বিজ্ঞাপন

নারায়ণগঞ্জে ৬ মাস ধরে বন্ধ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের এক্স-রে বিভাগ

নারায়ণগঞ্জে ৬ মাস ধরে বন্ধ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের এক্স-রে বিভাগ

নারায়ণগঞ্জের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ১০০ শয্যার জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালের এক্স-রে বিভাগ গত প্রায় ছয় মাস ধরে অচল। বিভাগের একমাত্র মেডিকেল টেকনোলজিস্টের মৃত্যুর পর নতুন কাউকে পদায়ন না করায় বন্ধ হয়ে আছে এই মৌলিক সেবা। এর ফলে প্রতিদিন শতাধিক রোগী বাধ্য হয়ে হাসপাতালের বাইরে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে বেশি খরচে এক্স-রে করাচ্ছেন।

সরেজমিনে হাসপাতালের এক্স-রে বিভাগের সামনে গিয়ে দেখা যায়, দরজায় একটি নোটিশে লেখা— এক্স-রে পরীক্ষা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। তবে হাসপাতালের কর্মকর্তা ও রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই সাময়িক বন্ধের সময় ইতোমধ্যে ছয় মাসে গড়িয়েছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি এক্স-রে বিভাগের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মো. আলী আকবর খান মারা যান। এরপর থেকে পদটি শূন্য রয়েছে। নতুন কোনো মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ না হওয়ায় বিভাগটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের ওপর। হাসপাতালেই যেখানে স্বল্প খরচে এক্স-রে করার সুযোগ ছিল, সেখানে এখন রোগীদের বাধ্য হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসা ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে সময় ও ভোগান্তিও।

দাঁতের তীব্র ব্যথা নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে এক্স-রে করাতে হাসপাতালে এসেছিলেন শিক্ষক জেসমিন সাহানা। কিন্তু বিভাগ বন্ধ থাকায় হাসপাতাল থেকে তাকে বাইরে পরীক্ষা করাতে বলা হয়।

তিনি বলেন, হাসপাতালে এক্স-রে করতে পারলে ২০০ টাকার মতো লাগতো। কিন্তু বাইরে গিয়ে ৫০০ টাকা দিতে হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে এসেও যদি বাইরে পরীক্ষা করাতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের উপকার কোথায়?

শুধু জেসমিন সাহানা নন, প্রতিদিনই একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন বহু রোগী।

থাইরয়েডের সমস্যার চিকিৎসা নিতে আসা শম্পা আক্তার বলেন, চিকিৎসক তাকে এক্স-রে ও রক্ত পরীক্ষার পরামর্শ দিলেও হাসপাতালের ভেতরে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোর সুযোগ পাননি। অনেক দিন ধরে পায়ের ব্যথাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা রয়েছে। সরকারি হাসপাতালে কম খরচে পরীক্ষা করতে পারলে অনেক সুবিধা হতো। কিন্তু বাইরে গিয়ে সব করাতে হচ্ছে।

একই অভিযোগ করেছেন আরও কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজন। তাদের দাবি, এক্স-রের পাশাপাশি ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন পরীক্ষাও অনেক সময় হাসপাতালের পরিবর্তে বাইরে থেকে করাতে বলা হয়।

জ্বরে আক্রান্ত আট বছরের নাতি সালমানকে নিয়ে হাসপাতালে আসা রফিকুল ইসলাম বলেন, ডাক্তার কয়েকটি পরীক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু হাসপাতালেই কোথাও করার ব্যবস্থা নেই বলে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছেন। দরিদ্র মানুষের জন্য এটা বাড়তি চাপ।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগ মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার রোগী এখানে চিকিৎসাসেবা নেন। এছাড়াও গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১২০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। অর্থাৎ প্রতি মাসে প্রায় ৬০ হাজার বহির্বিভাগের রোগী এবং প্রায় ৩ হাজার ৬০০ ভর্তি রোগী এই হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। এতো বিপুলসংখ্যক রোগীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ডায়াগনস্টিক সেবা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকাকে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

এরই মধ্যে গত ১৪ জুন হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। ওই সময় তিনি নবনির্মিত আইসিইউ সেবার উদ্বোধন করেন এবং হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। জনবল সংকট দূর করা, চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়ন, হাসপাতালের পরিবেশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের নির্দেশনাও দেন। তবে দেড় মাসের বেশি সময় পার হলেও এক্স-রে বিভাগ চালুসহ নির্দেশনাগুলোর বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, এক্স-রে বিভাগ চালুর জন্য নতুন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদায়নের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও জেলা সিভিল সার্জনের মাধ্যমেও বিষয়টি জানানো হয়েছে।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে জেলার উপজেলা হাসপাতালগুলো থেকে সপ্তাহে দুই দিন একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এনে সেবা চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে উপজেলা হাসপাতালগুলোতেও জনবল সংকট থাকায় সেটি বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও জেলা সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফজল মুহম্মদ মুশিউর রহমান বলেন, মেডিকেল টেকনোলজিস্টের মৃত্যুর পর থেকেই এই সংকট তৈরি হয়েছে। আমরা একাধিকবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েছি এবং পরিচালক (প্রশাসন)-এর সঙ্গেও কথা হয়েছে। সর্বশেষ ২ জুলাই আবারও চিঠি পাঠানো হয়েছে। খুব দ্রুত একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদায়নের আশ্বাস পেয়েছি।

তিনি আরও জানান, হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ১০ জন করে আনসার সদস্য নিয়োগ দেওয়া হলেও নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের জন্য ৩০ জন আনসার সদস্য নিয়োগের প্রস্তাব বর্তমানে অর্থ বিভাগের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

মেহেদী হাসান সৈকত/আরএআর