সম্প্রতি টানা দুই সপ্তাহের ভারী বৃষ্টিতে কিশোরগঞ্জে ৬৪ হেক্টর জমির সবজি পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। এতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন সবজি চাষিরা। একই সঙ্গে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহে টান পড়েছে, বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন সবজির দাম। এর প্রভাব পড়েছে কাঁচাবাজারে। হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারা।
জানা যায়, কিশোরগঞ্জের চরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই সবজি উৎপাদনের জন্য পরিচিত। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সবজির আবাদ হয় পাকুন্দিয়া উপজেলায়। এখানকার উৎপাদিত সবজি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। তবে সাম্প্রতিক টানা ভারী বৃষ্টিতে বিস্তীর্ণ এলাকার সবজি ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এতে বাজারে সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং বেড়েছে বিভিন্ন সবজির দাম।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অতিবৃষ্টিতে জেলায় মোট ১২১ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তন্মধ্যে মধ্যে ৬৪ হেক্টরের ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পাকুন্দিয়া উপজেলায়। উপজেলাটিতে ৭০ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৪৩ হেক্টরের সবজি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। জেলায় মোট ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ২ হাজার ৭৫ জন, এর মধ্যে শুধু পাকুন্দিয়াতেই রয়েছেন ১ হাজার ৫৫০ জন।

কৃষি বিভাগ জানায়, জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সবজি উৎপাদন হয় পাকুন্দিয়ায়। এছাড়া বাজিতপুর, কটিয়াদী ও হোসেনপুরেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সবজি চাষ হয়। সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টিতে বিশেষ করে কাঁচামরিচ ও শসার ক্ষেত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নূরে-ই-আলম বলেন, উপজেলায় মোট ৭০ হেক্টর জমির সবজি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪৩হেক্টর জমির সবজি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। যার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও জমির তথ্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
সরেজমিনে পাকুন্দিয়ার চরফরাদী, তারাকান্দি, চরপাকুন্দিয়া, মুনিয়ারীকান্দা ও চরআলগী এলাকায় দেখা গেছে, অধিকাংশ সবজি ক্ষেত পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। বিশেষ করে মরিচ ও শসা বাগান একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে। বৃষ্টি কমে যাওয়ায় কৃষকেরা নতুন করে আবাদ শুরু করলেও বাজারে নতুন ফসল আসতে আরও অন্তত ৩ সপ্তাহ সময় লাগবে।
পাকুন্দিয়ার তারাকান্দি পাইকারি বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ৩০০-৩২০ টাকা, শসা প্রতি কেজি ২৫-৩০ টাকা, জিঙা প্রতি কেজি ৫৫-৬০ টাকা, ধুন্দুল ৪০-৪২ টাকা, চিচিঙা ৭০-৮০ টাকা, ঢেড়স ৫০-৫৫ টাকা, লতা ৪০-৪৫ টাকা, বেগুন ৮০-৮৫ টাকা, করল্লা ১০০-১১০ টাকা, কাকরুল ৪০-৪৫ টাকা, বটবটি ৮০-৮৫ টাকা, পেঁপে ২৩-২৫ টাকা, কুমড়া ৪৫-৫০ টাকা, পান আলু ৩৫-৪০ টাকা, লাউ-৫০-৬০ টাকা প্রতি পিস, কচু প্রতি পিস ৫০-৬০ টাকা। খুচরা বাজারে এসব সবজির দাম আরও বেশি।
চরপাকুন্দিয়ার কৃষক কফিল উদ্দিন বলেন, এক কাঠা জমিতে মরিচ চাষে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ করে মরিচ চাষ করেছিলাম। সেখান থেকে এক থেকে দেড় লাখ টাকার মরিচ বিক্রির আশা ছিল। কিন্তু অতিবৃষ্টিতে পুরো ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে।

সবজি চাষি জালাল উদ্দিন বলেন, সারা বছর সবজি চাষ করেই সংসার চলে। এই মৌসুমে প্রতিদিন এক হাজার টাকার সবজি বিক্রি করতাম। বৃষ্টিতে ক্ষেত নষ্ট হওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছি।
চরফরাদী গ্রামের কৃষক তরুন মিয়া বলেন, আমাদের এলাকার বেশিরভাগ মানুষই সবজি চাষের ওপর নির্ভরশীল। এখানকার উৎপাদিত সবজি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারে। এতে কৃষকেরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তেমনি বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ী জলিল মিয়া বলেন, পাইকারি বাজার থেকেই কাঁচামরিচ ৩৫০ টাকা কেজিতে কিনতে হচ্ছে। তাই খুচরা বাজারে ৪০০ টাকা কেজিতে বিক্রি করতে হচ্ছে।
সবজি ব্যবসায়ী মাহবুব মিয়া বলেন, উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহও কমেছে। নতুন ফসল উঠতে শুরু করলে দাম কিছুটা কমে আসবে।
কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. সাদিকুর রহমান বলেন, অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত জমি ও কৃষকের তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি গুরুত্বসহকারে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সাখাওয়াত হোসেন হৃদয়/এমএমবি
