বিজ্ঞাপন

ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে কাঁদেন মা, ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় বাবা

ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে কাঁদেন মা, ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় বাবা

দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে উত্তাল জয়পুরহাট জেলা শহরের রাজপথ। সেই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন পাঁচবিবির বিজনেস ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের একাদশ শ্রেণির ছাত্র নজিবুল সরকার বিশাল (১৮)। শহরের পাঁচুর মোড়ে মিছিল চলাকালে হঠাৎ ছুটে আসা বুলেট মুহূর্তে স্তব্ধ করে দেয় এই অকুতোভয় তরুণকে। একই দিন রাতে নিথর দেহ ফিরে আসে নিজ গ্রাম পাঁচবিবি উপজেলার ধরঞ্জী ইউনিয়নের রতনপুরে। স্বজনদের অশ্রুসজল চোখে গ্রামের মাটিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত হন বিশাল।

ঘটনার ১৪ দিনের মাথায়, ১৮ আগস্ট বিশালের বাবা মজিদুল সরকার বাদী হয়ে জয়পুরহাট সদর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করে ওই মামলায় নাম আসে আওয়ামী লীগের ১২৮ জন নেতাকর্মীর। মামলার প্রয়োজনে আদালতের নির্দেশে দাফনের ৭৩ দিন পর গত বছরের ১৭ অক্টোবর রতনপুর গ্রামের কবরস্থান থেকে বিশালের মরদেহ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়। জেলা প্রশাসনের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন শিক্ষার্থী নজিবুল সরকার বিশাল। ঘটনার পর একটি হত্যা মামলা হয়েছে। দুই বছর পার হলেও মামলা নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবারটি। শোকের মধ্যে এই পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্র। শহীদ বিশালের পরিবারকে একটি নতুন বাড়ি উপহার দেওয়া হয়েছে। তবে ঘরের কোণে জমে থাকা ছেলের স্মৃতি আর মামলার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে এখনো উদ্বিগ্ন পরিবার। ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় দিন গুনছেন তারা।

অ্যালবামের সেই ছবি তো আর ‘মা’ বলে ডেকে ওঠে না

ঘাতকের বুলেটে তরুণের প্রাণহীন দেহ ঢলে পড়ার দুই বছর পার হতে চললেও শোকের ছায়া কাটেনি পরিবারটিতে। আজও রতনপুর গ্রামের এই শহীদের বাড়িতে গেলে চোখে পড়ে করুণ দৃশ্য- ছেলের অ্যালবামের ছবিগুলো দেখতে দেখতে অঝোরে চোখের জল ঝরান মা। অ্যালবামের পাতায় জমে থাকা ছেলের হাসিমুখের ছবিতে পরম মমতায় হাত বোলান তিনি। কিন্তু সেই ছবি তো আর ‘মা’ বলে ডেকে ওঠে না। ঘাতকের বুলেটে যে তরুণের প্রাণহীন দেহ রাজপথে ঢলে পড়েছিল, তার স্মৃতি আঁকড়েই আজ কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন মা।

শহীদ নজিবুল সরকার বিশালের বাবা মজিদুল সরকার বলেন, এখনো আমার মামলার কোন কোন রায় হয়নি বা আমাকে ডাকেও নি, ভালো কি মন্দ। বর্তমান সরকারের কাছে দাবি আমার ছেলেসহ যত শহীদ পরিবার আছে, সকল শহীদের খুনের বিচার হোক।

মা বুলবুলি খাতুন বলেন, বিশাল আর দশটা ছেলের মতো ছিল না। কাজ ছাড়া কখনো বাইরে যেত না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তো, পড়াশোনা করতো। যখন তার বুদ্ধি হয়, সে দেখে বাবা একা একা কাজ করে, কষ্টে জীবনযাপন করতে হয়। এসএসসি পরীক্ষার পর সিদ্ধান্ত নিল, বাবার একা কাজের টাকা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন ব্যাপার।

তিনি বলেন, রেজাল্ট হলে বেশি দূর পড়াশোনা করতে চায়নি। সে বলতো, কলেজে ভর্তি হবো, যদি সময় মত ক্লাস করতে না পারি, তাহলে পরীক্ষা দেব। মাঝে মাঝে আমি কাজ করব, বাবাকে সাহায্য করব। পরীক্ষা শেষে যে তিন মাস ছিল, সেই সময় মানুষের বাসায় শ্রম দিত আমার ছেলে। টাকা এনে আমার হাতে দিত। আমি সেই টাকা থেকে কিছু সংসারের কাজে লাগাতাম। কিছু তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য রেখে দিতাম, যে ছেলে যখন চাইবে তখন দিবো। এভাবেই সেসময় আমাদের জীবন কাটতো।

জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি বর্ণনা করে বিশালের মা বলেন, ১৬ জুলাই যখন আবু সাঈদ মারা যায়, তখন বিশাল ফোনে আমাকে দেখাতো আম্মু এই বড় ভাইটা শহীদ হয়েছে। তখন আমি ভাবতাম আল্লাহ কার মায়ের বুক খালি করে দিল? এই ভাবতে ভাবতে আন্দোলন শুরু হয়। আমাকে দেখায় আজকে এখানে আন্দোলন হচ্ছে, কালকে সেখানে হচ্ছে। কিন্তু ৪ আগস্ট আমার ছেলে আন্দোলনে যাবে সেটা আমি জানতাম না।

সেই মর্মান্তিক দিনের কথা মনে করে তিনি বলেন, আমাদের বাসায় পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার ছিল না। ছিল না মানে ছিলই না। আমি একটু খিচুড়ি রান্না করছিলাম। ওর বাবা কাজে গেছিল। ওইদিন কে যেন ফোন করলো তাকে বললো বন্ধু আমি ফ্রেশ হয়ে আসতেছি। তারপর গোসল করে আমাকে বললো আম্মু খাওয়ার কিছু আছে? আমি খিচুড়ি খেতে দিলাম। সে বলে এত খিচুড়ি খাওয়া যায়? আমি বললাম তোমার বাবা কাজে গেছে, আসলে দুপুরে ভাত রান্না করে দেব। এখন দুই ভাই খিচুড়ি খাও। খিচুড়ি খেতে খেতে ছোট ভাইকে শুধু একটা কথায় বললো এমন কোন কাজ করবা না, যাতে বাবা-মায়ের মুখ ছোট হয়ে যায়। ভালোভাবে থাকবে, ভালো ব্যবহার করবে। ব্যবহার বংশের পরিচয়।

তিনি আরও বলেন, আমাকে বলল মা আমি আজকে সাদা গেঞ্জি পরব, লাল পরব না। গেঞ্জি পড়তে পড়তে হাসি মুখে আমাকে বলল, মা আমি তোমাকে মিথ্যা কথা বলতে চাই না। আমি তোমাকে ঘুরে এসে বলব। আমি জিজ্ঞাসা করি তুমি কোথায় যাচ্ছো? বলেছিল বাজারে যাচ্ছি। সে গোসলের কাপড় রেখে গিয়েছিল। আমি জামা কাপড় কাঁচা বালতিটা হাত থেকে রাখতে যাচ্ছি, সেই সময় আমার দেবর এসে বলে আমাদের ছেলে কোথায়? আমি বললাম বাজারে গেছে। আমাকে বললো বাজারে যায়নি, আমাদের ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তারপর ফোনে যোগাযোগ হয়। আমার ছেলে যখন গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যায় কিছু ছেলে তাকে ধরে রেখেছিল, চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাচ্ছিল। তারা বলল, এটা যার ফোন সে গুলি খাইছে।

ফোনে ফোনে যোগাযোগ করার পর ওই ছেলেগুলা চিকিৎসা নেওয়ার জন্য সদর হাসপাতালে যায়। সদর হাসপাতাল থেকে ফেরত দেওয়া হয়। জিয়া মেডিকেলে নিয়ে যেতে বলা হয়। সেখানে নিয়ে যাওয়ার সময় অবস্থা খারাপ হলে কালাই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে সে শহীদ হয়। সেখান থেকে অ্যাম্বুলেন্স করে তাকে বাসায় নিয়ে আসে।

সব শহীদের খুনের বিচার চান বাবা

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হওয়া পাঁচবিবির নজিবুল সরকার বিশালের স্মৃতি আর শেষ মুহূর্তগুলোর কথা বলতে গিয়ে নিশ্চুপ হয়ে যান তার বাবা মজিদুল সরকার। তিনি বলেন, ৩ আগস্ট বিকেলে ছেলের সঙ্গে শেষবার ভাত খেয়েছিলাম। সন্ধ্যার পর এশার নামাজের আগে জিজ্ঞেস করলাম, আব্বু, কোথায় তুমি? সে বলল, আব্বু, আমি এখানে আছি। বন্ধুরা পিকনিক করবে, তাই ওদের সাথে বসে আছি। বললাম, আব্বু, বাড়ি আস। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেলে বাড়ি ফিরে এলো।

তিনি আরও বলেন, ৪ আগস্ট সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত ছেলেকে বাড়িতে দেখেছি। ৯টার দিকে আমি কাজের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যাই এবং দুপুর একটা পর্যন্ত কাজেই ছিলাম। আমার ছেলে যে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে, তা আমি জানতাম না। পরে আমাকে ডেকে নেওয়া হয়। গিয়ে দেখি, আমার ছেলের লাশ। 

বুকফাটা আর্তনাদ আর আক্ষেপ নিয়ে বর্তমান সরকারের কাছে আকুল আবেদন করেন শহীদ বিশালের বাবা বলেন, এখনো আমার মামলার কোনো রায় হয়নি বা আমাকে ডাকেও নি। বর্তমান সরকারের কাছে দাবি আমার ছেলেসহ যত শহীদ পরিবার আছে, সব শহীদের খুনের বিচার হোক।

শহীদ নজিবুল সরকার বিশালের শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতিকথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে সহপাঠী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু তৌফিক আহমেদ। জুলাই-আগস্টের উত্তাল সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, আগস্টের শুরুতে তখন ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। ৩ আগস্ট রাতে বিশালের নেতৃত্বেই আমরা ২০২৩ সালের এসএসসি ব্যাচের ১৬-১৭ জন বন্ধু মিলে রতনপুর তিনমাথায় একটি চাতালের কাছে খোলা জায়গায় পিকনিকের আয়োজন করি। সাউন্ডবক্স বাজছিল, তখন বিশাল, আমি আর আরেক বন্ধু মিলে একটু ফাঁকা জায়গায় গিয়ে বসলাম। সেদিন সুন্দর আবহাওয়া ছিল। ওখানে এসে আমরা অনেক গল্প করলাম, স্কুল জীবনের স্মৃতি, নানা হাস্যকর বিষয়।

গল্পের একপর্যায়ে উঠে আসে পরদিনের আন্দোলনের কথা। বিশাল বলছিল, আগামীকাল ৪ আগস্ট আবুল কাশেম ময়দানে আন্দোলন হবে। দেশের এমন পরিস্থিতিতে আমাদের সেখানে যেতেই হবে। কিন্তু পরেরদিন আমার আর যাওয়া হয়নি।

বন্ধুর উদার মন ও নেতৃত্বের প্রশংসা করে সহপাঠী বলেন, সে আমাদের পুরো ব্যাচের সকলকে একত্রিত করতো। যেকোনো জায়গায় ঘুরতে বা একসাথে পিকনিক খেতে গেলেও সে সবাইকে একত্রিত করতো। ওর মনটা ছিল একদম উদার। এখন ও না থাকার শূন্যতা আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

শহীদ নজিবুল সরকার বিশালের প্রতিবেশী দাদা আব্দুল মাজেদ বলেন, ও ভালো এবং অত্যন্ত সুন্দর ছেলে ছিল। নিয়মিত নামাজ-কালাম পড়ত। ঘটনার আগেরদিন ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আমাকে বলেছিল- কালকে আমার পরীক্ষা হবে, মিছিলের সামনে থাকব দাদা। পরদিন ৪ আগস্ট সকালেও বিশালের সঙ্গে দেখা হয় এবং ইয়ার্কি-ঠাট্টা করেছিলাম। সেদিন দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে শুনি বিশাল মারা গেছে, গুলি খেয়েছে।

তিনি বলেন, ওর পরিবারের অবস্থা একবারে ভালো না। ওর বাবা আমার মতোই একজন মিস্ত্রি। খুব টানাটানির মধ্য দিয়েই ওদের দিন চলত। এখন সরকার থেকে টিনশেড বাড়ি করে দিয়েছে এবং সরকার, দলীয়ভাবে ও বিজিবি কিছু অর্থ দিয়েছে।

ইউএনও কাশপিয়া তাসরিন বলেন, শহীদ বিশালের পরিবারের সঙ্গে প্রশাসনের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। সরকার থেকে যে নির্দেশনা দেওয়া হবে, উপজেলা প্রশাসন তা বাস্তবায়নে কাজ করবে। ৪ আগস্ট তার কবর জিয়ারত ও পরিবারের সঙ্গে দোয়া-মোনাজাতে অংশ নেওয়ারও কথা জানান তিনি।

চম্পক কুমার/আরকে