বিজ্ঞাপন

গাইবান্ধাকে বিচ্ছিন্নের সুর

‘আমরা বাহের দেশের মানুষ, রংপুরেই থাকতে চাই’

‘আমরা বাহের দেশের মানুষ, রংপুরেই থাকতে চাই’

মানচিত্রে সীমানা বদলানো যায়, কিন্তু বদলানো যায় না একটি জনপদের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর আত্মপরিচয়। গাইবান্ধাকে প্রস্তাবিত বগুড়া বিভাগের অন্তর্ভুক্ত করার আলোচনা সামনে আসতেই জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সেই বার্তাই জোর দিয়ে তুলে ধরছেন। তাদের ভাষ্য, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না গাইবান্ধাকে। তারা এও উল্লেখ করেন, ‘আমরা বাহের দেশের মানুষ, আমরা রংপুরেই থাকতে চাই।’

গত ২৫ জুলাই বগুড়া জেলা প্রশাসন অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বগুড়াকে কেন্দ্র করে নতুন বিভাগ গঠনের ভাবনার কথা তুলে ধরেন। এতে বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, জয়পুরহাট ও গাইবান্ধাকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি আলোচনায় আসে।

প্রতিমন্ত্রীর দাবি, গাইবান্ধার চারজন সংসদ সদস্য এ প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়েছেন। তবে, এ বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরই গাইবান্ধাজুড়ে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। অনেকেই এটিকে ‘মিথ্যা প্রলোভন’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, উন্নয়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। বিভাগ পরিবর্তন নয়, প্রয়োজন অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করা।

এটি আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন

বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট করেন রংপুর অঞ্চলের মানুষের জীবন-সংগ্রাম নিয়ে নির্মিত দেশে-বিদেশি সমাদৃত ‘সাঁতাও’ সিনেমার চলচ্চিত্র নির্মাতা খন্দকার সুমন। পোস্টে তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটি জেলার বিভাগ নির্ধারণে কি শুধু প্রশাসনিক সুবিধাই বিবেচ্য, নাকি ইতিহাস, ভূগোল, সংস্কৃতি এবং মানুষের আত্মপরিচয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ?

তিনি বলেন, গাইবান্ধা ভৌগলিকভাবে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের অংশ, যার অস্তিত্ব গড়ে উঠেছে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট ও করতোয়া নদীর অববাহিকাকে কেন্দ্র করে। এই নদীগুলো শুধু ভূমি নয়, মানুষের জীবনধারা, কৃষি, অর্থনীতি, ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত নির্মাণ করেছে।

তিনি লিখেন, ‘প্রশাসনিক সীমানা পরিবর্তন করা যায়, কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা একটি অঞ্চলের পরিচয় কেবল মানচিত্র এঁকে বদলে দেওয়া যায় না।’

তিনি এও বলেন, নতুন বিভাগ গঠন হতে পারে, তবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সেই অঞ্চলের ইতিহাস কী বলে? তার সাংস্কৃতিক পরিচয় কোথায়? মানুষের ভাষা, জীবনযাপন, অর্থনৈতিক যোগাযোগ ও সামাজিক বন্ধন কোন অঞ্চলের সঙ্গে বেশি গভীর? সবচেয়ে বড় কথা, সেই অঞ্চলের মানুষ নিজেরা কী চান? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। এটি রংপুর বনাম বগুড়ার বিতর্ক নয়, তার পোস্টের প্রায় সবগুলো কমেন্টস তার পক্ষেই মতামত দেয়।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক সাংবাদিক সুদিপ্ত শামীম তার ফেসবুক পোস্টে বলেছেন, ধরুন, একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে শুনলেন, আপনার জেলার নাম, নদী, মাটি, মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনযাপন কিছুই বদলায়নি। কেবল জেলার পাশে লেখা হয়েছে নতুন একটি বিভাগের নাম। প্রশ্ন হলো, এতেই কি একটি জনপদের পরিচয় বদলে যায়?

তিনি বলেছেন, বিস্ময় জাগে, যখন দেখি গাইবান্ধার জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা গাইবান্ধাকে বগুড়াকেন্দ্রিক নতুন বিভাগের সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষে মত দিয়েছেন। তারা নিশ্চয়ই তাদের নিজস্ব যুক্তি ও রাজনৈতিক বিবেচনা থেকেই কথা বলেছেন। কিন্তু একটি জেলার শতবর্ষের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় কি কেবল কয়েকজন জনপ্রতিনিধির মতামতেই নির্ধারিত হবে?

সংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রতিবাদের জোরালো সুর

প্রগতি লেখক সংঘের সাধারণ সম্পাদক রজতকান্তি বর্মন ঢাকা পোস্টকে সরাসরি বলেন, আমরা রংপুর বিভাগে থাকতে চাই, আমরা ‘বাহে’-এর  দেশের মানুষ। ‘কি বারে’ এর সাথে যেতে চাই না, মূল শিকর আমাদের এখানে।

তিনি বলেন, কেন? গাইবান্ধাকেও তো বিভাগ করা যেতে পারে। ১৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গোবিন্দগঞ্জ একটি জেলা হতে পারে। ওদিকে রংপুরের পীরগঞ্জকে জেলা করে অন্যান্য এলাকা নিয়ে গাইবান্ধাকেই বিভাগ করা হোক।

সামাজিক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বাবু বলেন, দাবিটি মোটেও যুক্তি সংগত নয়। আবহমান কাল থেকে আমাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সংস্কৃতি-কৃষ্টি-কালচার আমরা রংপুরের, সেখানেই আমরা যৌক্তিক।

গাইবান্ধার ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব ওয়াজিউর রহমান রাফেল ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা রংপুরে আছি, রংপুরে থাকতে চাই; এটাই আমাদের শিকর। বগুড়ার সংস্কৃতির সাথে আমাদের সংস্কৃতি যায় না।

তিনি বলেন, বিষয়টি আমি সমর্থন করি না। কী লাভ হবে? কী হবে তাতে? বগুড়াকে বিভাগ করুক তাতে আপত্তি নেই কিন্তু গাইবান্ধাকে তাতে যুক্ত করতে হবে সেটাতে আপত্তি আছে। জেলার উন্নয়নে সরকারের ইচ্ছা থাকলে সেটা বিভাগে নিয়ে করতে হবে এটি ‘একটি প্রলোভন’। 

লেখক ও গবেষক জহুরুল কাইয়ুম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বিষয়টি ঠিক হবে না। স্থানীয় মানুষের আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাশা, কালচারাল-সংস্কৃতি বগুড়ার মানুষের সাথে মেলে না।’

এসময় এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সেটি মিথ্যা আশ্বাস। এটার কোনো যৌক্তিকতা নেই। কোনো এলাকার উন্নয়ন করতে হলে প্রথমে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হয়। আমাদের এখানে বালাসি-বাহাদুরাবাদ সেতু করুক। এখানকার কৃষি অর্থনীতির উন্নয়নে পণ্য হিমাগার, চর উন্নয়নবোর্ড, শিল্প কারখানা করুক। বিভাগ করে সেখানে নিয়ে জেলার উন্নয়ন করতে হবে সেটা যৌক্তিক নয়।’

এমপিদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে গাইবান্ধার চার এমপির সমর্থনের কথা বলা হলেও, এ বিষয়ে সরাসরি অবস্থান স্পষ্ট করেননি সংশ্লিষ্টরা এমপিরা। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধা-১ সুন্দরগঞ্জ আসনের এমপি মাজেদুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, বগুড়ায় একটি মিটিংয়ে আমরা জামাতের গাইবান্ধার চার এমপি উপস্থিত ছিলাম। বগুড়া তথা উত্তারাঞ্চলের উন্নয়নে বগুড়া বিভাগ করার বিষয়ে আমরা সমর্থন জানিয়েছি। কিন্তু গাইবান্ধাকে রংপুর থেকে আলাদা করে সেখানে অন্তর্ভুক্ত করা বা কীভাবে গঠন হবে সেসব বিষয়ে কোনো মতামত দেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে, গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি)  আসনের এমপি আব্দুল ওয়ারেছ ঢাকা পোস্টকে বলেন, মিটিংটি উন্নয়ন সমন্বয়ের মিটিং ছিল। কিন্তু বগুড়াকে সরকার কীভাবে কি করবে সেসব বিষয়ে রূপরেখা আমাদের জানানো হয়নি।

এসময় গাইবান্ধাকে বগুড়ার আওতাভুক্ত করে নেওয়ার বিষয়ে আপনার মতামত কি? এমন প্রশ্নে তিনি সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেন,  ‘এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে গাইবান্ধার মানুষের মতামতই গুরুত্বপূর্ণ’

প্রসঙ্গত, সরকারি তথ্য অনুযায়ী ১৮৫৮ সালের ২৭ আগস্ট বৃহত্তর রংপুর জেলার অধীনে ভবানীগঞ্জ নামে একটি মহকুমা গঠিত হয়। ১৮৭৫ সালে ভবানীগঞ্জ নদীগর্ভে বিলীন হলে মহকুমা সদর দপ্তর গাইবান্ধায় স্থানান্তরিত হয়। এ এলাকা এক সময় বাহরবন্দ পরগনার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯২৩ সালে গাইবান্ধা শহরটি মিউনিসিপ্যালিটিতে রূপান্তর হয় এবং ১৯৬০ সালে মিউনিসিপ্যালিটি বিলুপ্ত হয়ে গাইবান্ধা টাউন কমিটি গঠিত হয়। ১৯৭৩ সালে শহর এলাকা গাইবান্ধা পৌরসভায় রূপান্তরিত এবং এরপর ১৯৮৪ সালে গাইবান্ধা জেলা গঠিত হয়। পরবর্তীতে ২০১০ সালের ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের উত্তরের জেলা রংপুরকে সপ্তম বিভাগ হিসেবে ঘোষণা করা হলে রাজশাহী বিভাগে থাকা গাইবান্ধা জেলা রংপুর বিভগের অন্তর্ভুক্ত হয়।

যার উত্তরে তিস্তা নদী ও কুড়িগ্রাম জেলা, পশ্চিমে বগুড়া ও দিনাজপুর, দক্ষিণে জয়পুরহাট ও বগুড়া এবং পূর্বে সরাসরি ব্রহ্মপুর-যমুনা নদী ও জামালপুর জেলার সীমানা রয়েছে।

এসএইচএ