গোবর মানেই দুর্গন্ধ আর বর্জ্য এমন ধারণা বদলে দিয়েছেন শরীয়তপুরের খামারি জাহাঙ্গীর আলম গোলদার। গরুর গোবর থেকেই উৎপাদন করছেন বায়োগ্যাস, আর সেই গ্যাসেই জ্বলছে রান্নাঘরের চুলা। নেই এলপিজি সিলিন্ডার কেনার খরচ, নেই গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তা। ইউটিউবের একটি ভিডিও থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নেওয়া তার এই উদ্যোগ এখন এলাকায় হয়ে উঠেছে অনুকরণীয় উদাহরণ।
জানা গেছে, গোসাইরহাট উপজেলার খাগৈর গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম ২০২৩ সালে নিজের বাড়ির পাশে মাত্র ছয়টি গরু নিয়ে ছোট একটি খামার গড়ে তোলেন। খামারে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গোবর জমলেও দীর্ঘদিন সেগুলোর কোনো কার্যকর ব্যবহার ছিল না। পরে ইউটিউবে গরুর গোবর থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদনের একটি ভিডিও দেখে তার আগ্রহ তৈরি হয়। বিষয়টি নিয়ে আরও খোঁজখবর নেওয়ার পর চলতি বছরের মে মাসের শুরুতে পাবনা থেকে দক্ষ মিস্ত্রি এনে খামারের পাশেই নির্মাণ করেন একটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির পাশেই নির্মিত হয়েছে প্ল্যান্টটি। সেখানে ইটের তৈরি একটি ট্যাংকে প্রথমে গরুর গোবর ও পানি মিশিয়ে তরল মিশ্রণ তৈরি করা হয়। এরপর পাইপের মাধ্যমে সেই মিশ্রণ মাটির নিচে থাকা ডাইজেস্টার ট্যাংকে প্রবেশ করে। জৈব প্রক্রিয়ায় সেখানে উৎপাদিত বায়োগ্যাস, গ্যাস হোল্ডারে জমা হয়। পরে পাইপলাইনের মাধ্যমে সেই গ্যাস সরাসরি বাড়ির রান্নাঘরের চুলায় পৌঁছে যায়। প্রতিদিন সেই গ্যাসেই পরিবারের সব রান্নাবান্না চলছে।
বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের উদ্যোক্তা জাহাঙ্গীর আলম গোলদার ঢাকা পোস্টকে বলেন, ইউটিউবে গোবর থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদনের ভিডিও দেখে আগ্রহ তৈরি হয়। পরে ভিডিওতে দেওয়া মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করলে পাবনা থেকে দুইজন মিস্ত্রি এসে মাত্র ১০ দিনের মধ্যে প্ল্যান্টটি নির্মাণ করে দেন। পুরো প্ল্যান্ট স্থাপনে আমার প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শুরুতে প্রায় ২০ মণ গোবরের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি মিশিয়ে ট্যাংকে সংরক্ষণ করি। কয়েকদিন পর থেকেই গ্যাস উৎপাদন শুরু হয়। এখন প্রতিদিন সেই গ্যাস দিয়েই পরিবারের সব রান্নার কাজ সম্পন্ন হচ্ছে।

জাহাঙ্গীর গোলদারের দাবি, তার খামার থেকে প্রতিদিন প্রায় ১২০ কেজি গোবর পাওয়া যায়। এই গোবর থেকে উৎপাদিত বায়োগ্যাস দিয়ে একসঙ্গে চারটি চুলা চার ঘণ্টারও বেশি সময় জ্বালিয়ে রাখা সম্ভব। ফলে এলপিজি বা অন্য কোনো জ্বালানির ওপর আর নির্ভর করতে হচ্ছে না তার।
জাহাঙ্গীরের স্ত্রী রত্না বেগম ঢাকা পোস্টকে বলেন, শুরুর দিকে বিশ্বাস করতে পারিনি যে গোবর থেকে সত্যিই গ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব। এখন এই গ্যাসে আমাদের পরিবারের সব রান্না হয়। এমনকি গরুর খাবারের জন্য পানিও গরম করি। এই গ্যাসে রান্না করলে হাঁড়ি-পাতিলে কোনো কালি পড়ে না। সারাদিন রান্না শেষ হওয়ার পরও গ্যাস থেকে যায়। আগে গ্যাস নিয়ে যে দুশ্চিন্তা ছিল, এখন আর তা নেই।
প্রতিবেশী মো. ওমর ফারুক ঢাকা পোস্টকে বলেন, প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম গোবর থেকে গ্যাস উৎপাদন সম্ভব নয়। তাই জাহাঙ্গীর কাকাকে নিরুৎসাহিতও করেছিলাম। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। এখন নিজের চোখে দেখছি, সত্যিই গোবর থেকে গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। বিষয়টি আমাদের অনুপ্রাণিত করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সিরাজুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, শুনেছিলাম গোবর থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন করে রান্না করা হচ্ছে। প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। তাই নিজেই দেখতে এসেছি। এসে দেখি সত্যিই গ্যাসের চুলায় রান্না হচ্ছে। বর্তমানে এলপিজির দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে এটি খুবই কার্যকর উদ্যোগ। আমাদেরও গরুর খামার আছে। তাই আমরা এমন একটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা করছি।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর শরীয়তপুরের সহকারী পরিচালক মো. রাসেল নোমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, গরুর খামার থেকে উৎপন্ন গোবর ও বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে পারলে তা মূল্যবান সম্পদে পরিণত হতে পারে। এমন উদ্যোগ একদিকে পরিবেশ দূষণ কমবে, অন্যদিকে বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে। সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি।
নয়ন দাস/এসএইচএ
