বাগেরহাটের শরণখোলা একটি উপকূলীয় অঞ্চল। এর কোল ঘেঁষেই বয়ে গেছে বলেশ্বর নদী। এই নদীকে ঘিরে হাজারো মানুষের রয়েছে নানান গল্প। তাদেরই একজন আক্কাস মিয়া (৭০)। তিনি বসবাস করেন উপজেলার বগী বন্দরে। তিন সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে তিনি প্রায় ৬ যুগ ধরে বসবাস করে আসছেন এই বলেশ্বরের তীরে। এক সময় ফসলি জমি, মাছভরা পুকুর, গোলাভরা ধান ও গোয়ালভরা গরু ছিল তার। কালের বিবর্তনে নদী শাসন না করায় ৩ দশক আগে তার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে এই বলেশ্বর।
আক্কাস মিয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি অশ্রুভেজা চোখে ঢাকা পোস্টকে বলেন, এই নদী আমার সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। মা-বাবার কবরটুকুও রক্ষা করতে পারিনি এই স্রোতবাহী নদীর কবল থেকে। এখন বেড়িবাঁধের পাশেই থাকি। বেড়িবাঁধও তেমন টেকসই না।
তিনি বলেন, আতঙ্কে থাকি সবসময়- কখন যেন আবার সেই আইলা-সিডরের মতো বড় ঝড় আসে। কত সরকার গেল, কত সরকার এলো, সবাই শুধু কথা দেয় আমাদের পরিবর্তন করবে, কিন্তু আমাদের দিকে কেউ আর ফিরে তাকায় না। আমরা চাই একটু বাঁচতে। এই নদীটারে যদি একটু শাসন করা যেত, তাহলে একটু ঘুমাতে পারতাম।
১৯৮৫ সাল থেকে ২০২৫— ৪ দশক ধরে উপকূলবাসীর এক ভয়াবহ আতঙ্কের নাম ঘূর্ণিঝড়। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরের সুপার সাইক্লোনের কথা হয়তো সবারই মনে আছে। ১৮ বছর পার হয়ে গেলেও সেই আঘাত এখনো মানুষের রাতের ঘুম হারাম করে দেয়। মানুষ এখনো ভুলতে পারেনি সেই ১৫ ফুট জলোচ্ছ্বাসের কথা, যাতে হাজারো প্রাণহানি ঘটেছিল। ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল মাথা গোঁজার শেষ জায়গাটুকুও।
এই ভয়াবহ স্মৃতির ওপর নতুন আতঙ্কের নাম বেড়িবাঁধ ভাঙন। বাগেরহাটের শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জ উপকূলীয় এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু হস্তান্তরের পর প্রায় তিন বছর যেতে না যেতেই ফাটল, ব্লকধস ও বাঁধের ওপরের মাটির অংশে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে রয়েছে মারাত্মক ঝুঁকি। বলেশ্বর নদীর ভাঙনে যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কায় রয়েছেন স্থানীয়রা। উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন (সিইআইপি) প্রকল্পের আওতায় মোরেলগঞ্জ থেকে শরণখোলা উপজেলার বগী-গাবতলা পর্যন্ত ৩৫/১ পোল্ডারের ৬২ কিলোমিটার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। ২০২৩ সালের ১০ ডিসেম্বর পানি উন্নয়ন বোর্ড তা বাগেরহাটকে হস্তান্তর করে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিরোজপুর, বাগেরহাট ও বরগুনা জেলার একটি নদী বলেশ্বর। এর দৈর্ঘ্য ১৪৬ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ১ হাজার ৬৪৪ মিটার। এক সময় এই নদী ছিল এলাকার মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস। এখন এই নদীই হয়ে উঠেছে মানুষের সর্বনাশের কারণ। সর্বহারা হয়েছে শত শত মানুষ।
মোরেলগঞ্জের ফাঁসিয়াতলা, বড়তলা, সন্ন্যাসী এবং শরণখোলার বগী, গাবতলা, সাউথখালীসহ কয়েকটি স্থান ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এতে বাঁধসংলগ্ন এলাকাবাসীর মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে আতঙ্ক। দ্রুত নদী শাসন করে বাঁধ রক্ষার দাবি জানান এলাকাবাসী।
সাউথখালীর জেলে নুর ইসলাম হোসেন বলেন, সিডরের দিনের কথা এখনো চোখে ভাসে। মনে হতেই বুক কেঁপে ওঠে। আবার এখন বাঁধে ফাটল ধরেছে, ভয়ে রাতে ঘুম হয় না। এই বাঁধ ভেঙে গেলে আমাদের পুরো গ্রাম জলের তলে চলে যাবে।
সন্ন্যাসী এলাকার রোকেয়া বেগম বলেন, আমরা যে কী অবস্থার ভেতরে রয়েছি, আমরাই ভালো জানি। আমরা চাই আল্লাহ আমাদের ওপর রহমত করুক, আর যেন এই বাঁধ না ভাঙে। সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, আমাদের এই বাঁধের দিকে যেন লক্ষ রাখেন, যাতে আমরা বাচ্চাকাচ্চা ও সংসার নিয়ে বেঁচে থাকতে পারি।
একই এলাকার চল্লিশোর্ধ্ব বয়সী আমেনা বেগম বলেন, রাত্রে আমরা ঘুমাই না, ঘুমাইলে ভাঙনের শব্দ আয়। এরপর বড় বড় একটা বুলাক, চাহা এইগুলো পড়তে আছে। একভাবে পড়তে থাকে, আমাদের তো বাচ্চাগুলো লইয়া ঘুম হয় না। এখানে আমরা নৌকাও রাখতে পারি না, তুফানে বাড়ি দিয়ে ভেঙে ফেলায়। সরকার যদি আমাগো একটু সাহায্য করতো, বা এই জায়গায় যদি একটু ব্লক দিতো, তাহলে এগুলো ভাঙতো না।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাগেরহাটের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. হুমায়ুন কবির বলেন, মোরেলগঞ্জ এবং শরণখোলার ফাঁসিয়াতলাসহ কিছু স্থানে বেড়িবাঁধ ধসে গিয়ে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই মুহূর্তে আর যাতে ক্ষতি না বাড়ে এবং ভাঙন প্রতিরোধ করা যায়, সে জন্য জরুরি ভিত্তিতে কিছু কাজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আরএআর
