রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে গ্রাহকদের আমানতের কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট দায়ীদের নাম উঠে এসেছে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে মামলা করা হয়েছে।
রোববার (২ আগস্ট) রাজবাড়ীর সিনিয়র বিশেষ জজ আদালতে কুষ্টিয়ার ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল কার্যালয়ের পোস্ট অফিস পরিদর্শক (প্রশাসন) মো. শহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় তৎকালীন পোস্ট মাস্টারসহ ৭ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে আসামি করা হয়েছে।
মামলায় অভিযুক্তরা হলেন- রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের সদ্য সাবেক পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্র বিশ্বাস, রাজবাড়ী সদর উপজেলার বাঘিয়া গ্রামের আয়ুব আলী মৃধার ছেলে লেটার রাইটার শিহাব মৃধা, শিহাবের ভাই পিএলআই এজেন্ট মাহবুব হাসান মৃধা, প্রধান ডাকঘরের অফিস সহায়ক রেজাউল আলম, তৎকালীন ট্রেজারার নাজমুল হাসান, পোষ্টাল অপারেটর মোঃ গোলাম মোস্তফা বাচ্চু, পোষ্টাল অপারেটর প্রনব কুমার সরকার।
অভিযোগে জানা যায়, অভিযুক্তরা পরস্পর যোগসাজসে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ৬১জন গ্রাহকের ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের আমানত ৯১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন। শিহাব মৃধার মাতা শিউলী বেগম গত ৩০ জুলাই তারিখের মধ্যে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকারনামা প্রদান করেন। কিন্তু পরবর্তীতে ফেরত দিতে অস্বীকার করেন।
রাজবাড়ী জেলা বারের আইনজীবী ও দুর্নীতি দমন কমিশনের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) বিজন কুমার বোস বলেন, মামলাটি বিচারক গ্রহণ করেছেন। আদেশ পরবর্তীতে প্রদান করবেন।
তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা গেছে, রাজবাড়ীর প্রধান ডাকঘরের লেটার রাইটার শিহাব মৃধা (৩০) কর্তৃক গ্রাহকদের আমানত থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে। অভিযোগের পর ডাক বিভাগের পক্ষ থেকে কুষ্টিয়া সার্কেল ও খুলনা ডিভিশন কার্যালয় থেকে দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে নথিপত্র, হিসাব-নিকাশ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে দায়ীদের চিহ্নিত করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে দায়ী হিসেবে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের লেটার রাইটার শিহাব মৃধা, শিহাব মৃধার ভাই পিএলআই এজেন্ট মাহবুব মৃধা, তৎকালীন পোস্ট মাস্টার ও বর্তমানে কুষ্টিয়া ডাকঘরে কর্মরত বিকাশ চন্দ্র বিশ্বাস, রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের প্রাক্তন পোস্টাল অপারেটর নাজমুল হাসান, মো. গোলাম মোস্তফা বাচ্চু, ট্রেজারার প্রণব কুমার সরকার ও এমএলএসএস মো. রেজাউল করিমের নাম উঠে আসে।
তদন্ত প্রতিবেদনে কার কী ধরনের দায়িত্ব ছিল, কীভাবে অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে এবং কার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে—এসব বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে অর্থ হারানো গ্রাহকরা দ্রুত দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের আমানতের টাকা ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং এখনো অনেকেই তাদের সঞ্চিত অর্থ ফেরত পাননি।
ডাক বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তী বিভাগীয় ও আইনগত কার্যক্রম গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের স্বার্থ সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও নেওয়া হবে।
খুলনা দক্ষিণাঞ্চল পোস্ট মাস্টার জেনারেলের কার্যালয়ের ডেপুটি পোস্ট মাস্টার জেনারেল (তদন্ত) ও তদন্ত কমিটির সদস্য জুবাইদা গুলশান আরা বলেন, রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাতের ঘটনাটি নজরে এলে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে লেটার রাইটার শিহাব মৃধা ও তার ভাই পিএলআই এজেন্ট হিসেবে কর্মরত মাহবুব মৃধা, রাজবাড়ী ডাকঘরের প্রাক্তন পোস্ট মাস্টার ও পোস্টাল অপারেটরসহ মোট ৭ জনকে দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও মামলা করার জন্য বলা হয়েছে। দায়ীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা তো প্রাথমিকভাবে তদন্ত করেছি। সামনে আরও তদন্ত হবে। বিষয়টি ডাক বিভাগের ঊর্ধ্বতন পর্যায় পর্যন্ত গিয়েছে। সেকারণে তদন্ত এখানেই শেষ নয়।
কুষ্টিয়ার ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল কার্যালয়ের পোস্ট অফিস পরিদর্শক (প্রশাসন) মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, রাজবাড়ীর প্রধান ডাকঘরের অর্থ আর্তসাতের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি ৭ জনকে দায়ী করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে এবং বিভাগীয় মামলা ও অন্যান্য আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সুপারিশ করেছে। তারই আলোকে আমি নিজে বাদী হয়ে রাজবাড়ীর বিজ্ঞ সিনিয়র বিশেষ জজ আদালতে প্রধান ডাকঘরের ৭ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছি।
জানা গেছে, তদন্ত প্রতিবেদনে ৬১ জন গ্রাহকের ৯১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা আত্মসাতের বিষয়টি সামনে আসে।
তবে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘর সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত মোট ৭৬ জন গ্রাহকের অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি তাদের সামনে এসেছে। এতে কোটি টাকারও বেশি অর্থ লোপাট হয়েছে বলে তারা ধারণা করছেন।
এদিকে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা জানাজানি হলে লেটার রাইটার শিহাব মৃধা, তার ভাই পিএলআই এজেন্ট মাহবুব মৃধা পালিয়ে যান। এছাড়াও পোস্টাল অপারেটর নাজমুল হাসানকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে কুষ্টিয়াতে বদলি করা হয়েছে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ভূক্তভোগী গ্রাহকদের পক্ষে নাছরিন আক্তার বাদী হয়ে ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করলে রাজবাড়ী অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও সদর আমলি আদালতের বিচারক মো. হায়দার আলী অভিযুক্ত সকলের বিরুদ্ধে সমন ইস্যুর আদেশ দেন।
মীর সৌরভ/আরএআর
