বিজ্ঞাপন

এনায়েতপুর থানায় সেদিন কী ঘটেছিল, যা বলছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা

এনায়েতপুর থানায় সেদিন কী ঘটেছিল, যা বলছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা

‘হামলার সময় থানায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলে আমরা ৫-৬ জন ভবনের ভেতরে আটকা পড়ে যাই। তখন দ্বিতীয় তলায় অবস্থান করছিলাম। বের হওয়ার কোনো পথ ছিল না। পুরো ঘটনার সময় কী ঘটছে, ঠিকভাবে বুঝতেই পারিনি। বাইরে কী হচ্ছিল, সেটাও দেখতে পাইনি। তবে ভবনে আগুন লাগার পর মনে হয়েছিল, হয়তো আর বাঁচব না। ভবনে আটকা পড়াদের মধ্যে আমি একমাত্র নারী ছিলাম, সঙ্গে আরও চারজন পুরুষ পুলিশ সদস্য ছিলেন। পরে সেনাবাহিনীর সদস্যরা এসে আমাদের জীবিত উদ্ধার করেন।’

কথাগুলো বলছিলেন সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় হামলার সময় ভবনের ভেতরে আটকে পড়া নারী পুলিশ সদস্য রেহানা পারভীন।

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট এনায়েতপুর থানায় হামলার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেদিনের বিভীষিকাময় স্মৃতি আজও স্পষ্ট রেহানা পারভীনের মনে। তিনি প্রাণে বেঁচে ফিরলেও, এ ঘটনায় প্রাণ হারান তার ১৫ সহকর্মী।

সেদিনের সংঘর্ষে নিহত ১৫ পুলিশ সদস্য হলেন- থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুর রাজ্জাক। এছাড়া নিহতদের মধ্যে ছিলেন সাতজন উপপরিদর্শক (এসআই)—মো. রইছ উদ্দিন খান, মো. তহছেনুজ্জামান, প্রণবেশ কুমার বিশ্বাস, মো. নাজমুস হোসাইন, আনিছুর রহমান মোল্লা, মো. ওবায়দুর রহমান ও মো. আসুম সালেক। বাকি সাতজন ছিলেন কনস্টেবল—মো. হাফিজুল ইসলাম, মো. রবিউল আলম শাহ, মো. হুমায়ুন কবির, মো. আরিফুল আযম, মো. রিয়াজুল ইসলাম, মো. শাহিন উদ্দিন ও মো. হানিফ আলী। 

পুলিশ ছাড়াও সেদিন সংঘর্ষে এনায়েতপুরের কলেজছাত্র শিহাব হোসেন (১৯), তাঁত শ্রমিক ইয়াহিয়া আলী (৩৫) ও মাদ্রাসাছাত্র সিয়াম হোসেন (২২) নিহত হন। 

দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেদিনের ভয়, আতঙ্ক আর আর্তনাদের স্মৃতি এখনও তাড়া করে বেড়ায় এনায়েতপুর থানার আশপাশের মানুষদের। ঘটনাটির কথা উঠতেই অনেকেই নীরব হয়ে যান। কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না, আবার কেউ নাম প্রকাশ না করার শর্তে সেদিনের স্মৃতি তুলে ধরেন। তাদের ভাষ্য, সময় পেরিয়েছে, কিন্তু সেই দিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা এখনও অনেকের মনে গভীরভাবে রয়ে গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও স্থানীয়দের সূত্রে জানা যায়, ৪ আগস্ট সকাল থেকে পুলিশের গোলাগুলির ঘটনায় স্থানীয়রা থানা এলাকা ঘেরাও করে। এরপর পুলিশ সদস্যরা আত্মসমর্পণ করেন। মানুষজন যখন ফিরে যাচ্ছিল, সে সময় পেছন থেকে থানার এক পুলিশ সদস্য গুলি চালায়। সেই গুলিতে শিহাব নামের একজন শিক্ষার্থী মারা যায়। এরপর পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করলে সবাই সরে যায়। তবে ঘণ্টাখানেক পর সকাল সাড়ে ১১টার দিকে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী থানা ঘিরে ফেলে এবং থানা ভবনে আটকে থাকা পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালায়।

জানা যায়, বিক্ষোভকারীরা সেদিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুলিশ সদস্যদের খুঁজেছিল। থানায় আগুন দেওয়ার পর কয়েকজন পুলিশ সদস্য এনায়েতপুর গ্রামের বাসিন্দা বাবলু মিয়া ওরফে বাবুর (৭০) বাড়িতে আশ্রয় নিতে এসেছিলেন। তাদের ঘরেও তল্লাশি চালানো হয়। ঘরে নারী ও ছোট শিশুদের দেখে বিক্ষোভকারীরা জানতে চান তারা কারা। তখন তারা বলেন, সবাই তাদের আত্মীয়। এরপর তারা চলে যায়।

বাবলু মিয়া বলেন, দুইজন পুলিশকে আমরা বাঁচাতে পেরেছিলাম। কয়েকজনের পরিবারকেও লুকিয়ে রেখেছিলাম। পরে সাধারণ মানুষের পোশাক পরিয়ে নিরাপদে বের হতে সাহায্য করি। একজন ছিলেন হিন্দু, আরেকজন মুসলিম।

একপর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, ঘরের ভেতর থেকেই শুনছিলাম, বাইরে থাকা পুলিশেরা বলছিল আমাদের মাফ করে দেন। জানটা ভিক্ষা দেন। আমরা আর পুলিশের চাকরি করব না। কিন্তু কেউ শোনেনি। অস্ত্র দিয়ে না, লাঠি দিয়েই পিটিয়ে মেরে ফেলেছে।

বাবলু মিয়ার স্ত্রী মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, বিক্ষোভকারীরা দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলছিল, ঘরে পুলিশ আছে, দরজা খোলেন। তারা ঘর তল্লাশি করে চলে যায়। আমরা তখন জীবন্ত হয়েও যেন মৃত ছিলাম। আল্লাহ যে কেন এমন দিন দেখাইলেন!

তিনি আরও বলেন, সেই ঘটনার প্রভাব এখনও আমাদের পরিবারের শিশুদের মধ্যে রয়েছে। আমার সাত বছরের নাতনি তানজিলা ও সাড়ে পাঁচ বছরের ঈশা মনি মাঝেমধ্যে ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে ওঠে।

থানার পাশেই আখ বিক্রি করেন স্বপ্ন মোল্লা। তিনি বলেন, হাজার হাজার মানুষ থানার দিকে ছুটে আসতে দেখে আমিও এলাকা ছেড়ে চলে যাই। পরে ফিরে এসে শুনি, পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি তিনজন ছাত্রও নিহত হয়েছেন।

স্বপ্ন মোল্লার ছোট ভাই পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাকিবুর রহমান বলে, প্রথমে একটি মিছিল থানার সামনে আসে। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করলে তারা সরে যায়। তবে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে কয়েক হাজার মানুষ আবার ফিরে আসে। সকাল সাড়ে ১০টা-১১টার দিকে আরেক দফা হামলা হয়। আমরা তখন এলাকা ছেড়ে যাই। বিকেলে এসে দেখি পুলিশ সদস্যদের মরদেহ পড়ে আছে। একজনের মরদেহ মসজিদের সামনে, আরেকজনকে বাজারের বটগাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। তিন দিন পর সেনাবাহিনী এসে মরদেহ নিয়ে যায়। হামলাকারীদের অনেকের মুখে রুমাল বাঁধা ছিল, মাথায় লাল ফিতা। প্রায় সবার হাতেই লাঠি ছিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে থানার পেছনের এক বাসিন্দা বলেন, হামলার সময় আমরা ঘরের দরজা বন্ধ করে ছিলাম। কিন্তু আমাদের বাড়ির বাথরুমে লুকিয়ে থাকা কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে টেনে বের করে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে বাড়ির সামনেই মরদেহগুলো জড়ো করে রাখা হয়েছিল।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই হামলায় এনায়েতপুর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) ১৫ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। ঘটনাস্থল ও আশপাশ থেকে সেদিন ১৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুজন মারা যান। নিহতদের একজনের মরদেহ থানার পাশের বাজারের একটি বটগাছে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।

হামলার সময় থানায় মোট ৫৯ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্বে ছিলেন। তাদের মধ্যে তিনজন ছিলেন নারী কনস্টেবল। থানায় আগুন দেওয়ার সময় একজন নারী সদস্য ভবনের ভেতরে আটকা পড়েন। পরে সেনাবাহিনী তাদের উদ্ধার করে।

হামলার পর থানা থেকে ১৮টি রাইফেল, পিস্তল ও শটগান লুট হয়। এনায়েতপুর থানা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এখনও ৬টি অস্ত্র এবং অধিকাংশ গুলি উদ্ধার হয়নি।

ঘটনার ২২ দিন পর অর্থাৎ ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট পুলিশ বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করে। পুলিশ হত্যা মামলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের চার নেতাসহ অজ্ঞাত ৫ থেকে ৬ হাজার জনকে আসামি করা হয়। মামলার প্রধান আসামি করা হয় এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আহম্মদ মোস্তফা খান বাচ্চুকে। পরে তিনি কারাগারে মারা যান। এ মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাসসহ আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) একাধিক নেতা গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন। এছাড়া শিক্ষার্থীসহ তিনজন হত্যার ঘটনায় এনায়েতপুর থানায় পৃথক তিনটি মামলা করা হয়। এ মামলায় সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালী) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল মমিনসহ ২০৮ জনকে আসামি করা হয়। অজ্ঞাতনামা আসামি আরও ৭০০ জন।

মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু বলেন, মামলাটি তদন্ত চলমান রয়েছে। এ বিষয়ে এর বেশি কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।

সিরাজগঞ্জ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক হযরত আলী উসমান বলেন, পুলিশ গোলাগুলি করায়, স্থানীয় মানুষজন থানা এলাকা ঘেরাও করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে পুলিশ সদস্যরা এসে আত্মসমর্পণ করেন। এরপর মানুষজন ফিরে যাচ্ছিল, সে সময় পেছন থেকে থানার এক পুলিশ সদস্য গুলি চালায়। এসময় শিহাব নামের একজন শিক্ষার্থী গুলিতে মারা যায়। সেই ক্ষোভ থেকে বিক্ষুব্ধ জনগণ থানায় হামলা চালালে ১৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। 

দুই বছর পেরিয়ে গেছে। এনায়েতপুর থানার পোড়া দেয়ালে নতুন রঙের প্রলেপ পড়েছে। বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে গেছে রক্তের দাগ। তবে প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় বাসিন্দা ও বেঁচে ফেরা পুলিশ সদস্যদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের সেই দিনের ভয়, আতঙ্ক আর আর্তনাদের স্মৃতি এখনও তাদের মন থেকে মোছেনি।

আরকে