বিজ্ঞাপন

দুই বছর ধরে ‘মা’ ডাক শুনি না, আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই

দুই বছর ধরে ‘মা’ ডাক শুনি না, আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই

পরিবারের ১২ লাখ টাকার ঋণের বোঝা কমানোর অদম্য স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় কাঠমিস্ত্রির কাজ শুরু করেছিলেন ১৮ বছরের তরুণ তারেক। ইচ্ছা ছিল ঢাকার উপার্জন দিয়ে পরিবারের সব ঋণ শোধ করবেন। ইট কিনে নতুন ঘর বানাবেন, বড় ভাই ও ছোট বোনের বিয়ে দেবেন, পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবেন। কিন্তু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে বাড়ি ফিরেছে তারেকের নিথর দেহ। অকাল মৃত্যুতে অংকুরেই বিনষ্ট হয়ে গেছে এই তরুণের স্বপ্ন।

জুলাই আন্দোলনে শহীদ তারেক হলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার চৌডলা ইউনিয়নের দক্ষিণ ইসলামপুর গ্রামের আসাদুল ইসলাম ও ফেরদৌসি বেগম দম্পতির সন্তান। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তারেক ছিলেন এই দম্পতির মেঝ সন্তান।

দেশের মানুষের ওপর অত্যাচার ও বৈষম্য নিরসনের টানে পরিবারকে না জানিয়েই ২০২৪ সালের ১ আগস্ট থেকে নিয়মিত আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন তারেক। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের খবর ছড়িয়ে পড়লে বন্ধুদের সঙ্গে ঢাকার শেরে বাংলা থানা মোড় এলাকায় আনন্দ ও উল্লাসে মেতে ওঠেন তিনি। কিন্তু উল্লাসের সেই মুহূর্তেই আচমকা গুলিবিদ্ধ হন তারেক। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। টানা চার দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে ৯ আগস্ট শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ১০ আগস্ট গ্রামের বাড়ির গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

সরেজমিনে শহীদ তারেকের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তারা এখনও আগের মতোই জীর্ণ ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছেন, যা যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। পরিবারের উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে পরিবারটি এখন শোকাহত। তারেকের বাবা এখনো ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন এবং বড় ভাই কাজ করছেন রাজমিস্ত্রি হিসেবে। সম্প্রতি তারা শহীদ তারেকের ছোট বোনের বিয়ে দিয়েছে।

ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তারেকের বাবা আসাদুল ইসলাম বলেন, আমরাও সেদিন মিছিলে ছিলাম। হঠাৎ খবর পাই ছেলে হাসপাতালে। গিয়ে দেখি চারপাশে রক্ত, সে রক্তে আমার স্যান্ডেল আটকে যাচ্ছিল। অপারেশনের পর ছেলেই কথা বলল, পানি চাইল, কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না।

বর্তমান পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্টের পর যা আশা করেছিলাম, তার একটাও মিলছে না। এখনো টাকা ছাড়া পুলিশ পদক্ষেপ নিচ্ছে না, পোশাক বদলালেও পুলিশ প্রশাসনের মানসিকতা বদলায়নি।

অবশ্য সরকার ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে পরিবারটিকে কিছু আর্থিক ও পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সহায়তার অংশ হিসেবে ১০ লাখ টাকার চেক এবং এককালীন ৫ লাখ টাকা অর্থ সহায়তা পেয়েছে পরিবারটি। মহানন্দা নদীর খাস জমিতে বসবাসকারী এই ভূমিহীন পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গোমস্তাপুর উপজেলার বেলাল বাজারের পাশে ৪ শতক জমি দেওয়া হয়েছে এবং তারেকের মায়ের আয়ের জন্য একটি সেলাই মেশিন দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং বিএনপির পক্ষ থেকে দুই দফায় ৮৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রকাশিত ‘জুলাই শহীদ’ তালিকায় ১০৫ নম্বর ক্রমিকে তারেকের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের আশ্বাস মিললেও শহীদ তারেকের পরিবারের মূল দাবি, ছেলের হত্যার সঠিক ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার। শোকে বিহ্বল মা ফেরদৌসী বেগম আকুতি জানিয়ে বলেন, দুই বছর হতে চলল আমি ছেলেটার মা ডাক শুনি না। কাজ থেকে ফিরেই যে ছেলে মা বলে ডেকে জড়িয়ে ধরত, সেই ডাক আর কোনো দিন শুনতে পাব না। যারা আমার ছেলেকে জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছে, আমি শুধু তাদের উপযুক্ত ও ন্যায্য বিচার চাই।

এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা আব্দুর রহিম বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন করতে গিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুইজন ঢাকায় শহীদ হয়েছে। আমরা সেই পরিবারগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখি। আমরা চাই যারা জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবার রয়েছে তারা যেন প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা পান এবং তাদের পরিবারকে যেন সহযোগিতা করা হয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আনিসুর রহমান বলেন, ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার তারেক নামের একজন যুবক শহীদ হয়েছেন। ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ৪ শতক জমি দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে একটি সাব মারসেবল পাম্প স্থাপন করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৩০ লাখ টাকার মধ্যে ১০ লাখ টাকার চেক হস্তান্তর করে দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকি টাকাও হস্তান্তর করা হবে। এছাড়া পরিবারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ৪ শতক জায়গায় ঘর নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র পাঠানো হবে।

আশিক আলী/আরকে