তিস্তার ভাঙন শুধু নদীর পাড়ই ভাঙে না, ভেঙে দেয় মানুষের স্বপ্ন, আশ্রয় আর ভবিষ্যৎও। লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিশখোচা ইউনিয়নের বাসিন্দা সালেকা খাতুনের জীবনে সেই নির্মমতার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে ১৩ বার। প্রতিবারই নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে বসতভিটা, জমিজমা আর নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন। এখন অন্যের জমিতে মাথা গুঁজে দিন কাটছে তার। সালেকার মতো তিস্তাপাড়ের হাজারো পরিবার বছরের পর বছর ধরে একই অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কের মধ্যে জীবনযাপন করছে।
সম্প্রতি আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের গোবর্ধন এলাকার গরীবুল্লাহপাড়া ঘুরে দেখা যায়, তিস্তার ভাঙনে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। কোথাও নদীর কিনারায় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বসতঘর, কোথাও আবার একসময় জনবসতি ও ফসলি জমি ছিল, এখন সেখানে শুধু উত্তাল স্রোত।
বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী আলম মিয়ার স্ত্রী সালেকা খাতুন (৫০) বলেন, ‘বিয়ার পর থেইকা এই পর্যন্ত ১৩ বার বাড়ি ভাঙছে। নিজেদের জমিজমা সব নদীর মধ্যে চলে গেছে। এখন অন্যের জমিতে কোনোমতে থাকি। পাঁচটা ছেলে-মেয়েরে লেখাপড়া শেখাইতে পারি নাই। তারা দিনমজুরি কইরা সংসার চালায়। এখন আবার ভয় লাগে, এই বাড়িটাও যদি ভাঙে, তাহলে কোথায় যামু? শুনছি সরকার নদী খনন করবে। যদি নদী খনন হয়, তাহলে হয়তো কিছু জমি ফিরে পাবো।’
একই এলাকার প্রয়াত শরিফুল ইসলামের স্ত্রী মোছা. মোহসানা বেগম (৪০) জানান, নদীভাঙনে সাতবার বসতভিটা হারিয়েছেন তিনি। প্রায় ছয় বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই সন্তানকে নিয়ে সংগ্রাম করে বেঁচে আছেন।
তিনি বলেন, ‘অনেক কষ্টে দুই ছেলেকে বড় করছি। একজন ইটভাটায় কাজ করে সংসার চালায়, আর ছোট ছেলেটাকে স্কুলে পড়াই। জানি না কত দূর পড়াতে পারব। প্রতিদিন ভয় নিয়ে থাকি, আবার যদি ভাঙন শুরু হয়।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, তিস্তার দুই পাড়ে সালেকা ও মোহসানার মতো হাজারো পরিবারের আলাদা আলাদা গল্প থাকলেও সবার কষ্টের মূল কারণ এক নদীভাঙন। প্রতি বছর বর্ষা এলেই ভাঙন শুরু হয়, আর সঙ্গে আসে প্রশাসনের আশ্বাস। জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ বা বালুভর্তি বস্তা ফেলা হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে কোনো কাজে আসে না। তাই তারা তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান।
স্থানীয়রা বলেন, ‘আমরা আর ত্রাণ, জিও ব্যাগ কিংবা সাময়িক ব্যবস্থা চাই না। আমরা স্থায়ী সমাধান চাই। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে নদীভাঙন কমবে, কৃষি ও জীবিকা ফিরবে, মানুষ স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারবে।’
মহিষখোচা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মতিয়ার রহমান মতি বলেন, ‘আগের তুলনায় কিছু এলাকায় ভাঙন কমেছে। তবে যেসব পরিবার জমিজমা হারিয়েছে, তারা এখনও মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে অনেকের জমি উদ্ধার হবে এবং তারা নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।’
মহিশখোচা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘তিস্তার ভাঙন এ অঞ্চলের পুরোনো সমস্যা। প্রতি বছর কোথাও না কোথাও ভাঙন দেখা দেয়। খবর পেলেই পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়। তারা প্রয়োজন অনুযায়ী জিও ব্যাগ ফেলে। কিন্তু এটি স্থায়ী সমাধান নয়। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যতই জিও ব্যাগ দেই, এটা এমন হয় যে এখানে ভাঙন ঠেকাই ওখানে ভাঙে, আবার এ বছর এপার ভাঙে তো পরের বছর ওইপার ভাঙে। ভাঙন এলাকার মানুষকে আমার ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে যতটা সম্ভব আমি সহযোগিতায় করে থাকি।’
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার বলেন, ‘পানি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি এলাকায় ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে প্রয়োজনীয় স্থানে জিও ব্যাগ ফেলা হবে।’
আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গুঞ্জন বিশ্বাস বলেন, ‘নদীভাঙনসহ যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা করে সরকারি সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে প্রশাসন রয়েছে।’
তিস্তা উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে শুধু একটি নদী নয়; এটি তাদের জীবন, জীবিকা, কৃষি ও সংস্কৃতির অংশ। অথচ সেই নদীই বছরের পর বছর কেড়ে নিচ্ছে মানুষের ঘর, জমি, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ। প্রতিটি ভাঙনের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে একটি পরিবারের ইতিহাস, একটি শিশুর শিক্ষার সুযোগ, একজন কৃষকের আজীবনের সঞ্চয়। তাই তিস্তাপাড়ের মানুষের একটাই দাবি সাময়িক নয়, নদীভাঙন রোধে স্থায়ী ও কার্যকর সমাধান।
এসএইচএ
