বিজ্ঞাপন

জুলাই গণঅভ্যুত্থান

ফেনীতে ৭ শহীদের রক্তের পর বিজয়, দুই বছর ধরে বিচারের অপেক্ষা

ফেনীতে ৭ শহীদের রক্তের পর বিজয়, দুই বছর ধরে বিচারের অপেক্ষা

দুই বছর আগে টানা দুই দিনে ফেনী দেখেছিল ইতিহাসের দুই ভিন্ন অধ্যায়। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক দফা কর্মসূচিকে ঘিরে মহিপালে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের গুলিতে প্রাণ হারান ৭ জন, আহত হন প্রায় দেড় শতাধিক মানুষ। রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মহিপাল। 

পরদিন ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকাহত জনপদ পরিণত হয় বিজয়োল্লাসে। স্লোগান, আনন্দমিছিল আর মানুষের ঢলে মুখর হয়ে ওঠে ফেনী। তবে ২ বছর পরও শহীদ পরিবারগুলোর প্রশ্ন একটাই— হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ হবে কবে?

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সকাল থেকেই ফেনীর মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে জড়ো হতে থাকেন ছাত্র-জনতা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক দফা কর্মসূচির সমর্থনে শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী, ব্যবসায়ী, অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে নামেন। দুপুর পর্যন্ত কর্মসূচি ছিল শান্তিপূর্ণ। আন্দোলনকারীরা মহাসড়ক অবরোধ করে জোহরের নামাজ আদায় করেন। কিন্তু দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা মহিপালের দিকে অগ্রসর হলে ককটেল বিস্ফোরণ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে ওঠে মহিপাল।

ঘটনাস্থলেই নিহত হন ইশতিয়াক আহম্মেদ শ্রাবণ, সরওয়ার জাহান মাসুদ, ওয়াকিল আহম্মেদ শিহাব, সাইদুল ইসলাম শাহী, জাকির হোসেন শাকিব ও মোহাম্মদ সবুজ। গুরুতর আহত কলেজশিক্ষার্থী মাহবুবুল হক মাসুমকে প্রথমে ফেনী জেনারেল হাসপাতাল এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে ৭ আগস্ট তিনি মারা যান। 

এ ঘটনায় শিক্ষার্থী, পথচারী ও গণমাধ্যমকর্মীসহ প্রায় দেড় শতাধিক মানুষ আহত হন। অনেকেই নিরাপত্তাহীনতার কারণে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা নিতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালে একের পর এক মরদেহ পৌঁছালে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। প্রাণচঞ্চল ফেনী শহর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিণত হয় আতঙ্কের জনপদে।

মহিপালের ঘটনার বাইরে আন্দোলনে অংশ নিয়ে জেলার আরও ৪ জন প্রাণ হারান। দাগনভূঞার সাইফুল ইসলাম আরিফ চট্টগ্রামে গুলিবিদ্ধ হয়ে ৫৭ দিন পর মারা যান। রাজধানীতে আন্দোলনে অংশ নিয়ে শহীদ হন সোনাগাজীর আব্দুল গণি বোরহান, দাগনভূঞার আবু বক্কর শিবলু এবং পরশুরামের ইকরাম হোসেন কাউছার। সব মিলিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ফেনীর হারায় জনপদের ১১ সম্ভাবনাময় সন্তানকে।

রক্তাক্ত সেই ঘটনার পরদিন, ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পাল্টে যায় পুরো জেলার চিত্র। শহরের ট্রাংক রোড, কলেজ রোড, শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় নেমে আসে মানুষের ঢল। নারী-পুরুষ, তরুণ, কিশোর, বৃদ্ধ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ আনন্দমিছিলে অংশ নেন। জাতীয় পতাকা হাতে বিজয় মিছিলে অংশ নেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। একদিন আগেও যে শহর রক্তে ভিজেছিল, পরদিন সেই শহরেই ধ্বনিত হয় বিজয়ের স্লোগান। অনেকেই শহীদদের স্মরণ করে অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, এই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই নতুন বাংলাদেশের পথ রচিত হয়েছে।

এদিকে ২ বছর পেরিয়ে গেলেও হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ হয়নি। শহীদ পরিবার, আহত ব্যক্তি ও আন্দোলনের সংগঠকদের অভিযোগ, রাষ্ট্রের বিভিন্ন সহায়তা মিললেও তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার। যা এখনো পূরণ হয়নি। তাদের দাবি, মামলার অনেক গুরুত্বপূর্ণ আসামি এখনো গ্রেপ্তারের বাইরে রয়েছেন। বিচার সম্পন্ন হলেই শহীদদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে।

শহীদ ইশতিয়াক আহম্মেদ শ্রাবণের বাবা নেছার আহম্মেদ বলেন, অনেক আসামি এখনো গ্রেপ্তারের বাইরে। বিচার শেষ হলেই সন্তানদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে। আমাদের এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার নেই।

শহীদ সরওয়ার জাহান মাসুদের মা বিবি কুলসুম বলেন, সরকার সহযোগিতা করেছে। তবে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।

শহীদ ওয়াকিল আহম্মেদ শিহাবের মা মাহফুজা আক্তার বলেন, ভিডিওতে অনেক কিছু স্পষ্ট থাকার পরও বিচার শেষ হয়নি। একজন মায়ের কাছে এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে?

শহীদ মাহবুবুল হক মাসুমের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান বলেন, যে স্বপ্ন নিয়ে ভাইয়েরা জীবন দিয়েছে, সেই স্বপ্নের পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো হয়নি। এখনো সেই স্বপ্নের দেশ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফেনীর সাবেক সমন্বয়ক মুহাইমিন তাজিম বলেন, মহিপালের মতো প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের বিচার দুই বছরেও দৃশ্যমানভাবে শেষ হয়নি। শহীদ পরিবারকে এখনো বিচারের দাবি জানাতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।

সংগঠক আবদুল্লাহ আল জুবায়ের ঢাকা পোস্টকে বলেন, অনেক আহত ব্যক্তি এখনো শারীরিক ও মানসিক জটিলতা নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের প্রকাশ্যে ঘোরাফেরার অভিযোগও রয়েছে। দুই বছর পরও এমন পরিস্থিতি হতাশাজনক।

ফেনী জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৪ আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফেনী মডেল থানায় হত্যা ও হত্যাচেষ্টার ২২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৭টি হত্যা এবং ১৫টি হত্যাচেষ্টার মামলা। ইতোমধ্যে ৬টি হত্যা ও ৮টি হত্যাচেষ্টা মামলাসহ মোট ১৪টি মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দিয়েছে পুলিশ। মোহাম্মদ সবুজ হত্যা মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। মাহবুবুল হক মাসুম হত্যা মামলার বিচারও চলমান। শিহাব ও মাসুম হত্যা মামলার অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের বিচার শিশু আদালতে চলছে। 

পুলিশ সূত্র জানায়, এসব মামলায় মোট ২ হাজার ৫০৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১৯২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখনো প্রায় ১ হাজার ৩০০ আসামি পলাতক। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র এবং থানা থেকে লুট হওয়া সব অস্ত্রও এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। 

ফেনী আদালতের পরিদর্শক (ভারপ্রাপ্ত) কাজী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চার্জশিটভুক্ত মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। সবুজ হত্যা মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে এবং মাসুম হত্যা মামলার বিচারও প্রক্রিয়াধীন।

জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মেজবাহ উদ্দীন খান বলেন, চার্জশিটভুক্ত মামলাগুলোর বিচার দ্রুত শেষ করে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য।

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী মেজবাহ উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, পলাতক অস্ত্রধারী আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। এছাড়া যেসব মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে সেগুলোর পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে।

ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ২২ মামলার মধ্যে ১৪টির অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। বাকি মামলাগুলোর তদন্ত, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার এবং অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেন, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কেউ কারাগারে, কেউ জামিনে রয়েছেন। কিছু আসামি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন বলেও তথ্য রয়েছে। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলছে।

তারেক চৌধুরী/এমএমবি