কুড়িগ্রামের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ছয় থেকে সাত বছর ধরে অচল পড়ে আছে কোটি কোটি টাকা মূল্যের আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ‘পাসওয়ার্ড’ না পাওয়ায় যন্ত্রগুলো চালু করা যাচ্ছে না। অথচ এসব সরঞ্জাম সচল ও রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে— এমন প্রত্যয়ন দিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোটি টাকার বিল পরিশোধের সুপারিশ করা হয়েছে। অবশিষ্ট বিল ছাড় করাতে এখনো বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির চলছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের নতুন আটতলা ভবনের অপারেশন থিয়েটার (ওটি) কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন কক্ষে ধুলায় ঢেকে পড়ে আছে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম। কোথাও বাক্সবন্দি, কোথাও আবার স্থাপন করা হলেও বছরের পর বছর ব্যবহার হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে ইকো ও ইটিটি মেশিন, পোর্টেবল এক্স-রে, এন্ডোস্কপি, ডায়াথার্মি, ইনফিউশন পাম্প, সিরিঞ্জ পাম্প, ডেফিব্রিলেটর, পালস অক্সিমিটার, মেজর অর্থোপেডিক সেট, আর্থোস্কোপ ও ডপলার হার্ট ডিটেক্টরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র।
অনুসন্ধানে পাওয়া নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচির আওতায় ৩২ কোটি ৯৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে ১৯৩টি চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হয়। সরঞ্জাম সরবরাহের কাজ পায় মেসার্স মাইক্রো ট্রেডার্স ও হারামান এন্টারপ্রাইজ। ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ গঠিত সার্ভে কমিটি সরঞ্জাম গ্রহণের পর হাসপাতাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্ট অপারেশনাল প্ল্যান থেকে ১২ কোটি টাকা বরাদ্দ আসে। পরে ১৭২টি সরঞ্জামের বিপরীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১১ কোটি ৯৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়।
কিন্তু যেসব যন্ত্রপাতির বড় অংশ কখনো চালুই হয়নি, সেগুলো ২০২৫ সালের ১২ জুন তৎকালীন হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক ডা. শহিদুল্লাহ সচল ও রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে— এমন প্রত্যয়ন দিয়ে অবশিষ্ট বিল পরিশোধের সুপারিশ করেন।
এ ঘটনার পর ২০২৫ সালের ১৯ আগস্ট সরঞ্জাম যাচাইয়ের জন্য তিন সদস্যের একটি পরিদর্শন কমিটি গঠন করা হয়। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। এতে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বিশেষ সুবিধা দিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছিল। সে সময়ের বাজারদরের তুলনায় বেশি দামে যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এখন অবশিষ্ট বিল আদায়ে হাসপাতাল, বিভাগীয় কার্যালয়, অধিদপ্তর ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির চলছে।
হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এসি ও ফ্রিজের মতো কয়েকটি সরঞ্জাম ব্যবহার হলেও ইকো-ইটিটি, পোর্টেবল এক্স-রে এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র স্থাপনের পর আর চালু করা হয়নি। এরপরও কীভাবে সেগুলো সচল দেখিয়ে বিলের সুপারিশ করা হয়েছে, তা তাদের বোধগম্য নয়। তাদের দাবি, অবশিষ্ট বিল ছাড় করাতেও এখনো চেষ্টা চলছে।
অচল যন্ত্রপাতির কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা। সরকারি হাসপাতালে ইকো পরীক্ষা করতে ২০০ টাকা এবং ইটিটি পরীক্ষায় ৮০০ টাকা লাগার কথা। কিন্তু এসব সেবা না পাওয়ায় রোগীদের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে ইকোর জন্য এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা এবং ইটিটির জন্য আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তার নিজস্ব অথবা অংশীদারত্বে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক থাকায় হাসপাতালের এসব যন্ত্র চালুর বিষয়ে আগ্রহ দেখানো হয়নি।
চিলমারী থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রবিউল ইসলাম বলেন, সরকার চিকিৎসার জন্য এত কিছু দিয়েছে, কিন্তু আমরা সুবিধা পাই না। পরীক্ষা করতে বাইরে যেতে হয়। আমরা গরিব মানুষ, ধারদেনা করে পরীক্ষা করাতে হয়।
কুড়িগ্রাম ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. নূরে নেওয়াজ আহমেদ বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বকেয়া বিল না পাওয়ায় যন্ত্রপাতির পাসওয়ার্ড দিচ্ছে না। সাবেক কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে জেলার মানুষ উন্নত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত যন্ত্রপাতি চালুর চেষ্টা চলছে।
মমিনুল ইসলাম বাবু/আরএআর
