বিজ্ঞাপন

তিনজনের মরদেহ উদ্ধার, প্রত্যেকের শরীরে হাতুড়ি ও রডের আঘাতের চিহ্ন

তিনজনের মরদেহ উদ্ধার, প্রত্যেকের শরীরে হাতুড়ি ও রডের আঘাতের চিহ্ন

বাগেরহাটের কচুয়ায় নিজ বসতঘর থেকে একই পরিবারের তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত তিনজনের প্রত্যেকের শরীরে হাতুড়ি ও রডের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে, বিশেষ করে মাথায় আঘাতের চিহ্ন বেশি। শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে রক্তও বের হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা। এসব আলামত দেখে প্রাথমিকভাবে এটিকে হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করছে পুলিশ।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুরে কচুয়া উপজেলার রাড়ীপাড়া ইউনিয়নের চান্দেরকোলা গ্রামের ঘরের ভেতর মরদেহগুলো দেখতে পান স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ শেষে রাত ৮টার দিকে মরদেহের সুরতহাল শেষ হয়, পরে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয় বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতাল মর্গে।

নিহতরা হলেন- চান্দেরকোলা গ্রামের মৃত আবদার আলী হাওলাদারের ছেলে আহাদ হাওলাদার (২৫), তাঁর মা মনিরা বেগম (৬০) এবং আহাদের নানি রাশিদা বেগম (৯৩)। রাশিদা বেগম বাগেরহাট সদর উপজেলার বৃষ্টিপুর গ্রামের মৃত আব্দুর রশীদের স্ত্রী। কয়েক দিন আগে তিনি মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। মনিরা বেগমের স্বামী অনেক আগেই মারা যান, এরপর দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে এলাকায় থাকতেন তিনি। তার বড় ছেলে ফয়সাল ও মেয়ে রামিসা ঢাকায় থাকেন। আহাদ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে দিনমজুর (লাইন শ্রমিক) হিসেবে কাজ করতেন, আর মনিরা বেগম স্থানীয় সাইনবোর্ড বাজারের একটি হোটেলে কাজ করতেন।

সাইনবোর্ড-বগী আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে চান্দেরকোলা গ্রামের ছোট্ট ভাঙাচোরা টিনের ঘরে থাকতেন মা-ছেলে। দুই ছেলের জন্য একটি ভবন নির্মাণ শুরু করেছিলেন মনিরা বেগম। দুই কক্ষবিশিষ্ট ভবনের কিছু কাজ শেষ হলেও পুরো নির্মাণ শেষ হয়নি, তাই ভাঙাচোরা টিনের ঘরেই থাকতেন তাঁরা। সেই টিনের ঘর ও কাঠের বেড়ার ফাঁক দিয়েই পচা মরদেহের গন্ধ বের হচ্ছিল।

একই পরিবারের তিনজনের একসঙ্গে মৃত্যুর খবরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। চান্দেরকোলাসহ আশপাশের এলাকা থেকে কয়েক হাজার মানুষ ওই বাড়িতে জড়ো হন। খবর শুনে বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে আসেন নিহতদের স্বজনরাও।

নিহতদের নিকট আত্মীয় স্বপন নামের এক যুবক বিলাপ করে বলেন, আমার দাদি (রাশিদা বেগম) খুব ধর্মপ্রাণ নারী, এখনো তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করেন। তাঁকে, আমার ফুফু ও ফুপাতো ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তাদের শরীরে রক্তের দাগ, আঘাতের চিহ্ন—দাদির চোখ বের হয়ে যাওয়ার মতো হয়ে গেছে, দেখা যায় না। আজ দুই দিন তিনটা মানুষের কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না, আশপাশের লোকজন কী দেখেনি?

স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, আহাদ পল্লী বিদ্যুতের বিভিন্ন কাজ করতেন। এলাকার যে কেউ ডাকলেই চলে যেতেন, খুবই ভালো ছেলে ছিলেন। তাদের পুরো পরিবারকে এভাবে কারা মারতে পারে, এটা আমাদের চিন্তার বাইরে। 

যারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান এলাকাবাসী।

মৃত্যুর খবর শুনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন কচুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী হোসেন, বাগেরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মহিদুর রহমানসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এ ছাড়া বাগেরহাট জেলা গোয়েন্দা পুলিশ, কচুয়া থানা পুলিশ, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একাধিক দল হত্যার রহস্য উদঘাটনে কাজ শুরু করেছে। তারা বসতঘর ও মরদেহ পর্যবেক্ষণ করেছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেছে।

দুপুর থেকে ঘটনাস্থলে থাকা কচুয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাহমুদ হাসান বলেন, মরদেহ তিনটি পচতে শুরু করেছে, কিছুটা গন্ধও ছড়িয়েছে। প্রতিটি মরদেহের শরীরে হাতুড়ি ও রডের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে, বিশেষ করে মাথায় আঘাতের চিহ্ন বেশি। শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে রক্তও বের হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, এমনকি দুই দিন আগেও ঘটে থাকতে পারে।

একাধিক প্রতিবেশী জানান, রোববার থেকেই নিহতদের দেখা যায়নি। তবে নিকট আত্মীয় বা প্রতিবেশীদের সঙ্গে খুব একটা সম্পর্ক না থাকায় কেউ খোঁজখবর নেননি। আজ মরদেহ পাওয়ার পরই এলাকায় শোরগোল পড়ে যায়।

বাগেরহাটের পুলিশ সুপার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার বলেন, মরদেহগুলোর মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে, এ কারণে প্রাথমিকভাবে এটি হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাটি দুই থেকে তিন দিন আগে ঘটেছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। বাড়িতে লোকজনের আনাগোনা না থাকায় বিষয়টি এত দিন কারও নজরে আসেনি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে, আগামীকাল তা সম্পন্ন হবে। হত্যার রহস্য উদঘাটন এবং হত্যাকারীদের শনাক্ত ও আটক করতে পুলিশের একাধিক দল কাজ শুরু করেছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

শেখ শামীম হাসান/আরএআর