বিজ্ঞাপন

ফেনীতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে অচল ফিলিং স্টেশন, বাসাবাড়ির দুর্ভোগও চরমে

ফেনীতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে অচল ফিলিং স্টেশন, বাসাবাড়ির দুর্ভোগও চরমে

জাতীয় গ্রিড থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাবে ফেনীতে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। শনিবার (১ আগস্ট) বিকেল থেকে শুরু হওয়া এ সংকটে জেলার অধিকাংশ সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে শহরের বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়ির চুলায় গ্যাস না থাকায় রান্নাবান্নাসহ দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম গ্যাস সরবরাহ হওয়ায় আবাসিক, পরিবহন ও শিল্প-সব খাতেই নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি।

বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ফেনী কার্যালয় সূত্র জানায়, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলায় প্রতিদিন প্রায় ২৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ১২ থেকে ১৪ মিলিয়ন ঘনফুট। ফেনীতে কোম্পানিটির আওতায় প্রায় ২৫ হাজার আবাসিক গ্রাহক রয়েছে। এর মধ্যে শহর ও সদর উপজেলায় প্রায় ১৯ হাজার। এছাড়া ১২টি সিএনজি ফিলিং স্টেশন, ২৮-২৯টি শিল্পকারখানা এবং ৫-৭টি ক্যাপটিভ পাওয়ার ইউনিট রয়েছে।

গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে জেলার বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গত শনিবার সন্ধ্যা থেকেই যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। অনেক চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করেও গ্যাস সংগ্রহ করতে পারেননি। এতে গণপরিবহনসহ বিভিন্ন যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। যেসব যানবাহন চলাচল করছে, সেগুলোর অনেকগুলোতেই যাত্রীদের কাছ থেকে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

অন্যদিকে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শহরের অনেক এলাকায় চুলায় গ্যাস না থাকায় রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার বাড়তি দামে এলপিজি সিলিন্ডার কিনে রান্নার ব্যবস্থা করছে। এতে একদিকে গ্যাস না পাওয়ার ভোগান্তি, অন্যদিকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের চাপ-দুই সংকটেই পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকরা।

শহরের নাজির রোড এলাকার বাসিন্দা রাবেয়া সুলতানা বলেন, আগে থেকেই গ্যাসের চাপ কম ছিল। শনিবার থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। বাজারে ১ হাজার ৬০০ টাকার সিলিন্ডার ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে সংসারের খরচ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি রান্নাবান্না নিয়েও চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে।

শহরতলীর দাউদপুর এলাকার আবাসিক গ্রাহক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, গ্যাস না পেলেও মাস শেষে পুরো বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে গ্যাস বিল স্থগিত বা মওকুফের বিষয়টি বিবেচনার দাবি জানান তিনি।

নজির আহমেদ ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নিতে আসা সিএনজি অটোরিকশাচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রায় ২৪ ঘণ্টা ধরে গাড়ি নিয়ে লাইনে অপেক্ষা করেও গ্যাস পাইনি। পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গাড়ি চালাতে পারছি না। এতে মালিকের জমার টাকা পরিশোধ ও পরিবারের খরচ চালানো নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন পার করছি।

আরেক চালক আবদুল জলিল বলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। দ্রুত সংকট নিরসন না হলে অনেক চালকের পরিবার মানবেতর পরিস্থিতিতে পড়বে।

রবিউল ইসলাম নামে এক পথচারী বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে রাস্তায় যানবাহন কমে গেছে। যে কয়টি যানবাহন চলাচল করছে, সেগুলোর বেশিরভাগই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে। সাধারণ মানুষ চারদিক থেকেই ভোগান্তিতে পড়েছেন।

ফেনীর স্টার লাইন ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার বিপুল শর্মা ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের তিনটি ফিলিং স্টেশনে প্রতিদিন গড়ে ১১ থেকে ১২ হাজার ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও শনিবার (১ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে যতটুকু জেনেছি, আগামী ১০ আগস্টের আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম।

বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ফেনী কার্যালয়ের বিক্রয় শাখার ব্যবস্থাপক কিরণ শংকর পাল ঢাকা পোস্টকে বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় প্রায় সব শ্রেণির গ্রাহকই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কোথাও গ্যাসের চাপ কম, আবার কোথাও সরবরাহ একেবারেই নেই। তবে দেশীয় গ্যাসফিল্ড থেকে সরবরাহ অব্যাহত থাকায় কিছু এলাকায় সীমিত পরিসরে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলো। দু-একটি ছাড়া জেলার প্রায় সব ফিলিং স্টেশনই বন্ধ রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) মেরামত না হলে এ সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।

বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ফেনী কার্যালয়ের সঞ্চালন বিভাগের ব্যবস্থাপক দেওয়ান মোস্তফা ইমরান ঢাকা পোস্টকে বলেন, মূলত এলএনজি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এটি শুধু ফেনীর নয়, জাতীয় পর্যায়ের সংকট। কবে নাগাদ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

তারেক চৌধুরী/এমটিআই

বিজ্ঞাপন