বিজ্ঞাপন

বিজয়ের দিনও অকাতরে জীবন দেন অনেকে

আন্দোলনের অন্যতম দুর্গ : হাসিনাকে হটাতে শেষ পর্যন্ত লড়েন সাভারের মানুষ

আন্দোলনের অন্যতম দুর্গ : হাসিনাকে হটাতে শেষ পর্যন্ত লড়েন সাভারের মানুষ

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একদফা দাবি ও গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত দিনে (৫ই আগস্ট) ঢাকার প্রবেশদ্বার সাভার পরিণত হয়েছিল এক রণক্ষেত্রে। দিনভর চলা তীব্র সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিবর্ষণে রণক্ষেত্রে রূপ নেয় পুরো এলাকা। প্রাণ হারায় বেশ কয়েকজন এবং গুলিবৃদ্ধ হয়ে আহত হয় শতাধিকেরও বেশি মানুষ।

সকালে থেকেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে থাকে। পূর্বে ঘোষিত মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচিতে ঘোষণা অনুসারে বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে জড়ো হয়। পরে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে  বড় হতে থাকে ‘মার্চ টু ঢাকা’য় অংশ গ্রহণকারীর সংখ্যা। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকার দিকে রওনা দেন আন্দোলনকারীরা। এরপর দুপুরে আন্দোলনকারীরা সাভারে এসে পৌঁছালে পুলিশ বাঁধা দেয়। পুলিশের বাঁধার মুখে আন্দোলনকারীরা বুক ফুলিয়ে সড়কেই অবস্থান নেন। এর এক পর্যায়ে সাভার নিউ মার্কেটের সামনে আন্দোলনকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। এসময় আন্দোলনকারী ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া ও পাল্টা ধাওয়া চলে। এর একপর্যায়ে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিরস্ত্র আন্দোলকারীদের ওপর গুলি বর্ষণ করে। এতে সাভারে শ্রাবণ গাজী নামে এক শিক্ষার্থী মাথায় গুলিবৃদ্ধ হয়ে মারা যান। সেখানে অর্ন্তত আহত হয় অর্ধশতাধিক আন্দোলনকারী।

দুপুরে খবর আসে জাতির উদ্দেশ্যে সেনা প্রধান ভাষণ দেবেন। সেই খবরের পর থেকেই পুলিশ বাহিনী পিছু হটতে শুরু করে। দুপুরের পর থেকেই আন্দোলনকারীরা পাল্টা ধাওয়া করে পুলিশ বাহিনীর ওপর। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সাভার মডেল থানার সামনে অবস্থা নেন। সেসময় আন্দোলকারীরা পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্য অগ্রসর হয়। এসময় বেলা ২ টার দিকে প্রথমে সাভার প্রেসক্লাবে ভাঙচুর অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরে থানার দিকে আন্দোলকারীরা এগিয়ে গেলে পুলিশ গুলি চালায়। তবে আন্দোলকারীরা পিছু না হটে  সাভার সরকারি কলেজের সামনে অবস্থান নেন। দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত দফায় দফায় আন্দোলনকারী সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এরমধ্যে সাভার পাবলিক লাইব্রেরী ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়। এর এক পর্যায়ে রক্তে লাল হয়ে ওঠে সাভার থানা রোড়ের সড়কের বিভিন্ন জায়গায়। সন্ধ্যায় আন্দোলকারী সাভার অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে অবস্থান নিলে পুলিশ সদস্যরা কিছু সময়ের জন্য থানার ভেতরে চলে আসে। তার কিছু সময় পরে সন্ধ্যার আযানের সময় দল বেঁধে পুলিশ সদস্যরা থানা থেকে বের হয়। এসময় পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলিতে শতাধিক আন্দোলকারী আহত হয়। সেসময় আব্দুল আহাদ সৈকত, মোঃ হৃদয় আহমেদ, আলামিন হোসেন, মিঠু বিশ্বাস মারুফসহ একাধিক ব্যক্তি নিহত হয় । পরে পুলিশ সদস্যরা এলোপাতাড়ি গুলি করে সাভার বাসস্ট্যান্ড পার হয়ে সেনা বাহিনীর ঘাঁটিতে আশ্রয় নেন।

প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক সেলিম আহম্মেদ জানান, ৪ আগস্ট বিকেলে সাভার থানা রোড়ে আন্দোলকারীরা থানার দিকে এগিয়ে আসেছিল। এসময় আন্দোলনকারীদের একটি অংশের লোকজন সাভার প্রেসক্লাব ভাঙচুরের চেষ্টা করে। এসময় পুলিশ সদস্যরা এসে ধাওয়া দেয়। পরের দিন ৫ই আগস্ট দুপুরে আন্দোলনকারীরা সাভার থানা রোড়ে অবস্থান নেন। এসময় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশের গুলিতে অনেক আন্দোলনকারী নিহত ও আহত হয়েছে বলে জানান তিনি।   

নিহত শ্রাবণ গাজীর বাবা মান্নান গাজী বলেন,আমার ছেলে কোটা বিরোধী আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করেছিল। মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচিতে যখন আন্দোলকারীরা ঢাকা দিকে যাচ্ছিল সেসময় সাভারের নিউ মার্কেটের সামনে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর দমন পীড়ন চালায়। এতে আমার ছেলে মাথায় গুলিবৃদ্ধ হয়। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তৃব্যরত চিকিৎসক শ্রাবণকে মৃত ঘোষণা করে।

কোটা আন্দোলনে আহত মনঞ্জয় জানান, আমি ৫ আগস্ট সাভার থানার সামনে গেলে পুলিশ আমার হাতে গুলি করে। পরে আমি পাশেই সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে যাই। এরপরে আমাকে সাভারের এনাম মেডিকলে কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে অপারেশন করে আমার হাত কেটে বাদ দিতে হয়েছে।

ঢাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম,অপস এন্ড ট্রাফিক) জাহাঙ্গীর আলম ঢাকা পোস্টকে জানান, কোটা বিরোধী আন্দোলনে সাভার ও ধামরাইতে এক শতাধিকের বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পলাতক আসামীদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানান পুলিশের ওই কর্মকর্তা।

লোটন আচার্য্য/এমটিআই

বিজ্ঞাপন