বিজ্ঞাপন

কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল

২৫ লাখ মানুষের চিকিৎসক মাত্র ১৯ জন, সেকমোতেই চলছে চিকিৎসা

২৫ লাখ মানুষের চিকিৎসক মাত্র ১৯ জন, সেকমোতেই চলছে চিকিৎসা

কুড়িগ্রামে সোয়া লাখ মানুষের জন্য একজন চিকিৎসক, সর্বরোগের চিকিৎসা দিচ্ছেন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসাররা (সেকমো)। নামমাত্র আধুনিক হাসপাতালে চিকিৎসক-জনবল,ওষুধ সংকট আর নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন রোগীসহ সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, দেশের উত্তরের দারিদ্রপীড়িত অঞ্চলের প্রায় ২৫ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে ২০১৭ সালে কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালটি ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। সেই হিসেবে ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৮ তলা বিশিষ্ট এই হাসপাতালটি কর্তৃপক্ষের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে নির্মাণের পর থেকে শুধুমাত্র রোগী ভর্তি ছাড়া আর কোনো কার্যক্রম নেই নতুন ভবনে। নকশাকৃত ত্রুটির জন্য নেই জরুরি রোগী বহনের জন্য সিঁড়ি ও আলাদা লিফ্‌ট। প্রায় ঝড়ের মধ্যে নতুন ভবনে গ্লাস ভেঙে, টাইলস খুলে পড়ে ঘটছে দুর্ঘটনা। ফলে নিরাপত্তাহীনতায় রোগী-স্বজন ও সেবাদানকারীরা।

জেলার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ১৭৭টি পদের বিপরীতে চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ১৯ জন। এছাড়াও দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেণির ৩৮৮টির মধ্যে ২৩১টি পদই শূন্য রয়েছে। ফলে প্রায় সোয়া লক্ষাধিক মানুষের জন্য একজন করে চিকিৎসক রয়েছে এই হাসপাতালে। হাসপাতালে চিকিৎসক সংকটের কারণে জরুরি বিভাগ এবং বহিরর্বিভাগে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারই (সেকমো) এখন ভরসা।

অভিযোগ রয়েছে, চিকিৎসক না থাকায় সর্বরোগের চিকিৎসা দিচ্ছেন সেকমোরা। সেকমো নির্ভরশীল এই হাসপাতালে জটিল ও বিশেষায়িত রোগের চিকিৎসা না পাওয়ায় বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের উপর নির্ভর হতে হচ্ছে। এতে করে দারিদ্রপীড়িত এই অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসার পিছনে সময় ও অর্থ ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক না থাকা এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের অভাবে সাধারণ মানুষ সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগী আসায় জায়গা সংকুলানের জন্য বারান্দা ও মেঝেতে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। নানা সংকট নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে চলছে হাসপাতালটি। ফলে নামমাত্র স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে চলা জেলার প্রধান এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সেবার মানে গতি আসছে না। সেবার বদলে মিলছে কষ্ট আর হয়রানি। চিকিৎসক সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে সেকমোরা।

রোগী জুলেখা বেগম বলেন,এই হাসপাতালে কয়েকটি বারান্দায় রেলিং নেই, বাথরুমের দরজা, দেয়াল, দেয়াল থেকে টাইলস খসে পড়ে এবং ঝড় ও বজ্রপাতে বারান্দার জানালা ভেঙে পড়ে। এছাড়াও লিফ্‌ট দুটো ছোট হওয়ায় প্রায় রোগী এবং জরুরি ওষুধ আনতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। সেবা নিতে এসে উল্টো ভোগান্তিতে পড়তে হয় আমাদের।

মজিবর রহমান বলেন, এখানে শুধু টাকা খরচ হয় কিন্তু সেবা পাওয়া যায় না। ওষুধ নেই, কোনো পরীক্ষা নিরীক্ষা বাইরে থেকে করতে হয়। আর ২৪ ঘণ্টায় একবার ডাক্তার আসে রাউন্ড দিতে। ছুটির দিন তো ডাক্তারের দেখাই পাওয়া যায় না।

বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা বুলবুলি আক্তার বলেন, প্রায় ২ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও সিরিয়াল পাচ্ছি না। সিরিয়াল পাওয়া গেলেও সেকমো ডাক্তারকে দেখাতে হয়। ইমার্জেন্সি হোক আর বহির্বিভাগে হোক, এখানে সেকমো ডাক্তারই ভরসা।

তিনি আরও বলেন, সেকমো দিয়ে সেবা দেওয়ায় ভুল চিকিৎসা কিংবা চিকিৎসা অবহেলায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগও রয়েছে। চিকিৎসক সংকটে বহির্বিভাগে প্রতিদিন শতশত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে দায়িত্বরতদের। আর ভর্তি রোগীদের বিড়ম্বনা আরও দুঃসহ।

অ্যাম্বুলেন্সচালক এরশাদুল হক বলেন, প্রায় ২০ বছরের পুরোনো ২টি অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে চলছে রোগী বহন। এতে করে প্রায় মাঝ পথে বিকল হয়ে চালক, রোগী-স্বজনদের পড়তে হচ্ছে বিড়ম্বনায়। জরুরি ভিত্তিতে নতুন অ্যাম্বুলেন্স দরকার।

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. নুর নেওয়াজ আহমেদ জানান, চিকিৎসক সংকটের কারণে সেকমো দিয়ে চলছে হাসপাতাল। নতুন ভবনেও রয়েছে নকশাগত ত্রুটি।

তিনি আরও বলেন, চিকিৎসক যোগদান করলেও উচ্চতর ডিগ্রির জন্য লবিং তদবির করে চলে যাচ্ছেন। এতে করে চিকিৎসক সংকট দূর হচ্ছে না। স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়নের জন্য কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করবেন বলেও আশ্বাস দেন তিনি।

মমিনুল ইসলাম বাবু/এসএইচএ