বিজ্ঞাপন

জুলাই গণঅভ্যুত্থান

সোনারগাঁয় ৩ শহীদ পরিবারের অপেক্ষা বিচার ও রাষ্ট্রীয় সহমর্মিতার

সোনারগাঁয় ৩ শহীদ পরিবারের অপেক্ষা বিচার ও রাষ্ট্রীয় সহমর্মিতার

জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের তিন শহীদ পরিবারের জীবনে শোক, অনিশ্চয়তা ও বঞ্চনার অবসান হয়নি। স্বজন হারানোর ক্ষত আজও তাজা। পরিবারগুলোর অভিযোগ, ন্যায়বিচার ও পর্যাপ্ত রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা—দুটোরই অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।

ইমরানের মায়ের আর্তনাদ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে গুলিতে নিহত হন সোনারগাঁয়ের মেঘনা শিল্পনগরীর এইচএসসি পরীক্ষার্থী ইমরান হাসান। ২ ছেলের মধ্যে তিনি ছিলেন বড়।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইমরানের মা কোহিনূর আক্তার বলেন, ২ বছর পার হলেও ছেলের হত্যার বিচার পাননি। সরকারি সহায়তাও ছিল সীমিত।

তিনি বলেন, আগস্ট মাস এলেই মাঝে মাঝে ছাত্ররা এসে সান্ত্বনা দেয়। উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় কিছু মানুষ সামান্য সহযোগিতা করেন। কিন্তু আগস্ট শেষ হলেই সবাই যেন ভুলে যায়। ছেলেকে হারিয়ে আমরা খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছি।

প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন অপূর্ণ
জুলাই আন্দোলনে নিহত আরেক তরুণ মেহেদী হাসানের বাড়ি উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের ঝাউচর গ্রামে। তার বাবা মো. ছানাউল্লাহ একটি কারখানায় চাকরি করেন। মা শিল্পী বেগম গৃহিণী।

ছানাউল্লাহ বলেন, ছেলেকে প্রকৌশলী বানানোর স্বপ্ন ছিল তাদের। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।

তিনি বলেন, মেহেদীর পড়ার টেবিল, চেয়ার ও বইগুলো এখনো আগের জায়গায় রয়েছে। সেগুলো দেখলেই তার মা কান্না করে বলে, আমার ইঞ্জিনিয়ার ছেলে কোথায়? তাকে ফিরিয়ে দাও। 

তার অভিযোগ, ছেলেকে হারানোর পর তেমন কোনো সহযোগিতা পাননি। তিনি আরও বলেন, আমরা কিছু পাই বা না পাই, অন্তত ছেলের হত্যার সঠিক বিচার চাই। ২ বছর ধরে সেই আশাতেই আছি।

মুন্নার কবর মিলেছিল এক বছর পর
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকার লং মার্চে অংশ নিতে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেননি সোনারগাঁয়ের কাঁচপুর ইউনিয়নের সোনাপুর এলাকার সাব্বির হোসেন মুন্না (২৪)।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ৫ বছর ধরে ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন তারা। মুন্নাকে হারানোর পর পুরো পরিবার দিশেহারা হয়ে পড়ে।

মুন্নার মা মুক্তা বেগম বলেন, আন্দোলনের সময় কর্মস্থলে যাওয়ার পাশাপাশি দেশপ্রেমের তাগিদে বন্ধুদের সঙ্গে কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন তার ছেলে। ৫ আগস্ট সকালে ছোট বোনকে জানিয়ে কাঁচপুর থেকে লং মার্চে যোগ দেন তিনি। এরপর আর ফিরে আসেননি।

পরিবারের দাবি, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ঢাকার জুরাইন কবরস্থানে মুন্নার কবর শনাক্ত হয়।

মুক্তা বেগম বলেন, ছেলের মরদেহও দেখতে পারিনি। শুধু কবর দেখতে পেরেছি। ২ বছরেও সরকারি কোনো সহযোগিতা পাইনি। কোরবানির ঈদে একটি ছাগল পেয়েছি, আর স্থানীয়ভাবে কিছু সহায়তা মিলেছে। কিন্তু আমি শুধু আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।

সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসিফ আল জিনাত বলেন, সোনারগাঁয়ের নিহতদের জন্য সরকারিভাবে আলাদা কোনো বরাদ্দ বা অনুদান আসেনি। তবে এককালীন ১ লাখ টাকা অনুদান, কিছু ভাতা এবং বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কিছু সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

২ বছর পরও তিনটি পরিবারের শোক কাটেনি। তাদের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক বক্তব্য নয়— প্রিয়জন হত্যার সুষ্ঠু বিচার, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং আন্তরিক সহমর্মিতাই এখন তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। 

মো. মীমরাজ হোসেন/এমএমবি