বিজ্ঞাপন

৪৮ বছরের গল্পের ইতি, বন্ধ হয়ে গেল ‘শাপলা টকিজ’

৪৮ বছরের গল্পের ইতি, বন্ধ হয়ে গেল ‘শাপলা টকিজ’

বন্ধ হয়ে গেছে রংপুরের একমাত্র নিয়মিত সিনেমা হল শাপলা টকিজ। দীর্ঘদিনের লোকসানের কারণে শুক্রবার (৩১ জুলাই) থেকে হলটি বন্ধ করে দিয়েছে মালিকপক্ষ। ফলে বিভাগীয় এই নগরীতে আর কোনো সিনেমা হল থাকলো না।

শনিবার (১ আগস্ট) দুপুরে সিনেমা হল বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হল ব্যবস্থাপক শাহাবুদ্দিন।

জানা গেছে, ১৯৭৮ সালে গড়ে ওঠে শাপলা টকিজ। এই হলের মূল মালিক নজরুল ইসলাম মাসুমের মৃত্যুর পর তার ভাই মিন্টু মিয়া হলের দায়িত্ব নেন। কিন্তু হলের ব্যবসা ভালো না হওয়ায় শাপলা টকিজ ভাড়া দিয়ে দেওয়া হয় কামাল হোসেন নামে এক চলচ্চিত্র প্রযোজকের কাছে। সেই থেকে শাপলা টকিজের তত্ত্বাবধানে ছিলেন হল ব্যবস্থাপক শাহাবুদ্দিন।

তিনি ব্যবসার মন্দাভাবে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, আশা ছিল শাপলা সিনেমা হল ভালো চলবে। কিন্তু লোকসানের বোঝা এত বেশি ভারী হয়ে গেছে, এখন হলটি চালানো আর সম্ভব হচ্ছে না।

 শাহাবুদ্দিন জানান, শাপলা টকিজে যে আয় হতো, তা দিয়ে হলভাড়া দেওয়া, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ ও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ কঠিন ও কষ্টকর ব্যাপার ছিল। শুধু চলচ্চিত্র শিল্পকে টিকিয়ে রাখতেই শাপলা হল ভাড়া নিয়ে ভর্তুকি দিচ্ছিলেন মালিক। তবে সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ঘটনা এবং চলচ্চিত্রের ব্যবসায় মন্দাভাবের কারণে কর্তৃপক্ষ সিনেমা হলটি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

জানা গেছে, ১৯৭৮ সালে ‘বসুন্ধরা’ সিনেমা প্রদর্শনের মাধ্যমে রংপুর শহরের তেঁতুলতলায় (বর্তমান শাপলা চত্বর) যাত্রা শুরু করে ‘শাপলা টকিজ’ নামের নতুন এই সিনেমা হলটি। সে সময় রংপুরে সেটাই ছিল সবচেয়ে ভালো সিনেমা হল। হলের পরিবেশ ও সাজসজ্জার কারণে দর্শকপ্রিয়তায় ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছিল ‘শাপলা টকিজ’। তখন রংপুরের পাশাপাশি আশপাশের জেলা থেকেও দর্শকরা এই হলে সিনেমা দেখতে আসতেন।

দীর্ঘ ৪৮ বছরের পুরোনো ‘শাপলা টকিজ’ গত সপ্তাহে সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘বলবো কথা বাসর ঘরে’ প্রদর্শন শেষে প্রবেশফটকে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে কোনোমতে টিকে থাকা এই হলের ধুঁকে ধুঁকে টিকে থাকার গল্পের ইতি টানলো কর্তৃপক্ষ।

স্থানীয়রা জানান, গত ১৯ এপ্রিল শাপলা সিনেমা হলের তৃতীয় তলায় বিশেষভাবে তৈরি করা কক্ষ থেকে অনৈতিক কার্যক্রমের অভিযোগে ৩৭ জনকে আটক করে পুলিশ। ওই ঘটনার পর থেকেই শোনা যাচ্ছিল, সিনেমা হলটি বন্ধ হতে পারে। এলাকার অনেকেই সিনেমা হলটি বন্ধ করতে বিভিন্নভাবে চাপও সৃষ্টি করেছিলেন। সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার (৩১ জুলাই) সকালে সিনেমা হলের সামনে সাঁটানো ব্যানার নামিয়ে ফেলতে দেখেন তারা। এদিন সিনেমা হলের ভেতরে থাকা বেশ কিছু আসবাবসহ সরঞ্জামও অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়। তবে কী কারণে সিনেমা হলটি বন্ধ করা হয়েছে, তা জানা নেই তাদের।

রংপুরের প্রথম হল ছিল মডার্ন হল। সেটি বন্ধ হওয়ার পর রংপুরে একে একে গড়ে ওঠে শাপলা টকিজ, দরদী হল, ওরিয়েন্টাল, লক্ষ্মী টকিজ, নূর মহল (আকাশ সিনেমা হল), চায়না টকিজ, সেনা হলসহ মোট ১০টি সিনেমা হল। এর আগেই বাকি সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এবার সর্বশেষ সিনেমা হল শাপলা টকিজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে রংপুর সিনেমা হলশূন্য হয়ে গেল। এর মধ্য দিয়ে রংপুরে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত শেষ সিনেমা হলটিরও পর্দা আনুষ্ঠানিকভাবে নেমে গেল।

হল মালিক সূত্রে জানা যায়, মাসুম মিয়া সুস্থ বিনোদনের জন্য শাপলা টকিজ নামের এই হল নির্মাণ করেন। ১৯৭৮ সালের ১৬ জুন তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহে আলম হলটির উদ্বোধন করেন। হলের প্রতিষ্ঠাতা মারা যাওয়ার পর মিন্টু মিয়া হল পরিচালনার দায়িত্ব নেন। কিন্তু ধীরে ধীরে দর্শক কমে যাওয়ায় এবং লোকসানের কারণে তিনি হল ভাড়া দেন। হলটি ভাড়া নেন চলচ্চিত্র প্রযোজক কামাল হোসেন।

লোকসান ঠেকাতে চুক্তি ভঙ্গ করে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এতে হল মালিকের পরিবারের মান-সম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে তারা হলটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন।

হল মালিকপক্ষের প্রতিনিধি সাইদুর রহমান সুমন বলেন, হলটি ভাড়ায় পরিচালিত হলে অনৈতিক কাজের অভিযোগ ওঠে। এটি আমরা মেনে নিতে পারিনি। ফলে রংপুর চেম্বারের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করে বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং শুক্রবার থেকে হলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে  চলচ্চিত্র প্রযোজক কামাল হোসেনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ফরহাদুজ্জামান ফারুক/আরএআর

বিজ্ঞাপন