বিজ্ঞাপন

৪ আগস্ট পাবনায় ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায় আ.লীগ, শহীদ হয় দুই শিক্ষার্থী

৪ আগস্ট পাবনায় ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায় আ.লীগ, শহীদ হয় দুই শিক্ষার্থী

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ের এক বিভীষিকাময় দিন ছিল ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। সেদিন পাবনা শহরে ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে গুলি চালান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা।  গুলিতে শহীদ হন পাবনা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র জাহিদুল ইসলাম জাহিদ এবং ছিদ্দিক মেমোরিয়াল স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র মাহবুব হাসান নিলয়। আহত হন আরও শতাধিক আন্দোলনকারী।

৪ আগস্ট সকাল থেকেই পাবনা শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বিভিন্ন মোড়ে অবস্থান নিতে দেখা যায় আন্দোলনকারীদের। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দিক থেকে মিছিল এসে জড়ো হতে থাকে এডওয়ার্ড কলেজ গেটে। বেলা ১১টার দিকে কলেজ গেট থেকে হাজারো ছাত্র-জনতার মিছিল এসে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান নেয় ট্রাফিক মোড়ে। দুপুর পর্যন্ত স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল ছিল গোটা পাবনা শহর, তখনো অবস্থান ছিল শান্তিপূর্ণ। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সেই কর্মসূচি রূপ নেয় রক্তাক্ত ময়দানে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সেদিন শহরের এক প্রান্তে অবস্থান নেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মী ও জনতা, অন্য প্রান্তে অবস্থান নেয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। আন্দোলনকারীরা ছিলেন নিরস্ত্র, আর তৎকালীন সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা ছিলেন আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রে সুসজ্জিত। একপর্যায়ে সহযোগীদের নিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করেন পাবনা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ভাঁড়ারা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবু সাঈদ খান। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন জাহিদ ও নিলয়। আহত হন অসংখ্য মানুষ।

শিক্ষার্থীদের মিছিলে গোলাম ফারুক প্রিন্স ও আবু সাঈদ খানকে গুলি করতে দেখা যায়

৫ আগস্ট সরকার পতনের পর নিহত জাহিদুল ইসলামের বাবা দুলাল উদ্দিন বাদী হয়ে পাবনা সদর থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ভাঁড়ারা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ খানকে প্রধান আসামি করে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পাবনা-৫ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্স, সাবেক সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ মোশাররফ হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক প্রচার সম্পাদক কামিল হোসেনসহ ১০৩ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করেন তিনি। তদন্ত শেষে আওয়ামী লীগের ১৩৬ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী সাদিয়া কুদ্দুস ৪ আগস্টের স্মৃতি স্মরণ করে বলেন, আমি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় একজন কর্মী ছিলাম। মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও আন্দোলনে সবসময় সক্রিয় থেকেছি। এখানে আমাকে সহযোগিতা করেছে আমার পরিবার এবং আমি যে মেসে থাকতাম সেই মেসের মালিক। সেদিন সকালে শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে এডওয়ার্ড গেটে ছাত্র-জনতা আসতে থাকে। একপর্যায়ে আমরা সবাই বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শহরের ট্রাফিক মোড়ে (বর্তমানে শহীদ চত্বর) যাই। আমি মিছিলের মাঝামাঝি অবস্থান করছিলাম, সেদিন আমার সঙ্গে আমার মাও ছিলেন। শান্তিপূর্ণ অবস্থানে থাকাকালীন হঠাৎ আওয়ামী লীগ নেতা আবু সাঈদ ছাত্রদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে। সেই ঘটনায় আমাদের ভাই জাহিদ ও নিলয় শহীদ হন।

দোষীদের বিচারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, আমি এই ঘটনার প্রধান আসামিসহ সব সহযোগীর সঠিক বিচার চাই। এখনো আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে, এটি খুবই দুঃখজনক।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পাবনা জেলার সাবেক সমন্বয়ক আসিফ আহমেদ বলেন, ৪ আগস্ট আমি বেশ কিছু ছাত্রের সঙ্গে টার্মিনাল এলাকা থেকে বিভিন্ন অলিগলি দিয়ে কলেজ গেটে গিয়ে পৌঁছাই। কলেজ গেট থেকে সবাই মিলে বিক্ষোভ মিছিল বের করে শহরে আসি। আমরা শান্তিপূর্ণভাবেই অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলাম। হঠাৎ আবু সাঈদ আমাদের ওপর অতর্কিতভাবে শটগান দিয়ে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। এত আওয়াজ হচ্ছিল যে আমি মনে করেছিলাম বোমা মারছে। আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা এমন আওয়াজ আগে কখনো শুনিনি।

তিনি আরও বলেন, তবে আমাদের মনে জোর ছিল, আমরা এই আন্দোলন সফল করতে পারব। তাই আবু সাঈদ গুলি করার পরও তাৎক্ষণিকভাবে সবাই ছোটাছুটি করলেও আমরা সবাই মিলে হামলাকারীদের ধাওয়া দিই। তারা পালিয়ে গেলে আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাই এবং আন্দোলন আরও জোরালো করি।

শহীদ জাহিদুল ইসলামের বাবা দুলাল উদ্দিন বলেন, ৪ আগস্ট সকালেও বলেছিলাম, আজ আন্দোলনে যেতে হবে না। তবু তারা তিন ভাই আন্দোলনে যায়। দুপুরের দিকে অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আসে। অপর পাশ থেকে বলা হয়, আপনি কি জাহিদের বাবা, জাহিদ তো মারা গেছে। ৫ আগস্টের পর আমি বাদী হয়ে ১০৩ জনের নাম উল্লেখ করে এজাহার দায়ের করি। এখনো প্রকৃত আসামিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। আমি দ্রুত প্রকৃত আসামিদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানাই।

শহীদ মাহবুব হাসান নিলয়ের মা দিল আফরোজা বলেন, আমি সবসময় ছেলে-মেয়েদের আন্দোলনে যেতে উৎসাহ দিতাম। আমার ছেলে নিলয় পাবনা থেকে আন্দোলন করেছে, আর আমার মেয়ে ঢাকায় থাকতো, তাকেও আন্দোলনে যেতে উৎসাহ দিতাম। তবে আমার ছেলে নিলয় শহীদ হবে, এটি কখনো কল্পনা করিনি। সব সন্তানহারা বাবা-মায়ের মতো আমারও চাওয়া, আমার সন্তানের হত্যাকারীর সঠিক বিচার হোক।

পাবনার পুলিশ সুপার আবু আশরাফ বলেন, আমি মাত্র দুই দিন হলো পাবনায় যোগদান করেছি। এখনো এই মামলা সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা হয়নি। তবে আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। আসামি জেলার বাইরে থাকলেও আমরা তাদের ধরার চেষ্টা করবো। 

আরএআর