বিজ্ঞাপন

অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

বরাদ্দ হলেও পাকা হয়নি গাইবান্ধার জুলাই শহীদদের কবর, ডিসির উদ্যোগ

বরাদ্দ হলেও পাকা হয়নি গাইবান্ধার জুলাই শহীদদের কবর, ডিসির উদ্যোগ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত গাইবান্ধার ছয় শহীদের কবর পাকা করার জন্য জেলা পরিষদ থেকে সরকারি অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেই অর্থে কাজ না হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন ছয় শহীদ পরিবারের সদস্যরা। অভিযোগের পর নতুন করে একটি কবর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন।

সোমবার (২৭ জুলাই) এই লিখিত অভিযোগ করেন তারা। ফলে ৫ আগস্টকে ঘিরে তড়িঘড়ি করে সাঘাটার ধনারুহা গ্রামে জুলাই শহীদ সাজ্জাত হোসেন সজলের কবর পাকা করণের কাজ শুরু করে জেলা প্রশাসন।

এবার সজলের কবরের কাজ করা হচ্ছে মায়ের পছন্দের অত্যাধুনিক ডিজাইনে। ইট দিয়ে পাকা করা কবরে থাকছে টাইলস্, সিঁড়িতে থাকছে মারবেল।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দুপুরে জুলাই শহীদ সজলের নতুন করে কবর পাকাকরণ কাজের উদ্বোধন করেন গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লা। এদিন উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাসহ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম সেখানে উপস্থিত ছিলেন। জেলা প্রশাসনের অর্থয়নে এবার নতুন ডিজাইনে আধুনিকভাবে রূপ দেওয়া হবে এই শহীদের কবরকে।

জেলা প্রশাসক কবর পাকাকরণ কাজের উদ্বোধনের পর সেদিন ফেসবুকে এক পোস্টে সজলের মা শাহিনা বেগম লিখেন, এই সেই জুলাই শহীদ সাজ্জাদ হোসেন সজলের কবর। যেই কবর গাইবান্ধা জেলা পরিষদের মাধ্যমে সংরক্ষণ করার কথা ছিল কিন্তু বরাদ্দের অর্থ মেরে দেওয়া হয়েছে। পরে আবার নতুন করে বাজেটে কবরের কাজের টাকা জেলা পরিষদের নির্বাহী অফিসার বিপুল চন্দ্র দাসের নিকট ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও আন্দোলনে শহীদের কবরের টাকা আত্মসাতের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এই ছয় শহীদ পরিবার যেন সুষ্ঠু বিচার পায় সেই প্রত্যাশার দাবি জানানো হয় পোস্টে। 

জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া জেলার ছয় জুলাই শহীদ পরিবার স্বাক্ষরিত ওই অভিযোগে বলা হয়, শহীদদের কবর পাকাকরণের উদ্দেশ্যে দেওয়া বরাদ্দের একটি অংশ বা সম্পূর্ণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। যার লিখিত জবানবন্দি, তথ্য ও অন্যান্য প্রমাণাদি অভিযোগকারীদের কাছে সংরক্ষণ করা আছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, গণ-অভ্যুত্থানে নিহত শহীদ স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করার পরিবর্তে কবর নির্মাণের অর্থ আত্মসাৎ একটি নিন্দনীয়, অনৈতিক ও জনস্বার্থবিরোধী বিষয়। যা নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

অভিযোগে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, বরাদ্দের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিরীক্ষা, অভিযোগের প্রমাণাদি যাচাই, আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধার ও দোষীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং তদন্ত কার্যক্রমে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ত বা অবহিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। 

এরআগে গত ১৫ জুন গাইবান্ধা প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন করে গাইবান্ধার ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে জেলার ৬ শহীদের কবর পাকাকরণে জেলা পরিষদ থেকে হওয়া বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তোলা হয়। ওই সংবাদ সম্মেলনে ৬ শহীদ পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সাঘাটার শহীদ সাজ্জাদ হোসেন সজলের মা শাহিনা বেগম। ওই সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছিল, শহীদদের কবর পাকাকরণের কাজ শুরু হলেও তা শেষ হয়নি। বারবার সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার মেহেদী হাসানকে জানানো হলেও তিনি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেননি। পরে তারা জেলা পরিষদ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানতে পারেন ঠিকাদার (মেহেদি হাসান) ইতোমধ্যে পুরো বিল উত্তোলন করেছেন। পরে শহীদ পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লাকে অবহিত করেন। কিন্তু তিনি আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি নেননি।

জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগকারীদের মধ্যে শহীদ পরিবারের একজন শাহিনা বেগম (শহীদ) সজলের মা। তিনি জানান, গাইবান্ধার ৬ জুলাই শহীদের কবর পাকাকরণের জন্য জেলা পরিষদ থেকে ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সে হিসেবে প্রত্যেক কবর পাকাকরণে বরাদ্দ ৮৩ হাজার টাকা।

শাহিনা বেগমের অভিযোগ, জেলা পরিষদের ৫ লাখ টাকা বরাদ্দের নাম দিয়ে কাজ করে সমুদয় টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। বিষয়টি দফায় দফায় জেলা প্রশাসককে জানানো হলেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি। সর্বশেষ গত ১৬ জুলাই (জুলাই শহীদ দিবস) জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে আমি বক্তব্য রাখতে গিয়ে শহীদদের কবর পাকাকরণে জেলা পরিষদের বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের বিষয় তুলে ধরি। তারপর জেলা প্রশাসক আমাদের সাথে বসেন। কিন্তু তার পরেও তিন দফায় গিয়ে কোনো সমাধান পাইনি। সর্বশেষ ২৭ জুলাই লিখিত অভিযোগ করি।

তিনি বলেন, আমার ছেলের কবর যেন-তেনভাবে পাকাকরণ আমি মেনে না নিয়ে জেলা পরিষদের বরাদ্দে ১৬ হাজার টাকায় পাকা করা কবর আমি ভেঙে ফেলেছি এবং আরও ২ হাজার বেশি দিয়ে তাদের ১৮ হাজার টাকা ফেরত দিয়েছি। অন্য পাঁচজনের কবরে টাকা মেরে দিয়ে আবার নতুন বরাদ্দ নিয়ে কাজ করেছে জেলা পরিষদ।

এ ব্যাপারে কথা বলতে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) বিপুল চন্দ্র দাসকে একাধিকবার ফোন করা হলেও রিসিভ করেননি। 

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, সাঘাটার শহীদ সজলের কবর পাকাকরণের কাজ ২৮ জুলাই নতুনভাবে শুরু করা হয়েছে। ওই পরিবার যেভাবে চাইবে সেভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক স্যার। আমরা সেভাবেই করছি। 

এসময় জানতে চাইলে তিনি বলেন, কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ইট দিয়ে পাকা করা কবরে থাকছে টাইলস এবংসিঁড়ি। সিঁড়িতে থাকবে মারবেল।

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সারা দেশে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ শহীদ এবং প্রায় ২২ হাজার মানুষ আহত হন। এ ঘটনার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সরকার শহীদদের স্মরণে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে।

মাসুম বিল্লাহ/এসএইচএ