‘বিজয় অথবা শহীদ’ আন্দোলনের শেষ মুহূর্তে এমন একটি পোস্ট শেয়ার করেছিলেন বরিশালের বাবুগঞ্জের তরুণ শিক্ষার্থী রাকিব হোসাইন। এর কিছুক্ষণ পরই সহপাঠীদের সঙ্গে মিছিলে যোগ দিয়ে ঢাকায় পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান তিনি। গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত বিজয়ের আজকের এই দিনে (৫ আগস্ট) শহীদ হওয়া রাকিবের দ্বিতীয় শাহাদাতবার্ষিকীতে তাকে স্মরণ করছেন স্বজন, সহপাঠী ও এলাকাবাসী।
বাবুগঞ্জ উপজেলার মানিককাঠি গ্রামের কৃষক আলমগীর হোসেনের ছোট ছেলে রাকিব। অসুস্থ মা এখনও বিশ্বাস করেন, একদিন ছেলে ফিরে আসবে। সেই অপেক্ষার যেন শেষ নেই। আর বাবা প্রতিদিনই ছেলের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
পরিবার ও সহপাঠীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদের ফেসবুক পোস্ট ‘বিজয় অথবা শহীদ’ নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেছিলেন রাকিব। এরও কিছুক্ষণ আগে তিনি নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, আসিফ মাহমুদসহ আন্দোলনের সামনের সারির নেতাদের ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লিখেছিলেন, ‘আজ যুদ্ধে যাচ্ছে বাংলাদেশ।’
এরপরই তিনি সহপাঠীদের সঙ্গে মিছিলে যোগ দেন। সেদিন প্রবল বৃষ্টির মধ্যেই প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীর একটি মিছিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের উদ্দেশে রওনা হয়।

রাকিবের বড় ভাই আবুল কালাম প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকাল প্রায় ১১টার দিকে মিছিলটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে পৌঁছালে সেখানে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা গুলি ছোড়ে। এতে মিছিলের সামনের সারিতে থাকা রাকিবসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হন। সহপাঠীরা তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। পরদিন সকালে বাবুগঞ্জ উপজেলার মানিককাঠি বাজারে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
আবুল কালাম আরও বলেন, পুলিশের ছোড়া দুটি গুলি রাকিবের পেটে লাগে। এর মধ্যে একটি গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায়।
রাকিব বাবুগঞ্জের খানপুরা আলিম মাদরাসা থেকে দাখিল এবং বরিশালের ইনফ্রা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন। পরে তিনি সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১০ম ব্যাচের শিক্ষার্থী হিসেবে বিএসসি অধ্যয়নরত ছিলেন।
রাকিবের সহপাঠী হাসানুল বান্না বলেন, রাকিবসহ আমরা তিন বন্ধু শুরু থেকেই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। রাকিব অত্যন্ত মেধাবী, সাহসী ও প্রতিবাদী ছিল। সে প্রায়ই মিছিলের সামনের সারিতে থাকত। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল না।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আবদুস সালাম বলেন, রাকিব এলাকায় সাহসী ও প্রতিবাদী তরুণ হিসেবে পরিচিত ছিল। অন্যায় দেখলে সে কখনো নীরব থাকত না। কৃষক বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
কৃষক বাবা আলমগীর হোসেন বলেন, অনেক কষ্ট করে কৃষিকাজের আয় দিয়ে ছেলেকে ঢাকায় পড়তে পাঠিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম লেখাপড়া শেষ করে একদিন সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু সে আর ফিরল না, ফিরল শুধু তার নিথর দেহ। একজন বাবার জন্য এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে! আন্দোলনের সময় বড় ছেলেটার কোম্পানির চাকরিটাও চলে যায়। সরকার যদি আমার বড় ছেলেটার একটা চাকরির ব্যবস্থা করে, তাহলে পরিবারটা একটু হলেও দাঁড়াতে পারবে।
বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা উল হুসনা বলেন, আমরা যথাসম্ভব শহীদ পরিবারের খোঁজখবর রাখছি। রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিগুলোতে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সম্মানের সঙ্গে আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমাদের উপজেলায় তিনজন শহীদ রয়েছেন। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের বাড়ির রাস্তা নির্মাণ, টিউবওয়েল স্থাপনসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে উপজেলা প্রশাসন সহযোগিতা করে যাচ্ছে।
দ্বিতীয় শাহাদাতবার্ষিকীতে রাকিবকে স্মরণ করছেন স্বজন, সহপাঠী ও এলাকাবাসী। স্বপ্নবাজ এই তরুণের অসমাপ্ত পথচলা নতুন প্রজন্মকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার সাহস জোগাবে বলে মনে করছেন তারা।
আরিফ হোসেন/এসএইচএ
