বিজ্ঞাপন

প্রতিবন্ধকতা থামাতে পারেনি শিহাবকে, গড়েছেন প্রতিবন্ধীদের স্কুল

প্রতিবন্ধকতা থামাতে পারেনি শিহাবকে, গড়েছেন প্রতিবন্ধীদের স্কুল

এক সময় নিজের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে মানুষের উপহাস সহ্য করতে হয়েছে তাকে। মানুষের সঙ্গে মিশতে পারতেন না, নিজেকে গুটিয়ে রাখতেন। কিন্তু সেই শিহাব সিদ্দিকীই আজ অন্য প্রতিবন্ধী শিশু ও তরুণদের জন্য তৈরি করেছেন শিক্ষার সুযোগ ও সামাজিক প্ল্যাটফর্ম।

মাত্র ১৯ বছর বয়সী এই তরুণের বাড়ি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ফিংড়ী ইউনিয়নে। দুই পায়ে ভর দিয়ে সোজা হয়ে হাঁটতে পারে না শিহাব, কথাও জড়িয়ে যায়। নিজের জীবনের প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন শাপলা প্রতিবন্ধী যুব উন্নয়ন সংস্থা। পাশাপাশি নিজের উদ্যোগে চালু করেছেন প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য একটি স্কুল। সেখানে বর্তমানে প্রায় ১৫ শিশু নিয়মিত পড়াশোনা করছে।

শিহাবের বাবা মো. বাহাউদ্দীন সিদ্দিকী বলেন, মাত্র এক বছর বয়সে পড়ে গিয়ে গুরুতর আঘাত পেয়েছিল তার ছেলে। এরপর অসুস্থ হয়ে পড়ে শিহাব। মানুষের সঙ্গে মিশত না। এক সময় ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবার তাকে বিভিন্ন এনজিও সভা-সমাবেশে নিয়ে যেতে শুরু করে। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে সামাজিক কর্মকাণ্ডে আগ্রহ তৈরি হয় তার।

২০১৪ সালে শিশু সুরক্ষা নিয়ে একটি বৈঠকে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে সামাজিক কাজে যুক্ত হন শিহাব। এরপর ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠা করেন শাপলা প্রতিবন্ধী যুব উন্নয়ন সংস্থা।

শুরুতে প্রতিবন্ধী যুবদের নিয়ে কাজ করলেও বর্তমানে সংগঠনটি প্রান্তিক পর্যায়ের তরুণদের নেতৃত্ব ও দক্ষতা উন্নয়নেও কাজ করছে। শিহাবের লক্ষ্য, শুধু প্রতিবন্ধী মানুষকে সহায়তা করা নয়, তাদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা এবং সমাজে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা।

শিহাব বলেন, প্রতিবন্ধীদের অধিকার এবং তাদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির চিন্তা থেকেই সংগঠনটি শুরু করি। পাশাপাশি প্রান্তিক পর্যায়ের তরুণদের নেতৃত্ব তৈরি করতে চাই। বর্তমানে আমাদের কার্যক্রম পুরোপুরি নিজস্ব অর্থায়নে চলছে। সহযোগিতা করলে আরও বড় পরিসরে কাজ করা সম্ভব হবে।

তার উদ্যোগে পরিচালিত স্কুলটিতেও রয়েছে ভিন্ন এক গল্প। সেখানে পড়াশোনা করছে এমন শিশুদের কেউ কথা বলতে পারে না, কেউ শুনতে পারে না, আবার কারও রয়েছে কথা বলার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা। তাদের পড়ানোর দায়িত্ব পালন করছেন শিহাবের মা পাপিয়া সিদ্দিকা।

তিনি বলেন, একজন শিশু আগে কিছুই লিখতে পারত না। এখন সে শূন্য আর ‘অ’ লিখতে পারে। একটি শিশুর সামান্য অগ্রগতিই আমাদের কাছে অনেক বড় পাওয়া। শুধু প্রতিবন্ধী শিশুদের নয়, শিহাবের সংগঠন বদলে দিয়েছে স্থানীয় অনেক তরুণের জীবনও। সংগঠনের সদস্য আশিষ বিশ্বাস বলেন, আগে আমাকে কেউ চিনত না, ভালোভাবে নিত না। সংগঠনের সঙ্গে কাজ করার পর এখন এলাকার চেয়ারম্যান-মেম্বাররাও আমাকে চেনেন এবং সম্মান করেন।

শিহাবের বাবা বাহাউদ্দীন সিদ্দিকী বলেন, আমার ছেলে আজ শুধু নিজের জন্য কাজ করছে না। সে প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়াচ্ছে, তরুণদের নিয়ে কাজ করছে, স্কুল চালাচ্ছে, এমনকি জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও কাজ করছে। বাবা হিসেবে চাই, সবাই যেন তাকে সহযোগিতা করে।

ফিংড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান লুৎফর রহমানও শিহাবের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধীরা যেন নিজেদের কখনো দুর্বল মনে না করে। শিহাবের উদ্যোগ আমাদের জন্য গর্বের। তাদের আরও প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং তারা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।

সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের পাশাপাশি মাদকাসক্তি ও বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক সংকটও রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেই শিহাবের মতো তরুণদের উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে নতুন আশার সৃষ্টি করছে।

ইব্রাহিম খলিল/আরকে