নৌকায় একজন নারী ও সাতজন পুরুষ ছিলেন। পথে নৌকাটি মাঝ নদীতে এলে হঠাৎ স্রোতের তোরে ডুবে যায়। এ সময় সাঁতার দিয়ে ছয়জন কিনারায় ওঠেন। তবে আফসার ও তার ছেলে জিয়ারুল পানিতে তলিয়ে যান। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধার কাজে অংশ নেয়।
এ বিষয়ে রাজশাহী সদর ফায়ার সার্ভিসের ডেপুটি ডিরেক্টর ফরহাদ হোসেন বলেন, নদীতে স্রোত রয়েছে। তাই উদ্ধার অভিযান চালাতে বেগ পেতে হচ্ছে। এই অভিযানে তাদের একজন লিডারসহ চারজন ডুবুরি কাজ করছেন।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের গেজ রিডার এনামুল হক বলেন, পদ্মার পানি বাড়ছে। পদ্মা এখন ভরা যৌবনে। প্রতিবছর এই সময়ে মানুষ ডুবে মারা যায়। মানুষকে সাবধান হওয়া উচিত। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকাল ৬টায় পদ্মার রাজশাহী সীমানায় পানির উচ্চতা ছিল ১৪ দশমিক শূন্য ৬ সেন্টিমিটার। আর বিকেল ৩টায় ছিল ১৪ দশমিক ৩ সেন্টিমিটার।
শাহিনুল আশিক/আরএআর
