বিজ্ঞাপন

রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

চতরাহাটের ১০ একর জমি মিলেমিশে ভোগদখল, হাট বসছে রাস্তায়

চতরাহাটের ১০ একর জমি মিলেমিশে ভোগদখল, হাট বসছে রাস্তায়

প্রায় ১০ একর জমি থাকলেও তা বেদখল হওয়ায় একেবারে ভূমিহীন বনে গেছে পীরগঞ্জের চতরাহাট। রংপুর জেলার সবচেয়ে বড় এই হাট পীরগঞ্জের চতরা ইউনিয়নের অন্তর্গত। স্থানীয় প্রভাবশালী, জনপ্রতিনিধি, চাকরিজীবী, রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী মহলের ৩ শতাধিক ব্যক্তি মিলেমিশে হাটের জমি অবৈধভাবে দখলে নিয়েছেন। ফলে সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।

অপরদিকে হাটে ড্রেনেজ ব্যবস্থা নাজুক, ডাস্টবিন না থাকা, জলাবদ্ধতা, রাস্তাগুলো ভেঙে চুরমার হওয়ায় হাটুরেরা নাগরিক সুবিধাও পাচ্ছেন না। ইউনিয়ন ভূমি অফিস বারংবার হাটের জমি দখলমুক্ত করতে গিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের বাঁধার মুখে পড়ছেন। মোটা দাগে বলতে গেলে ‘চতরাহাট এখন নিজভূমে পরবাসী।’

২০২৩ সালের ২৮ আগস্ট হাটটির জমি উদ্ধারে চতরা ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। 

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চতরা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অধীনে ইকলিমপুর মৌজায় চতরাহাটের অবস্থান। ওই মৌজায় তফশিল বর্ণিত সিএস ও এসএ রেকর্ডিয় সম্পত্তি ১নং খতিয়ানভুক্ত ৮টি দাগে ৯ একর ৮০ শতক জমি হাটের নামে রয়েছে। কয়েক বছর আগে প্রায় কোটি টাকায় হাটটি ইজারা হতো। কিন্তু বিভিন্ন সরকারের আমলে দলীয় ক্ষমতা আর স্থানীয় প্রভাবে বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ হাটের জমি অবৈধভাবে নিজেদের দখলে নেয়। দখলকৃত জমিতে ৪ শতাধিক অবকাঠামো নির্মাণ করায় রাস্তায়, অন্যের জমি এবং অন্যত্র হাটটি বসানো হয়।

এখানে উল্লেখ্য যে, সেলিম মিয়া ও ফরমান মিয়ার নামে ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে হাটের ৭৮ নং দাগে ১৬ শতক এবং ১৭০ নং দাগে ৯ শতক জমি বিধিবহির্ভূতভাবে বন্দোবস্ত দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। হাটের জমি বেদখল হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়ছে খুচরা, পাইকারি, আড়তদার, ব্যবসায়ী, পথচারী ও সকল যানবাহন। ভূমি অফিস অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে জমি উদ্ধারে পদক্ষেপ নিলেই একটি সংঘবদ্ধ চক্র ব্যবসায়ীদেরকে উসকে দেয় বলে জানা গেছে। 

২০২৪ সালে সরকার পতনের পর স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান হবিবর মেম্বার এক বছরের জন্য ৯৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় হাটটি ইজারা নেন। তিনি হাটের জায়গা তাকে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অসংখ্যবার লিখিত আবেদন, অভিযোগ করেন। কিন্তু জায়গা বুঝে না দেওয়ায় তিনি হাইকোর্টে রিট করেন। পরবর্তীতে তিনি আর হাটটি ইজারা নেননি। ফলে হাটটি খাস কালেকশনে দেওয়া হয়। 

ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান বলেন, হাটের অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হলে প্রতি বছর ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ইজারা ডাক হতে পারে।

চতরা ইউনিয়ন ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, হাটের জায়গা কমপক্ষে ৪০০ জনের দখলে চলে গেছে। এরমধ্যে ২০২৩ সালে ৩০৮ জনকে অবৈধ দখলদার হিসেবে জমির পরিমাণসহ তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। ওই তালিকায় দেখা গেছে ৩৫-৩৬ টি গ্রামের মানুষ প্রতিযোগিতা করে হাটের জায়গা দখলে নিয়েছেন।

কাঁচামাল বিক্রেতাগণ জানান, এই হাটে এত জায়গা-জমি থাকার পরেও আমাদের কাঁচামাল বিক্রয় করতে হচ্ছে চতরা ডিগ্রি কলেজ মাঠ ও ধাপেরহাট টু চতরা রাস্তার দুপার্শ্বে। রাস্তায় হাট বসানোর কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। এছাড়াও প্রতিনিয়ত স্কুল, কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রী ও পথচারীরা কমবেশি দুর্ঘটনার সম্মুখীন হচ্ছেন।

চতরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনামুল হক শাহীন জানান, ২০২০ সালের দিকে রংপুরের জেলা প্রশাসক চতরা হাটের পেরি ফেরি নির্ধারণ করেন। ওই সময় অবৈধভাবে দখলকৃত জমি উদ্ধারে মাইকিং করে লাল নিশানা পুঁতে দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি প্রকৃত ব্যবসায়ীদেরকে পুনর্বাসনের জন্য ভূমি অফিস ওই হাটে ৪০০টি দোকান স্থাপনের পরিকল্পনা করে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি। 

তিনি আরও জানান, চতরা হাটের অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে সরকারিভাবে ব্যবসায়ীদেরকে বরাদ্দ দেওয়া হলে ৩ থেকে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত ইজারা হবে। এতে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে। হাটের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি অবৈধ দখল থাকায় সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। 

স্থানীয় ভূমি অফিসের তহসিলদার নূরে আলম জানান, সরকারি চতরা হাটের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার স্বার্থে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের মধ্যে দোকান বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হলে যেমন চতরা হাটের শ্রীবৃদ্ধি হবে, তেমনি সরকারি রাজস্ব আদায় নিশ্চিত হবে। সেক্ষেত্রে জনসাধারণের সাহায্য একান্ত প্রয়োজন।

পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান জানান, সহকারী কমিশনার (ভূমি) সরেজমিনে তদন্ত করছে। শিগগিরই অবৈধ উচ্ছেদের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

ফরহাদুজ্জামান ফারুক/এসএইচএ