কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের হিমছড়ি ও দরিয়ানগর সৈকতে প্রায় এক যুগ ধরে প্যারাসেইলিং পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু রোমাঞ্চকর এই বিনোদন এখন নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্নের মুখে। গত দুই বছরে একের পর এক দুর্ঘটনায় অন্তত ১০ পর্যটক আহত হয়েছেন। সর্বশেষ গতকাল শনিবার (১ আগস্ট) প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়।
প্রতিবার দুর্ঘটনার পর প্রশাসন কিছুদিনের জন্য ব্যবস্থা নিলেও পরে আবার আগের মতোই প্যারাসেইলিং চালু হয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, অনেক প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা সরঞ্জামের মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত কর্মী ও আধুনিক উদ্ধারব্যবস্থারও ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি অনুমোদন, তদারকি ও নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা দুর্বলতা।
গতকাল শনিবার দুপুরে দরিয়ানগরের ‘ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিং’-এর একটি রাইডে অংশ নেন খুলনা সদরের বানিয়াখামার এলাকার শৌভিক রায় (৩০)। উড্ডয়নের একপর্যায়ে তিনি নিরাপত্তা হারনেস থেকে ছিটকে সমুদ্রে পড়ে যান। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ময়নাতদন্ত শেষে রাতেই শৌভিকের মরদেহ খুলনায় নিয়ে যাওয়া হয়।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. সুবক্তগীন মোহাম্মদ সোহেল বলেন, হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
গত বছরের ৩০ আগস্ট একই এলাকার একটি প্যারাসেইলিং রাইড থেকে ছিটকে এক পর্যটক ঝাউগাছে আটকে যান। ওই ঘটনার পর জেলা প্রশাসন সাময়িকভাবে সব কার্যক্রম বন্ধ করেছিল।
এরও আগে ২০ মে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে নিয়ম ভেঙে একসঙ্গে দুজনকে উড্ডয়ন করানোর সময় সমুদ্রে পড়ে আহত হন এক নারী পর্যটক। তখন একটি প্রতিষ্ঠানের সরঞ্জাম জব্দ এবং কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলেও সেই সিদ্ধান্ত দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত দুই বছরে অন্তত ১০ জন পর্যটক ছোট-বড় বিভিন্ন দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। তবে এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ কোনো তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা নিরাপত্তা সংস্কারের তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
দরিয়ানগর ও হিমছড়িতে বর্তমানে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান প্যারাসেইলিং পরিচালনা করছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক প্রতিষ্ঠানেই ব্যবহৃত হারনেস, লাইফ জ্যাকেট, রশি ও অন্যান্য নিরাপত্তা সরঞ্জামের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আধুনিক উদ্ধার নৌযান, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা কিংবা প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মীও সব প্রতিষ্ঠানে নেই।আবহাওয়া প্রতিকূল হলেও অনেক সময় রাইড বন্ধ রাখা হয় না। পর্যটকের চাপ এবং ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় নিরাপত্তার চেয়ে আয়ের বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পায়।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১০ মিনিটের একটি প্যারাসেইলিং রাইডের জন্য দেড় হাজার থেকে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। পর্যটনের মৌসুমে প্রতিদিন শতাধিক পর্যটক এই সেবা গ্রহণ করেন। ফলে ব্যবসাটি অত্যন্ত লাভজনক হলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সেই অনুপাতে বিনিয়োগ নেই।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব নজরুল ইসলাম বলেন, প্রায় সময় প্যারাসেইলিং রাইডে দুর্ঘটনা ঘটে। কোনো প্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। নেই প্রশিক্ষিত অপারেটর, উদ্ধার জলযান ও প্রাথমিক চিকিৎসাব্যবস্থা। নিরাপত্তা মান যাচাই না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধ রাখা উচিত।
জেলা প্রশাসন বলছে, চলতি বছরের জুনে প্যারাসেইলিং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমতির মেয়াদ শেষ হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, প্রশাসনের অগোচরে প্যারাসেইলিং পরিচালিত হচ্ছিল। পর্যটক মৃত্যুর ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল হাসান জানান, দুর্ঘটনার পর ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিংয়ে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী জব্দের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, শুধু দুর্ঘটনার পর অভিযান চালালে হবে না। আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা নীতিমালা, প্রশিক্ষিত অপারেটর, বাধ্যতামূলক বীমা, নিয়মিত কারিগরি পরিদর্শন এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এমন দুর্ঘটনা আবারও ঘটবে।
ইফতিয়াজ নুর নিশান/আরএআর
