বহুতল ভবন আর আধুনিক মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষসহ পর্যাপ্ত ল্যাব থাকলেও শিক্ষক সংকটে ভুগছে বরগুনা জিলা স্কুল ও সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় নামে ঐতিহ্যবাহী সরকারি দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে মাধ্যমিক পর্যায়ে এ দুটি স্কুলেই বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট থাকায় বাধ্য হয়ে এক বিষয়ে ক্লাস নিতে হচ্ছে আরেক বিষয়ের শিক্ষকের।
এতে ব্যাহত হচ্ছে স্কুল দুটির শিক্ষার্থীদের সঠিক পাঠদান। তবে শিক্ষক সংকট দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার বিষয়টি অবগত করা হয়েছে বলে জানান জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শিরিন আকতার।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯২৭ সালে বরগুনা এম.ই. স্কুল নামে বর্তমানের জিলা স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৩১ সালে মাধ্যমিক, ১৯৩৮ সালে পূর্ণাঙ্গ হাইস্কুল এবং সবশেষ ১৯৭০ সালে সরকারি জিলা স্কুল হিসেবে রূপান্তরিত হয়। অপরদিকে জেলায় নারী শিক্ষার জন্য সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়টি ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি ১৯৭০ সালে জাতীয়করণ করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এ দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অধ্যায়ন শেষ করে অসংখ্য কৃতী শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার সুযোগ পেয়েছেন দেশের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে।

বর্তমানে এ দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অসংখ্য শিক্ষার্থী দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রশাসন, বিচার বিভাগ, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন অঙ্গনে কর্মরত। তবে বর্তমানে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকটের কারণে ঐতিহ্য হারাতে বসেছে স্কুল দুটি। আর শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় পাঠদান ব্যাহত হওয়ায় বাধ্য হয়ে প্রাইভেট পড়তে হচ্ছে বাইরের শিক্ষকদের কাছে।
বরগুনা জিলা স্কুল ও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বরগুনায় ছেলেদের জন্য একমাত্র সরকারি স্কুল জিলা স্কুলে প্রধান শিক্ষক থাকলেও সহকারী প্রধান শিক্ষকের দুটি পদই রয়েছে শুন্য। বিভিন্ন বিষয়ে মোট ৫২ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত মাত্র ২৫ জন। এর মধ্যে বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষকদের জন্য ৮টি পদ থাকলেও শিক্ষক আছেন ২ জন। গণিত শিক্ষকের ৮টি পদের বিপরীতে ৫ জন, ভৌতবিজ্ঞান শিক্ষকের পদ ৬টি পদই শুন্য। সামাজিক বিজ্ঞানে ৪টি পদের বিপরীতে ১ জন, ব্যবসায়ী শিক্ষা পদে ২ জনের বিপরীতে ১ জন শিক্ষক কর্মকর্ত আছেন। এ ছাড়া ইসলাম ধর্ম বিষয়ে ১ জন, শারীরিক শিক্ষায় ১ জন, কৃষি শিক্ষায় ১ জন, চারুকারুতে ২ জন, জীব বিজ্ঞানে ২ জন, ভুগোলে ২ জন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও বর্তমানে আইসিটি ও হিন্দু ধর্মের জন্য আলাদা কোনো শিক্ষক নেই।
অপরদিকে সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়েও ৫২ জন শিক্ষকের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ২৭ জন। বিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদসহ বাংলা বিষয়ে ৬, ইংরেজিতে ১, গণিতে ১, সামাজিক বিজ্ঞানে ৪, ভৌত বিজ্ঞানে ৩, জীববিজ্ঞানে ৩, ব্যবসায় শিক্ষায় ২, ভূগোল ১, ইসলামি শিক্ষায় ১, চারু ও কারুকলায় ১, শারীরিক শিক্ষায় ১ জনসহ মোট ২৫টি পদ শূন্য রয়েছে। ফলে এ দুটি স্কুলে ব্যাপক সংখ্যক বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় বাধ্য হয়ে এক বিষয়ের ক্লাস নিতে হচ্ছে অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের। এতে ক্লাসে পড়া বুঝতে সমস্যা হওয়ায় বাধ্য হয়ে বাইরের শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ স্কুল দুটির শিক্ষার্থীদের।

জিলা স্কুলের নমব শ্রেণির শিক্ষার্থী ঈশান ঢাকা পোস্টকে বলে, আমাদের স্কুলে ৫২ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে ২৫ জন শিক্ষক আছেন। এ কারণে একই শিক্ষকদের অনেক বিষয়ে ক্লাস নিতে হচ্ছে। এ ছাড়া বিজ্ঞান বিভাগের কঠিন বিষয়গুলোর শিক্ষক নেই। এতে কঠিন বিষয়গুলো বুঝতে আমাদের সমস্যা হচ্ছে।
একই স্কুলের নবম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী আল হাসনাইন হামী ঢাকা পোস্টকে বলে, আমাদের স্কুলে আইসিটির কোনো দক্ষ শিক্ষক নেই। বাংলার শিক্ষক অথবা ধর্মের শিক্ষক আইসিটির ক্লাস নিচ্ছেন। তাদের থেকে আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা লাভ করতে ও তাদের বোঝানোর ধরন সঠিকভাবে আয়ত্ত করতে পারছি না।
সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী জামিলা ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলে, আমাদের একজন শিক্ষক একাধিক বিষয়ে পাঠদান করছেন। এতে আমারা পূর্ণাঙ্গ পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক ল্যাবটি অকার্যকর হয়ে পড়েছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক না থাকায়। আমরা চাই আমাদের সব বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক এ স্কুলে আসুক।
একই স্কুলের নবম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী সাদিকা ঢাকা পোস্টকে বলে, স্কুলে শিক্ষক সংকট থাকায় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছি৷ আমাদের বাধ্য হয়ে বাইরের শিক্ষকদের কাছে পড়তে হয়। কিন্ত স্কুলে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক থাকলে ক্লাসে বসে আমাদের পড়া বুঝতে কোনো সমস্য হতো না।
শিক্ষক সংকটে এক শিক্ষককে একাধিক বিষয়ে ক্লাস নেওয়ার বিষয়ে বরগুনা জিলা স্কুলের শিক্ষক মো. আল হাদী দুলাল ঢাকা পোস্টকে বলেন, বর্তমানে আমাদের শিক্ষক সংকট রয়েছে। স্কুলের প্রধান শিক্ষককেও ক্লাস নিতে হচ্ছে। এ ছাড়া আমাদের একাধিক ক্লাস নিতে হয়। আমরা প্রতিদিন সাতটা করে ক্লাস নিই। এই অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়ার কারণে আমরা অতিরিক্ত চাপের মধ্যে থাকি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ছাত্রদের মধ্যে কিছু ঘাটতি থেকে যায়। আমরা শিক্ষকরা পরিশ্রম করি ঠিকই কিন্তু ছাত্রদের কাছ থেকে যে আউটপুট আমরা আশা করি সেটা আসলে কম পাচ্ছি। আর যেহেতু আমাদের সাইন্সের শিক্ষক নেই, সেই ঘাটতি অন্য কোনো শিক্ষক দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য বর্তমানে আমাদের সাইন্সের রেজাল্ট খুব ভালো হচ্ছে না। আর এই সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে হয়ে চলে আসছে।
চাকরির গ্রেড সমতায়ন না থাকায় মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষকরা থাকছেন না জানিয়ে বরগুনা জিলা স্কুলের ইংরেজি বিভাগের সহকারী শিক্ষক মো. রাসেদুজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, সারা দেশেই সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে। আসলে সরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলো মেধাবী শিক্ষককদের ধরে রাখতে পারছে না। এর একমাত্র কারণ যথাসময়ে শিক্ষকদের পদ সমতায়ন না করা। আর এ কারণে মেধাবীরা এসেও আবার অন্য বিসিএস চাকরিতে চলে যাচ্ছেন। সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের প্রমোশনসহ পদ মূল্যায়ন করা হলে এ সংকট কেটে যাবে বলে আমি মনে করি।
বরগুনা জিলা স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল ওহাব ঢাকা পোস্টকে বলেন, স্কুলের শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিনের। আমাদের আইসিটি শিক্ষক, কৃষি শিক্ষক ও হিন্দু ধর্মের জন্য আলাদা শিক্ষক নেই। এ ছাড়া বিজ্ঞান বিভাগেও শিক্ষক নেই। অবকাঠামগত উন্নয়ন হলেও শিক্ষক সংকটের কারণে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ছি। সীমিত সংখ্যক শিক্ষক দিয়ে আমরা শিক্ষার্থীদের ভালো রেজাল্ট করানোর চেষ্টা করছি।
বরগুনার ঐতিহ্যবাহী সরকারি এ শিক্ষ প্রতিষ্ঠান দুটির শিক্ষক সংকটের বিষয়ে সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধান শিক্ষক ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার শিরিন আকতার ঢাকা পোস্টকে বলেন, স্কুল দুটিতে শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিনের। বিগত ১০ বছর আগে আরও বেশি সংকট ছিল। তবে গত তিন বছরে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কিন্তু বিষয়ভিত্তিক যে শিক্ষক দেওয়ার কথা তা আমরা পাইনি। আর এ কারণে শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক যে শিক্ষা দেওয়া দরকার তা দিতে পারছি না। সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর বারবার শূন্য পদের তালিকা চেয়েছে এবং বারবারই দিয়েছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত আমাদের চাহিদা পূরণ হয়নি।
মো. আব্দুল আলীম/এএমকে
