বিজ্ঞাপন

বাবাকে বাঁচাতে নিজের চিকিৎসা বন্ধ করে সংসারের হাল ধরেছে হৃদয়

বাবাকে বাঁচাতে নিজের চিকিৎসা বন্ধ করে সংসারের হাল ধরেছে হৃদয়

যে বয়সে বই-খাতা আর স্বপ্ন নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সেই পাঁচ সদস্যের সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী হয়ে উঠেছে ১৬ বছরের হৃদয় শেখ। কিডনি রোগে আক্রান্ত বাবার ওষুধ, সংসারের খরচ আর ছোট ভাই-বোনের মুখে খাবার তুলে দিতে প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যাটারিচালিত ভ্যান চালায় সে। অথচ হৃদয় নিজেও কিডনি সমস্যায় ভুগছে। অভাবের কারণে বাবার চিকিৎসার পর নিজের চিকিৎসাটাই বারবার পিছিয়ে দিতে হচ্ছে তাকে।

সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার চৌদুয়ার গ্রামের সুজাব আলী ও আমিনা বেগম দম্পতির ছেলে হৃদয় শেখ। বাবা সুজাব আলী (৪০) গত ছয় বছর ধরে কিডনিসহ বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছেন। হৃদয় নিজেও কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত। পরিবারে রয়েছে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া ছোট বোন সুরভী এবং চার বছরের একটি ছোট ভাই।

তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দেড় শতাংশ জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটি টিনের ঘর। পাশেই খড় রাখার আরেকটি জরাজীর্ণ ঘর। ঘরে ঢুকতেই চোখে পড়ে একটি পুরোনো চৌকি, কয়েকটি বস্তা আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অল্প কিছু আসবাব। সেই চৌকিতেই শুয়ে আছেন অসুস্থ সুজাব আলী। মাথার পাশে বসে ছেলে হৃদয়। পাশে স্ত্রী আমিনা বেগম, কোলে ছোট ছেলে। চৌকির এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে ছোট্ট সুরভী। 

হৃদয়ের ভবিষ্যত নিয়ে কোনো স্বপ্ন নেই। প্রতিদিন ভোরে ভ্যান নিয়ে বের হওয়ার আগে তার সে হিসাব কষে সারাদিনে কত টাকা আয় হলে বাবার ওষুধ কেনা যাবে, সংসারের বাজার হবে, আর ছোট ভাই-বোন দুটোর মুখে খাবার তুলে দেওয়া যাবে। সেই হিসাব মিলাতেই প্রতিদিন নিজের চিকিৎসার প্রয়োজনটুকু পিছিয়ে দিচ্ছে ১৬ বছরের এই কিশোর।

হৃদয় বলেন, আমার বয়স যখন ১০ বছর, তখন থেকেই ভ্যান চালাচ্ছি। তখন বুঝিনি সংসারের দায়িত্ব কী। এখন বয়স ১৬। বাবার প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ টাকার ওষুধ লাগে। বাজারের জিনিসের দামও অনেক বেড়েছে। সব খরচ চালাতে গিয়ে অনেক দিন নিজেরাও ঠিকমতো খেতে পারি না।

একটু থেমে নিচের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, আমিও অসুস্থ। তবু গাড়ি চালাতেই হয়। না চালালে সংসার চলবে না। ছোট বোনের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাবে, বাবার ওষুধও কেনা হবে না। বলতে লজ্জা লাগে, কিন্তু এখন আর পারছি না। সরকারের সহযোগিতা চাই।

বাবা সুজাব আলী বলেন, আগে আমি কাজ করতাম। অসুস্থ হওয়ার পর সব বন্ধ হয়ে গেছে। এখন ছেলের ভ্যান চালানোর আয়ের ওপরই পুরো সংসার। আমি কিডনির রোগী, ছেলেও অসুস্থ। চিকিৎসা করানোর মতো সামর্থ্য আমাদের নেই।

কথা বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মা আমিনা বেগম (৩৫)। তিনি বলেন, ছেলেটা ছোট বয়স থেকেই সংসারের জন্য কষ্ট করছে। ওরও কিডনির সমস্যা হয়েছে। ওকে পড়াতে পারলাম না। এখন মেয়ের পড়াশোনা আর ছোট ছেলেটার ভবিষ্যৎ নিয়ে সারাক্ষণ দুশ্চিন্তা হয়।

প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরেই চরম অভাবের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। কারও কাছে হাত পাততে না চাইলেও এখন তাদের পক্ষে চিকিৎসা ও সংসারের খরচ একসঙ্গে চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাদের আশা, সরকার কিংবা সমাজের বিত্তবান মানুষ এগিয়ে এলে পরিবারটি নতুন করে বাঁচার সুযোগ পাবে।

ভদ্রঘাট ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি মির্জা সামাদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, হৃদয়ের বিষয়টি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। তার আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ, আমরা ব্যক্তিগতভাবে তাদের আর্থিক সহায়তা করব। অন্যদিকে মন্ত্রী মহোদয়কে (বিদ্যুৎমন্ত্রী) বলে তাদের পরিবারের স্থায়ী একটি সমাধানের ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে অবগত করব। 

কামারখন্দ উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মো. আব্দুল মোতালিব ঢাকা পোস্টকে বলেন, বয়স অনুযায়ী হৃদয়ের বাবাকে বয়স্ক ভাতা দেওয়া যাবে। আর আমাদের কাছে আবেদন করলে, যা যা করা সম্ভব আমরা ইনশাল্লাহ করব।

নাজমুল হাসান/আরকে

বিজ্ঞাপন