বিজ্ঞাপন

শহীদ রফিকের মা

‘ছেলে পুলিশের গুলিতে মারা গেছে দুই বছর হয়ে গেল, বিচার পাইলাম না’

‘ছেলে পুলিশের গুলিতে মারা গেছে দুই বছর হয়ে গেল, বিচার পাইলাম না’

‘আমার ছেলে পুলিশের গুলিতে মারা গেছে, আজকে দুই বছর হয়ে গেল, এখনো তার বিচার পাইলাম না। এই সরকারের কাছে আমার একটাই দাবি, আমার সন্তান হত্যার বিচার চাই। যেই মায়ের কোল থেকে সন্তান হারাইছে, সেই বোঝে সন্তান হারানোর বেদনা।’

ছেলে হত্যার বিচারের আশায় নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন জুলাই আন্দোলনে শহীদ রফিকের মা চায়না বেগম। 

সরেজমিনে শহীদ রফিকের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িতে দুটি ঘর, একটিতে থাকেন রফিকের বাবা-মা, অন্যটিতে তার ছোট বোন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে পরিবারটি এখন শোকাহত। সরকারের দেওয়া ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রের মাসিক মুনাফা ও কৃষিকাজ করে সংসার চালাচ্ছেন তার বাবা। রফিকের ছোট বোন নূর নাহার মহাদেবপুর কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন।

সঞ্চয়পত্রের টাকা দুই ভাগে ভাগ হয়। এক ভাগ পান রফিকের বাবা, অন্য ভাগ পান রফিকের স্ত্রী ও সন্তান। রফিকের মৃত্যুর কয়েক মাস পর তার স্ত্রী ও সন্তান বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন এবং সেখানেই এখন তাদের বসবাস। রাষ্ট্রীয় এককালীন অনুদান ও সঞ্চয়পত্রের আয়েই কোনোরকমে চলছে তাদের সংসার। তবে পরিবারটির দাবি, তারা শুধু আর্থিক সহায়তা চায় না, চায় সবাই তাদের খোঁজখবর রাখুক।

রাষ্ট্রীয় সহায়তার অংশ হিসেবে রফিকের পরিবার পেয়েছে এককালীন ৪ লাখ টাকার চেক, ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং আরও এককালীন এক লাখ ২০ হাজার টাকা। এর আগে শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকের স্ত্রীকে একটি ছাগল দিয়েছিলেন।

দুই বছর পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে সরকার বদলেছে, ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এরপর চলতি বছর ক্ষমতায় আসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া পুরাতন লঞ্চঘাটে নৌ পুলিশের গুলিতে নিহত রফিকের পরিবারের কাছে সময় যেন থমকে আছে সেই রক্তাক্ত বিকেলেই। সরকারের পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। দুই বছর পরও তারা অপেক্ষায় রয়েছেন- কবে শুরু হবে হত্যাকাণ্ডের বিচার, কবে আইনের মুখোমুখি হবেন অভিযুক্তরা।

জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের শেষ মুহূর্তে দুপুর আনুমানিক আড়াইটার দিকে পাটুরিয়া পুরাতন লঞ্চঘাট এলাকায় পদ্মা নদীতে থাকা একটি স্পিডবোট থেকে পাঁচ সদস্যের নৌ পুলিশের দল আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করে। গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন রফিক।

পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার দুই বছর পার হলেও রফিক হত্যা মামলার মূল আসামি নৌ পুলিশের সদস্য শেখ এমদাদ হোসেনকে এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি। তাদের দাবি, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজে গুলিবর্ষণে অংশ নেওয়া নৌ পুলিশ সদস্যদের স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হলেও তাদের বিরুদ্ধে এখনো দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মামলায় নৌ পুলিশ সদস্যসহ মোট ৪৯ জনকে আসামি করা হলেও এ পর্যন্ত আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ জন আওয়ামী লীগ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রফিকের পরিবারের দাবি, মূল আসামি শেখ এমদাদ হোসেনকে বাঁচাতেই তাকে ৪৯ নম্বর আসামি করা হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, কিছু অজ্ঞাত ব্যক্তি রফিকের বাবার কাছ থেকে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নিয়ে তাকে মামলার বাদী করেন, পরে নিজেদের ইচ্ছেমতো আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নাম দিয়ে মামলা করেন।

শহীদ রফিক মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার মো. রহিজ উদ্দিনের ছেলে। তিনি রূপসা ওয়াহিদ আলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে জীবিকার তাগিদে ২০২৩ সালে নারায়ণগঞ্জে জাহাজ ঝালাইয়ের কাজে যোগ দেন। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ২৪ বছর।

ব্যক্তিগত জীবনে রফিক ২০১৯ সালে শাবনূর আক্তারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের দুই বছর পর ২০২৩ সালে তাদের কোলজুড়ে আসে একমাত্র কন্যাসন্তান রাইসা আক্তার। বর্তমানে রাইসার বয়স তিন বছর দুই মাস।

পরিবারের সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, নিহত হওয়ার মাত্র সাত দিন আগে কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন রফিক।  তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না, তবে বাড়ি ফেরার পর ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তাতে যুক্ত হন। ৫ আগস্ট সকালে পরিবারের সঙ্গে খাবার খেয়ে রূপসা বাজারের উদ্দেশে বেরিয়ে যান তিনি। দুপুর আনুমানিক দেড়টার দিকে বাবার সঙ্গে মুঠোফোনে শেষবারের মতো কথা হয় তার। তখন তিনি বাবাকে বলেন, ‘আমি চৌরাস্তায় আছি, আমার কোনো সমস্যা নেই।’ সেটিই ছিল বাবার সঙ্গে তার শেষ কথা। এর কিছুক্ষণ পরই পাটুরিয়া পুরাতন লঞ্চঘাট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান তিনি।

শহীদ রফিকের চাচাতো ভাই মো. জামাল হোসেন বলেন, নৌ পুলিশের যে সদস্য রফিককে গুলি করে হত্যা করছে, আজ দুই বছর হয়ে গেলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো বিচার কার্যক্রম হচ্ছে না। তাদের বিচারকার্য যেন সুষ্ঠুভাবে হয়, সরকার যেন এদিকে দৃষ্টি রাখে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করে।

নিহত রফিকের স্ত্রী শাবনূর আক্তার বলেন, যে রক্ত দিয়া দেশ স্বাধীন কইরা গেল, এখন তাদের বউ-বাচ্চা কোথায় আছে, কী করতেছে— তখন তো সবাই বলছে দেখবো। প্রতিদিন ১০০-২০০ মানুষ আইসা বলছে, আমরা পাশে আছি, তোমার সন্তান নিয়া চিন্তা করার কিছু নাই, তোমাকে ও তোমার সন্তানকে দেখবো। কই তারা? এখন রাস্তাঘাটে বের হইলে শহীদদের বউ-সন্তানকে তারা চিনতেই পারে না। সরকার থেকে যে আর্থিক সহায়তা পাই, তা দিয়েই আমাদের মা-মেয়ের কোনোরকমে দিন চলে যাচ্ছে। একমাত্র মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা আপু আমাদের খোঁজখবর নেন, তা ছাড়া আর কেউ নেন না। আমার স্বামীর ওপর গুলিবর্ষণকারী নৌ পুলিশের কঠোর বিচার চাই। আমার ছোট্ট মেয়েটা বাবা বাবা বলে ডাকে, ও এখনো বোঝে না যে তার বাবা নেই। যখন বুঝবে, আমাকে প্রশ্ন করবে বাবা কোথায়—তখন আমি কী উত্তর দেব?

তিনি বলেন, আজকে যাদের রক্তে দেশ স্বাধীন হইলো, তারা কই আছে, কী করতেছে, ভালো আছে নাকি খারাপ আছে— এই খোঁজ কে নিছে? আমার মেয়ে বেঁচে আছে কিনা, এই খবরটুকুও কেউ নেয়নি। বাবুর আব্বু মারা যাওয়ার পর কিছুদিন লোকজন আসছিল, এরপর আর কেউ ফিরেও তাকায়নি।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে রফিকের সঙ্গী তার বন্ধু সাকিব খান বলেন, ২৪ সালের ৫ আগস্ট সকাল ৮টার দিকে ঘাটে অবস্থান করি। সকাল থেকেই আমি ও আমার বন্ধু শহীদ রফিক আন্দোলনে যুক্ত ছিলাম। সকাল ৯টার পর আমার কোমরের নিচে হাঁটুর ওপরে গুলি লেগে দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। তখন আমার বন্ধু রফিক আমাকে অটোতে তুলে দেয়। অপারেশন চলাকালে খবর পাই, আমার বন্ধু রফিক পুলিশের গুলিতে মারা গেছে। আমাদের গুলি করেছে পাটুরিয়া ঘাটের টার্মিনালের ভেতর থেকে নৌ পুলিশ ও আওয়ামী লীগের কিছু লোক। আওয়ামী লীগের লোকজন পালিয়ে আছে, কিন্তু নৌ পুলিশের সদস্যরা তো দেশেই আছে, চাকরি করছে— তাদের কেন ধরা হচ্ছে না? নৌ পুলিশকে গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার দাবি জানাই।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক রমজান মাহমুদ বলেন, আমাদের জুলাই-আগস্টের যোদ্ধা শহীদ রফিক ৫ আগস্ট শাহাদাতবরণ করেন। এরপর দুই বছর পার হলেও মূল আসামিকে ধরা হচ্ছে না। তার নাম ৪৯ নম্বরে থাক বা ৫০০ নম্বরে থাক, তাতে আপত্তি নেই— কিন্তু মূল আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দেওয়া হোক।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুম বলেন, রফিক হত্যা মামলাটি আমাদের এখানে তদন্তাধীন আছে। আমাদের তদন্তকারী কর্মকর্তা বিষয়টি তদন্ত করছেন। মূল আসামির বিষয়ে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি। তদন্তের স্বার্থে বেশি কিছু বলা যাচ্ছে না। তদন্ত শেষ করে যথাযথ বিচার নিশ্চিত করতে যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু চেষ্টা আমরা করছি।

সাইফুল ইসলাম/আরএআর