বিজ্ঞাপন

রাশিয়ায় কাজে গিয়ে ইউক্রেনে ৮ মাস ধরে যুদ্ধবন্দি গাইবান্ধার রিমেল

রাশিয়ায় কাজে গিয়ে ইউক্রেনে ৮ মাস ধরে যুদ্ধবন্দি গাইবান্ধার রিমেল

জীবিকার তাগিদে রাশিয়ায় কাজে গিয়ে ইউক্রেনীয় বাহিনীর কাছে প্রায় ৮ মাস ধরে বন্দি রয়েছেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ছাপরহাটী ইউনিয়নের রিমেল মিয়া (২২)। রিমেলকে দ্রুত ফিরিয়ে আনতে সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন তার পরিবারসহ প্রতিবেশী ও স্বজনরা।

গত বছরের ৮ ডিসেম্বর ইউক্রেনীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের পর থেকেই সেখানে যুদ্ধবন্দি হিসেবে আছেন তিনি। প্রায় ১১ মাস ধরে রিমেলের কোনো খোঁজ ছিল না পরিবারের কাছে। ইউক্রেনে যুদ্ধবন্দি রিমেল উপজেলার ছাপরহাটী ইউনিয়নের উত্তর মরুয়াদহ গ্রামের সৈয়দ আলী ও রেখা বেগম দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান।

রিমেলের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রিমেল স্থানীয় শোভাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০২২ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর ২০২৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দুটি বিষয়ে পরীক্ষা দিলেও বিদেশ যাওয়ার কারণে পরীক্ষা শেষ করতে পারেননি। পরে রাশিয়া যান তিনি।

সূত্র জানায়, সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে ২০২৫ সালের ২৬ মার্চ রাশিয়ায় নির্মাণকাজে যান রিমেল মিয়া। সেখানে প্রথম কয়েক মাস ভালোই ছিলেন। শুরুর ৩ মাসে বাড়িতে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকাও পাঠিয়েছিলেন বলে জানায় পরিবার। কিন্তু পরে রাশিয়ার ওই কাজ ছেড়ে দেন তিনি, এরপরই ঘটে অঘটন।

রিমেলের বাবা শোভাগঞ্জ বাজারের ক্ষুদ্র মুদি দোকানি সৈয়দ আলী ঢাকা পোস্টকে মুঠোফোনে জানান, গাইবান্ধা সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের নশরৎপুর এলাকার আদম ব্যাপারী খান নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে রাশিয়া যান রিমেল। পৌঁছার প্রথম মাসেই কাজ শুরু করেন তিনি। কিন্তু যাওয়ার কয়েক মাস পর খান তাদের জানান, রিমেল কোম্পানি থেকে পদত্যাগ করেছেন এবং এর পরের দায়দায়িত্ব তার নয়। পরে রিমেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে রিমেল নিজে থেকে কাজ ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি বাবা-মাকে জানান। একই সঙ্গে আগামী ২-৩ দিন তাদের সঙ্গে কথা হবে না বলেও জানান তিনি। সেদিনের পর ১১ মাস হয়ে গেছে, রিমেলের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারেনি পরিবারের সদস্যরা।

সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার (৩১ জুলাই) বিকেল নাগাদ স্থানীয় যুবকদের ফেসবুকের মাধ্যমে ভিডিওতে রিমেল ইউক্রেনে যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটকে থাকার বিষয়টি জানতে পারেন বলে জানান বাবা সৈয়দ আলী।

সেখানে ইউক্রেনের একটি ডিটেনশন সেন্টার থেকে জুমের মাধ্যমে একটি গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন রিমেল। ইউক্রেনের ‘কো-অর্ডিনেশন হেডকোয়ার্টার্স ফর দ্য ট্রিটমেন্ট অব প্রিজনারস অব ওয়ার’- এর সহায়তায় ভিডিও কনফারেন্স অ্যাপ জুমে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিল বাংলাদেশি একটি গণমাধ্যম। সেখানে বন্দি থাকা তিনজন বাংলাদেশির সাক্ষাৎকার নেয় সংবাদমাধ্যমটি।

ডিটেনশন সেন্টার থেকে জুমের মাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রিমেল বলেন,‘আমি কোথায় আছি, আমি বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি, আমার পরিবার জানে না। এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে অন্তত তারা জানতে পারবে যে, আমি এখনো বেঁচে আছি।’

রিমেল জানান, প্রথমে তিনি রাশিয়ায় একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে মাসে ৭০০ ডলার বেতনে কাজ শুরু করেন। পরে উচ্চ বেতন ও রাশিয়ার নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতিতে রুশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে চুক্তিতে সই করেন তিনি। কিন্তু প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে মাত্র তিন দিনের প্রশিক্ষণের পর তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেয় রুশ বাহিনী। সেখানে প্রায় এক মাস একটি বাংকারে দায়িত্ব পালনের পর ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ইউক্রেনীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন তিনি।

রিমেলের দাবি, চুক্তিপত্রটি রুশ ভাষায় হওয়ায় তিনি সেটির কিছুই বুঝতে পারেননি। ফলে বিপদের মুখে পড়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সৈয়দ আলী ও রেখা বেগম দম্পতির চার ছেলে সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় রিমেল। বড় ভাই এরশাদ আলী ঢাকায় গার্মেন্টসে চাকরি করেন। তৃতীয় ভাই রুবেল মিয়া সৌদি আরবে কর্মরত এবং ছোট ভাই সোহেল মিয়া নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

স্থানীয়রা জানান, রিমেল ও রুবেল দুই ভাই বিদেশে থাকলেও তার বাবা-মা এখনো একটি ছোট ঝুপড়ি ঘরে থাকেন। কারণ অনেক টাকা ঋণ করে দুই ভাইকে বিদেশ পাঠিয়েছে পরিবারটি। কিন্তু সুখের মুখ দেখার আগেই বিপদ যেন তাদের পিছু ছাড়ছে না।

বাবা সৈয়দ আলী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ছেলের সঙ্গে শেষ কথার পর আজ ১০-১১ মাস হলো কথা হয়নি, অনেক চেষ্টা করেছি, যোগাযোগের কোনো উপায় ছিল না। গতকাল শুক্রবার এলাকার ছেলেরা মোবাইলে রিমেলকে দেখাল, সে নাকি ইউক্রেনে বন্দি আছে। আমি আমাদের সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানাই, আমার ছেলেটাকে যেন দ্রুত ফেরত এনে দেয়।

রিমেলের মা রেখা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ১০-১১ মাস থেকে কথা হয় না, কোনো যোগাযোগ নেই। অনেক চেষ্টা করছি যোগাযোগের, কিন্তু পাই নাই। আপনারা আমার সন্তানকে এনে দেন।

তিনি বলেন, আমরা অসহায়, ৭ লাখ টাকা ঋণ করে ওকে পাঠাইছি। আমার আরেক ছেলে সৌদিতে, সেও ৪ মাস থেকে বসে আছে, কাজ নাই। পোড়া কপাল আমাদের।

রিমেলের চাচাতো বোন সাবিনা বেগম বলেন, সৈয়দ চাচা তার দুই ছেলেকে অনেক টাকা ঋণ করে বিদেশ পাঠিয়েছেন। কিন্তু তাদের কপাল খারাপ। বিদেশ গিয়ে বন্দি হয়ে আছে রিমেল ভাই। আমরা তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাই।

রিমেলের প্রতিবেশী আলমগীর হোসেন বলেন, পরিবারের উন্নতির জন্য রাশিয়া গিয়ে প্রায় এক বছর কোনো খোঁজ ছিল না। পরিবারের, গ্রামের সবারই একটা দুশ্চিন্তা ছিল। অনেকেই ভেবেছিল হয়তো বেঁচে নেই। কিন্তু এখন খবর পেয়ে সবাই স্বস্তিতে আছে। এখন সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি, তাকে দ্রুত সময়ে দেশে আনার ব্যবস্থা যেন করা হয়।

এ ব্যাপারে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি ঢাকা পোস্টকে জানান, বিষয়টি গতকালই জেনেছেন তিনি। তিনি তাঁর ঊর্ধ্বতন সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি অবগত করবেন এবং ওই যুবককে দেশে ফেরত আনার যেসব প্রক্রিয়া রয়েছে, সেখানে তাদের যা করণীয় আছে তা করা হবে বলে জানান।

মাসুম বিল্লাহ/আরএআর