নীলফামারীর সৈয়দপুরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন ও অন্যান্য খাতে সরকারি বরাদ্দ দেওয়ার নামে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মরিয়ম নেছার বিরুদ্ধে। বরাদ্দ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি ও গ্রহণ করেন তিনি।
জানা যায়, প্রায় ৪ বছর ধরে মরিয়ম নেছা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে সৈয়দপুর উপজেলায় কর্মরত রয়েছেন। বিভিন্ন বিদ্যালয়ে সরকারি বিভিন্ন বরাদ্দ দিতে শিক্ষকদের থেকে ঘুষ নেন তিনি। এছাড়াও কোনো শিক্ষক তাকে ঘুষ না দিলে বিভিন্নভাবে হয়রানি করেন। তার ঘুষ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কথা বললেও বিপাকে পড়তে হয় শিক্ষকদের।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বরাদ্দের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা কিংবা দ্রুত বরাদ্দ নিশ্চিত করার কথা বলে বিভিন্ন সময়ে অর্থ নেওয়া হয়েছে। কেউ অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের প্রতিষ্ঠানের বরাদ্দ আটকে রাখা বা বিভিন্ন অজুহাতে বাদ দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। এসবের প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন এক শিক্ষক।

লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে শিশু মঙ্গল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওয়াশব্লক বরাদ্দ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ নেন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মরিয়ম নেছা। ঘুষ দেওয়ার দীর্ঘদিন হলেও ওয়াশব্লক পায়নি ওই বিদ্যালয়। ২০২৫ সালের বিদ্যালয়ের মেরামত বরাদ্দের নিয়ম অনুযায়ী কাজের পরেও সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাকে ঘুষ না দেওয়ায় তিনি বরাদ্দের চেকে স্বাক্ষর করেননি। এছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই বিদ্যালয়ে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের বরাদ্দ প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন তিনি। বিদ্যালয়টির ল্যাটপব, ফ্যানসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম নিজ বাড়িতে রেখে ব্যবহার করছেন ওই সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা।
এবিষয়ে ভুক্তভোগী শিশু মঙ্গল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শাহানাজ আখতার ঢাকা পোস্টকে বলেন, সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আমার বিদ্যালয়ে বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলে আমার থেকে ঘুষ নিয়েছিল। পরে দীর্ঘদিন সময় পার হলেও আমাকে বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এছাড়াও বিদ্যালয়ের ভোট কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা নিজের অর্থায়নে লাগিয়েছিলাম সেই বরাদ্দ তিনিই উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন। তিনি বিদ্যালয়ের ল্যাপটপসহ বিভিন্ন জিনিস নিজের বাড়িতে রেখেছেন। এছাড়াও সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে ঘুষের টাকা ফেরত চাইলে তিনি বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেন। ঘুষের টাকা ফেরত চাওয়ার কারণে তিনি আমাকে নানা কারণ দেখিয়ে শোকজ করেছেন।
আরেক ভুক্তভোগী অসুনখাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিরিন আক্তার ঢাকা পোস্টকে বলেন, কিছুদিন আগে বিদ্যালয়ের কমিটি গঠন নিয়ে সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আমাকে শোকজ করেন। এসময়ে তিনি সাংবাদিক ম্যানেজ করার কথা বলে আমার থেকে পনেরো হাজার টাকা নিয়েছেন। পরে বিভিন্ন বরাদ্দের নামে নানা কারণে আমার থেকে টাকা চান তিনি। টাকা না দেওয়ায় কারণে আমাকে সামান্য বিষয়ে শোকজ করা শুরু করেন। এছাড়াও জাতীয় নির্বাচনের সংস্কার বাবদ তিনি তেইশ হাজার টাকা নানা অজুহাত দেখিয়ে নিজে আত্মসাৎ করেছেন। আমি নিরুপায় হয়ে গেছি, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক প্রধান শিক্ষক ঢাকা পোস্টকে বলেন, সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা টাকা-পয়সা ছাড়া কিছু বোঝেন না। সামান্য কাজের জন্য গেলেও তিনি টাকা নেন। আমরা প্রধান শিক্ষকরা একদম নিরুপায় হয়ে গেছি। ওনাকে টাকা না দিলে বরাদ্দের কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেন না এবং শিক্ষকদের শোকজসহ নানাভাবে হয়রানি করেন। বিদ্যালয়ের মেরামতের বরাদ্দে তাকে ঘুষ না দিলে চেক আটকিয়ে রাখেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মরিয়ম নেছা ঢাকা পোস্টকে বলেন, অভিযোগ যে কেউ যে কারো বিরুদ্ধে করতে পারে। একজন শিক্ষক অভিযোগ করেছে বিষয়টি আমি বিভিন্ন মাধ্যমে শুনেছি। কর্তৃপক্ষ বিষয়টি দেখবেন, আমার বিরুদ্ধে এসব মিথ্যে অভিযোগ করা হচ্ছে।
এবিষয়ে সৈয়দপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাসুদুল হাসানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি কল রিসিভ করেননি।
নীলফামারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. রবিউল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, অভিযোগ পেয়েছি, বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
শাহজাহান ইসলাম লেলিন/এসএইচএ
