‘গাইবান্ধা শহরজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি। সড়কে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন বয়সী হাজারো মানুষ। শহরের প্রধান সড়ক ডিবি রোডে যানবাহন তেমন নেই। এর মধ্যে খবর ছড়িয়ে পরে—এসপি অফিস ঘেরাও হয়েছে। পৌর পার্ক থেকে বাসস্ট্যান্ড অতিক্রম করতেই চোখে পড়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে (পূর্ব পাশের গেটের দিকে) সড়কের ওপরে কালো ধোঁয়া উড়ছে। ডিসি অফিস ও এসপি অফিসের পূর্ব-পশ্চিম দুই দিকে ছাত্র-জনতা অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন।’
এভাবেই ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের সেই ভয়াবহ স্মৃতির কথা ঢাকা পোস্টকে বলছিলেন তৎকালীন বার্তাবাজার অনলাইনের গাইবান্ধা প্রতিনিধি গুলিবিদ্ধ সাংবাদিক সুমন মিয়া।
তিনি বলেন, গাইবান্ধা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের পশ্চিম গেট থেকে এসপি অফিসের গেট পর্যন্ত পুলিশে পরিপূর্ণ। পুলিশ দুই দিকেই ছাত্রদের নিবৃত করতে টিয়ারশেল ছুড়ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসস্ট্যান্ডের দিক থেকে একদল শিক্ষার্থী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের পশ্চিম গেটে থাকা পুলিশের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। পুলিশ তখন পিছু হটে এবং এসপি অফিসের সামনের দিকে পিছিয়ে যায়। এক পর্যায়ে ছাত্র-জনতা এসপি অফিসের সামনে আসলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ বাধে। পুলিশ ছররা গুলি ছুড়লে আন্দোলনকারী দুইশতাধিক ছাত্র-জনতা আহত হন। তাদের মধ্যে আমরা তিনজন সাংবাদিক গুলিবিদ্ধ হয়ে তাৎক্ষণিক মারাত্মকভাবে আহত হই।
সুমন মিয়া বলেন, পুলিশের একযোগে কাঁদানে গ্যাস, টিয়ারশেল এবং ছররা গুলিতে আমরা গুলিবিদ্ধ হই। আমার শরীরে পাঁচটি ছররা গুলি। গুলির আঘাতে আমার পায়ে গভীর ক্ষত হয়ে রক্ত ঝড়ছিল। মুহূর্তেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়, চারদিক যেন অন্ধকার হয়ে আসে। আমার সামনে সহকর্মী রিপন আকন্দ কাটা মুরগির মতো ছটফট করছিলেন। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল তার। এ দৃশ্য দেখার পর আমিও জ্ঞান হারাই।
ঢাকা পোস্টের তৎকালীন গাইবান্ধা প্রতিনিধি সাংবাদিক রিপন আকন্দ বলেন, সেদিন গুলিবিদ্ধ হয়ে আত্মরক্ষার জন্য আমি এবং সুমন এসপি অফিসের সামনে একটি ফাঁকা স্থানে আশ্রয় নিই। পরে সেখানে কাঁদানে গ্যাসের ঝাঁঝে টিকতে না পেরে মই বেয়ে দেওয়াল টপকে পাশের বাড়িতে আশ্রয় নিই।
তিনি বলেন, তখনও চোখে জ্বালাপোড়া হচ্ছিল, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার অবস্থা। আশ্রয় নেওয়া ওই বাড়ির লোকজন আমাদের পানি দেন, সুমনের মাথায় পানি দেওয়া হয়। পরে একসঙ্গে থাকা সহকর্মী জাভেদ ভাইকে ফোন দিলে তিনি অন্য পথে সেখানে উপস্থিত হন। একত্রে আমরা চিকিৎসার জন্য গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে যাই। কিন্তু হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ আহদের এতই ভিড়, আমরা চিকিৎসার সুযোগ না পেয়ে গাইবান্ধার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিই। সবচেয়ে বেশি গুলি লেগেছে সাংবাদিক জাভেদ হোসেনের শরীরে। আর আমার হাতে এবং কোমড়ে দুটি গুলি লাগে।
সেদিনের সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতিচারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট করেছেন শরীরে বিভিন্ন অঙ্গে ১৫টি গুলিবিদ্ধ হওয়া ঢাকা টাইমসের গাইবান্ধা প্রতিনিধি ও গাইবান্ধা প্রেসক্লাবের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক জাভেদ হোসেন। তিনি লেখেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট আমি ছিলাম সেই রক্তাক্ত দিনের একজন সাক্ষী।
তিনি আরও লেখেন, এসপি অফিসের সামনে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশের বাধাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ শুরু হয়। মুহূর্তেই চারদিকে কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড এবং গুলির শব্দ ছড়িয়ে পড়ে। নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চলতে থাকে। অনেকেই রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
সেই মুহূর্তে আমরা কয়েকজন সাংবাদিক নিজেদের নিরাপত্তার কথা না ভেবে সামনে দাঁড়িয়ে পুলিশের উদ্দেশে চিৎকার করে বলেছিলাম, ‘গুলি বন্ধ করুন... গুলি বন্ধ করুন…’ কিন্তু আমাদের কণ্ঠস্বর তাদের থামাতে পারেনি। হঠাৎই পুলিশের ছোড়া গুলি আমাদের দিকেও এসে আঘাত হানে। আমিও গুলিবিদ্ধ হই। আমার সঙ্গে আরও দুইজন সাংবাদিক রক্তাক্ত হন। শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল, কিন্তু তখন নিজের কষ্টের চেয়েও বেশি কষ্ট হচ্ছিল নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর সেই নির্মম হামলা দেখে।
জাভেদ হোসেন ওই পোস্টে লেখেন, এরপর শুরু হয় আমার দীর্ঘ চিকিৎসা জীবন। শরীরে থাকা গুলির স্প্লিন্টার অপসারণ, একের পর এক অস্ত্রোপচার, হাসপাতালের বেডে অসংখ্য দিন-রাত, অসহনীয় ব্যথা আর পুনর্বাসনের কঠিন পথ—সবকিছুই আমাকে পাড়ি দিতে হয়েছে। আজও সেই গুলির ক্ষত পুরোপুরি সেরে ওঠেনি। শরীরের ব্যথা এখনো আমাকে সেই দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমি সেই ইতিহাসের একজন জীবন্ত সাক্ষী, যে নিজের শরীরে সেই দিনের নির্মমতার ক্ষত বহন করে চলেছি।
তিনি আরও লেখেন, তারপর এলো ৫ আগস্ট। ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। কিন্তু এই বিজয় কোনো সহজ অর্জন ছিল না। এই বিজয়ের পেছনে রয়েছে অসংখ্য শহীদের রক্ত, আহতদের কান্না এবং সাধারণ মানুষের অকুতোভয় আত্মত্যাগ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের তৎকালীন চিকিৎসক ডা. তানভির রহমান কল্লোল মুঠোফোনে বলেন, সেদিন (২০২৪ সালের ৪ আগস্ট) দুপুরের দিকে মুহূর্তেই স্রোতের মতো শিক্ষার্থীসহ আহতরা হাসপাতালে আসতে থাকেন। আমরা সব বিভাগের চিকিৎসকরাই চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমি নিজেও আহতদের শরীর থেকে প্রচুর গুলি বের করেছি।
তিনি আরও বলেন, যখন স্রোতের মতো আহতরা হাসপাতালে আসতে ছিলেন তখন আর প্রসেস মেইনেটেইন (ভর্তি, রেজিস্ট্রার ফরম পূরণ) করা সম্ভব হয়নি। কেননা, অনেক আহতদের ভিড়ে সেবা পেতে কিছুটা বিলম্ব হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ক্ষেপে যান। তখন ভর্তি ফরম পূরণ ছাড়াই আমরা যে যেভাবে পারি দ্রুত আহতদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া শুরু করি। আহতদের অধিকাংশই ছিল গুলিবিদ্ধ।
পুলিশের হামলার ঘটনায় মামলা
সেদিন পুলিশের হামলার ঘটনায় একই বছরের ১১ নভেম্বর গাইবান্ধার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হত্যাচেষ্টা মামলা করেন জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কিশাতম হলদিয়া গ্রামের মৃত দিল মোহাম্মদের ছেলে ওয়াহেদুর রহমান নামের এক ব্যক্তি। তিনি পেশায় একজন টেইলার্স মাস্টার (দর্জি)। পরে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইন্ভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।
ওই মামলায় পলাতক দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, গাইবান্ধার তৎকালীন পুলিশ সুপার কামাল হোসেন ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাসহ ৭০ জনকে আসামি করা হয়।
মামলার এজাহারে সেদিন শরীরে ৯টি গুলিবিদ্ধ হয়ে বাদী মাটিতে লুটিয়ে পড়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
মামলাটির তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন তাখিল করা হয়েছে বলে ঢাকা পোস্টকে জানিয়েছে গাইবান্ধার পিবিআই।
গাইবান্ধা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) শরীফ আল রাজীব ঢাকা পোস্টকে বলেন, তৎকালীন সময়ের সবগুলো মামলাই তদন্তাধীন রয়েছে।
এর আগে ৪ আগস্ট সকাল থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এলাকায় একত্রিত হতে থাকেন আন্দোলনকারীরা। এ সময় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার হাজারো মানুষ। ফলে দখলে থাকা শহরে যানচলাচল বন্ধ করে দেন শিক্ষার্থীরা। তারা ধীরে ধীরে এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে একটি বিশাল মিছিল শহরের প্রধান সড়ক (ডিবি রোড) প্রদক্ষিণ করে পৌর পার্কের শহীদ মিনার এলাকায় অবস্থান নেয়। পরে দুপুরে সেখান থেকে মিছিল নিয়ে ডিবি রোড হয়ে আবারও পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে গেলে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ বাঁধে। এ সময় মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে প্রথমে পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট ছোড়ে। এক পর্যায়ে বিক্ষিপ্ত আন্দোলনকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও গাড়ি ভাঙচুর করে। এরপর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে ছররা গুলি ছোড়ে। এতে তিন সাংবাদিক, পথচারী ও দুইশতাধিক আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হন। পরে গুলিবিদ্ধদের চিকিৎসার জন্য গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে হাসপাতালে যায়গা সংকট এবং সহজে চিকিৎসাসেবা না পেয়ে অনেক গুলিবিদ্ধ আন্দোলনকারী হাসপাতালের নিকটবর্তী সব বেসরকারি ক্লিনিকসহ জেলা শহরের বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রেও চিকিৎসা নেন।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট ২০১৮ সালে জারি করা কোটা বাতিলের সরকারি পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করলে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ মোট ৫৬ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল হয়। এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা নতুন করে আন্দোলনে নামেন এবং কোটা বাতিলের নির্বাহী আদেশ জারির দাবি জানান। পরবর্তীতে ১০ জুলাই হাইকোর্টের রায়ের ওপর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চার সপ্তাহের স্থিতাবস্থা ঘোষণা করে ৭ আগস্ট পরবর্তী শুনানির তারিখ ধার্য করা হয় এবং ১৪ জুলাই কোটা বহালের পক্ষে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ পেলে গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে শিক্ষার্থীরদের এ আন্দোলন শেষে ১ দফার অসহযোগ আন্দোলনে রূপ নেয়। যার ফলে ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতন হয়।
এএমকে
