জুলাই আন্দোলনে গণহত্যায় জড়িত পুলিশ অফিসাররা জানে কীভাবে পালিয়ে থেকে বাঁচতে হয়- এ কারণে তারা তথ্য-প্রযুক্তির জালে আটকা পড়ছেন না বলে মন্তব্য করেছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরপিএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।
বুধবার (২৯ জুলাই) বিকেলে আরপিএমপি কমিশনারের কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে জুলাই গণহত্যায় জড়িত আসামি পুলিশ কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার না করা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
আরপিএমপি কমিশনার আবদুল মাবুদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী শহীদ পরিবারসহ বিভিন্নজনের মামলায় যারা পুলিশ থেকে আসামি হয়েছে, তাদের ব্যাপারে পুলিশের প্রযুক্তিগত ও গোয়েন্দা তদন্ত শাখা এলআইসি রয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় এই শাখা আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করে থাকে। আমরা এসব মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা করে যাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, পুলিশ অফিসার যারা আসামি তারা গ্রেপ্তার হচ্ছে না- শহীদ পরিবার থেকে করা এই অভিযোগ সঠিক। কারণ তারা (পুলিশ অফিসাররা) তো জানে কীভাবে পালিয়ে থেকে বাঁচতে হয়। কীভাবে আসামিদের ধরতে হয়, সেটাও তারা জানে। এ কারণে তথ্য-প্রযুক্তির জালে তারা আটকা পড়ছেন না।
এ সময় আসামি পুলিশদের গ্রেপ্তারে সাংবাদিকদের সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, আপনারা আমাদের তথ্য দিন, আসামিরা দেশের যেখানেই থাকুক আমরা তাদের আইনের আওতায় আনব ইনশাআল্লাহ।
বিগত সময়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা নিজেই বৈষম্যের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে বলেন, চব্বিশের আন্দোলনে ৫ আগস্ট যদি পটপরিবর্তন না হতো, তাহলে আমি আজকে পুলিশ কমিশনার হয়ে এখানে আসতে পারতাম না। গত ১৭ বছর এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এক বছরসহ ১৮ বছর আমি এডিশনাল এসপি ছিলাম। আমার ব্যাচমেটরা এই মেট্রোতে কমিশনার হিসেবে ছিল। বাট আমি ছিলাম এডিশনাল এসপি।
আবদুল মাবুদ বলেন, ওই সময়ে আমার জীবনের ১৮টা বছর চলে গেছে। আমার যৌবনের ১৮টা বছর তো আমি আর ফেরত পাব না। আমার জীবনে যে ক্ষতি হয়ে গেছে, সেটা তো আমি ফেরত পাবো না। এটা শুধু আমার ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, আমার ফ্যামিলিরও ক্ষতি।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসপূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে আরপিএমপির আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, সাঁড়াশি অভিযান, উদ্ধার, গ্রেপ্তার, মাদকবিরোধী কার্যক্রমসহ সামগ্রিক কার্যক্রম ও অর্জনের বিষয়ে সাংবাদিকদের অবহিত করা হয়।
গত তিন মাসে আরপিএমপির সাঁড়াশি অভিযানে ১ হাজার ৬২৬ জনকে গ্রেপ্তার এবং বিপুল পরিমাণ মাদক ও চোরাই মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে উল্লেখ করে মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক সাঁড়াশি অভিযান, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং জনগণের সহযোগিতার ফলে মহানগর এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও সুসংহত হয়েছে।
তিনি বলেন, গত তিন মাসে বিভিন্ন অভিযানে মোট ১ হাজার ৬২৬ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে ওয়ারেন্টভুক্ত ৩১৬ জন, মাদককারবারি ২৮২ জন, চোর ৫৩ জন, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার ৩২ জন, হত্যা মামলার ৫ জন, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের ১২ জন সদস্য এবং অন্যান্য মামলার ৯২৬ জন আসামি রয়েছেন।
মাদকবিরোধী অভিযানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত মাদকের মধ্যে রয়েছে ২ হাজার ৬৮১ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ৪৭ দশমিক ২ গ্রাম হেরোইন, ২০ কেজি ৪ গ্রাম গাঁজা, ১৫৮ বোতল ফেনসিডিল/এসকাফ, ৩৩ দশমিক ৫ লিটার চোলাই মদ, ৪৮ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট এবং ২৬টি মরফিন ইনজেকশন।
চুরি ও ছিনতাই প্রতিরোধে পরিচালিত অভিযানে ১৬ মণ চোরাই তামার তারসহ একটি ট্রাক, ৫টি চোরাই অটোরিকশা এবং ৮টি চোরাই মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা। এ ছাড়াও বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহৃত ও গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে জুয়ার তাস, মোবাইল ফোন, স্ট্যাম্প, চেকসহ বিভিন্ন ধরনের মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ বলেন, অপরাধ দমন, মাদক নির্মূল এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরপিএমপির ধারাবাহিক অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। মহানগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেশাদারত্ব, জবাবদিহিতা এবং জনবান্ধব পুলিশিং কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।
তিনি অপরাধ প্রতিরোধে নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পুলিশের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। তার মতে, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হবে এবং একটি নিরাপদ মহানগর গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
ফরহাদুজ্জামান ফারুক/আরএআর
