বিজ্ঞাপন

তিন ফুট উচ্চতায় আটকে নেই স্বপ্ন, এইচএসসি দিচ্ছেন মল্লিকা

তিন ফুট উচ্চতায় আটকে নেই স্বপ্ন, এইচএসসি দিচ্ছেন মল্লিকা

অনেকের কাছেই উচ্চতা স্বপ্নের মাপকাঠি। কিন্তু কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর মল্লিকা আক্তারের কাছে স্বপ্নের কোনো উচ্চতা নেই। মাত্র তিন ফুট উচ্চতার এই তরুণীকে প্রতিদিন লড়তে হয় দারিদ্র্য, শারীরিক জটিলতা আর সমাজের বিদ্রূপের সঙ্গে। তবু থেমে যাননি তিনি। মায়ের হাত ধরে পরীক্ষাকেন্দ্রে গিয়ে, ধার করা বই আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সঙ্গী করে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন মল্লিকা। শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে প্রতিটি পরীক্ষার দিন যেন তার কাছে আরেকটি সংগ্রাম জয়ের গল্প।

মল্লিকা আক্তার উপজেলার ফুলবাড়ী সদর ইউনিয়নের পানিমাছকুটি গ্ৰামের মনির উদ্দিন ও আকলিমা দম্পতির মেয়ে। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয় সন্তান। তার কনিষ্ঠ বোনটির উচ্চতা তারই মতো।

শারীরিক বৃদ্ধিজনিত বিভিন্ন জটিলতাকে সঙ্গী করেই নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ফুলবাড়ী ডিগ্রি কলেজের বিজনেস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন মল্লিকা আক্তার। এর আগে ফুলবাড়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছেন তিনি।

জানা গেছে, মল্লিকা শুধু শারীরিক অসুস্থতার শিকার নয়, পারিবারিকভাবে অভাব আর দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত। তাদের সংসার চলে মায়ের চা-পানের দোকানের সামান্য আয় দিয়ে। অভাব অনটনের যাতাকলের মধ্যে দিয়ে তিনি এতদূর আসতে পেরেছেন।

মল্লিকার বাবা মো. মনির উদ্দিন বলেন, আমার কোনো আবাদি জমি নাই। দিনমজুরি করে সংসার চালাতাম। এখন নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে কাজ করতে পারছি না। স্থানীয় একটি সমিতি থেকে লোন নিয়ে ৬ শতক জমি কিনেছি। ওই কিস্তির টাকা পরিশোধ করে আবার লোন নিয়ে একটি খুপড়ি ঘর তুলে সেখানে স্ত্রী ও দুই মেয়ে নিয়ে কোনোরকম থাকি। দুই ছেলেকে বিয়ে দেওয়ার পর তারা আলাদা হয়েছে। তারাও আর আমাদের খোঁজ খবর নেয় না।

মল্লিকার মা আকলিমা বেগম বলেন, আমার স্বামী অসুস্থ। হৃদরোগে আক্রান্ত। বয়স হয়েছে কাজকর্ম তেমন একটা করতে পারে না। তাই বাধ্য হয়ে রাস্তায় চা পানের দোকান দিয়েছি । এখান থেকে যে আয় হয়, তাই দিয়ে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছি।

তিনি বলেন, মল্লিকা পড়াশোনায় খুব ভালো। কিন্তু আমি অভাবের তাড়নায় তাকে ভালো করে পড়াতে পারছি না। কিভাবে পড়াব, আমারতো টাকা-পয়সা নাই। ঠিকমতো বইখাতা কিনে দিতে পারি না। একটা প্রাইভেটও পড়াতে পারি না। সে নিজে থেকে তার বান্ধবীদের কাছ থেকে বই সংগ্রহ করে আবার কখনও খাতায় নোট করে এনে পড়াশোনা করে। তারপর আবার মেয়েটা শারীরিক অসুস্থ। অভাবের কারণে আমার ছেলে দুইটাকে পড়াতে পারিনি। অনেক কষ্ট করে মেয়েটারে এই পর্যন্ত আনতে পেরেছি। আমি আর পারছি না। আমার মেয়েটা একা চলতে পারে না। সাথে নিয়ে কলেজে যাই। সে পরীক্ষা দেয়। আর আমি অপেক্ষা করি। পরীক্ষা শেষে তাকে নিয়ে বাড়িতে চলে আসি। কেউ যদি আমার মেয়ের পড়াশোনার দায়িত্ব নিতো, তাহলে মেয়েটা ভালোভাবে লেখাপড়া করতে পারতো।

মল্লিকা আক্তার জানায়, আমি লেখাপড়া করে শিক্ষক হতে চাই। জীবনে আমার অনেক স্বপ্ন। সব প্রতিবন্ধকতা জয় করে জীবনে ভালো কিছু একটা করতে চাই। আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন।

প্রতিবেশী রাসেল মিয়া বলেন, মল্লিকার বাবা মা খুবই গরিব মানুষ। সংসার ঠিক মতো চলে না তার। যদি কেউ মল্লিকার লেখাপড়ার দায়িত্ব নিত, তাহলে মেয়েটা ভালোভাবে লেখাপড়া করতে পারতো।

ফুলবাড়ী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম রিজু জানান, মল্লিকা আক্তার একজন মেধাবী ছাত্রী। সে পড়াশোনায় খুব ভালো। সে শারীরিক অসুস্থ ও হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় আমি তাকে কিছু কিছু বইসহ যতটুকু সম্ভব সহযোগিতার চেষ্টা করছি। মল্লিকা যদি সুষ্ঠু পরিবেশ পায় আমার বিশ্বাস তাহলে সে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।
এবারে এইচএসসি ও আলম পরীক্ষায় উপজেলার ফুলবাড়ি ডিগ্রী কলেজ, ফুলবাড়ী মহিলা ]

ডিগ্রি কলেজ, সাইফুর রহমান সরকারি কলেজ, বোয়াইলভীড় টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ এবং শাহবাজার আবুল হোসেন সিনিয়র (কামিল) মাদরাসায় পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১১১ জন। এদের মধ্যে পরীক্ষা দিচ্ছে এক হাজার ৭৪ জন। ৩১ জন অনুপস্থিত ছিল।

মমিনুল ইসলাম বাবু/এসএইচএ