বিজ্ঞাপন

বিজয় উল্লাসের মধ্যেই যশোরে মৃত্যু হয় ২৪ জনের, দুই বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত

বিজয় উল্লাসের মধ্যেই যশোরে মৃত্যু হয় ২৪ জনের, দুই বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত

ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি আজ (৫ আগস্ট)। ২০২৪ সালের এই দিনে গণভবন ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই খবর ছড়িয়ে পড়তেই সারা দেশের মতো যশোরেও নেমে আসে বিজয়ের উচ্ছ্বাস। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে শহরের চিত্রা মোড়ে অবস্থিত হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনালে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় প্রাণ হারান ২৪ জন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর যশোর শহরে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে বিজয় মিছিল ও আনন্দ-উল্লাসে অংশ নেন। ঠিক সেই সময় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি শাহীন চাকলাদারের মালিকানাধীন হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনালে একদল দুষ্কৃতকারী ভাঙচুর চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে। ভয়াবহ সেই অগ্নিকাণ্ডে ভবনের ভেতরে আটকা পড়ে ২৪ জনের মৃত্যু হয়।

নিহতরা হলেন- চাঁচড়া রায়পাড়ার আব্দুল আজিজ চাঁন (১৬), শাখারিগাতীর সিফাত হোসেন (২২), কিসমত নওয়াপাড়ার সোহানুর রহমান শিহাব (২৬), বারান্দি মোল্লাপাড়ার হাফিজ উদ্দিন (৩০), বালিয়া ভেকুটিয়ার রোকনুজ্জামান রাকিব (২২), উপশহরের সৈয়দ মিথুন মোর্শেদ (২৭), পুরাতন কসবার ফয়সাল হোসেন (২৫), মুজিব সড়কের শাওয়ানাত মেহতাব প্রিয় (১৮), কৃষ্ণবাটির মেহেদী হাসান (১৩), সামিউর রহমান সাদ (১৭), রুহান ইসলাম (১৭), তারেক রহমান (২৮), আলামিন বিশ্বাস (২০), আবরার মাসমুন নীল (১০), ইউসুফ আলী (১৫), মেহেদী হাসান আলিফ (১৫), সাকিবুল হাসান মাহি (১৫), আব্দুল্লাহ ইবনে শহীদ (২৬), রাসেল রানা (২১), সাকি (১৮), রিয়াদ শেখ (১৮), খালিদ হাসান শান্ত (১৬) এবং ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক উতম ডিজোকোসহ ২৪ জন।

হোটেল জাবিরে আটকে পড়াদের উদ্ধারে গিয়েছিলেন চাঁচড়া রায়পাড়া এলাকার কাবিল শেখের দুই ছেলে হৃদয় শেখ ও রিয়াদ শেখ। কিন্তু হৃদয় শেখ আহত অবস্থায় বের হতে পারলেও নিহত হন ছোট ভাই রিয়াদ শেখ (১৮)।

হৃদয় শেখ জানান, জাবির ইন্টারন্যাশনালে গিয়ে জানতে পারেন হোটেলে আটকে পড়াদের উদ্ধার করার জন্য ম্যাগপাই হোটেলের পাশ দিয়ে জাবিরের মধ্যে গেছে রিয়াদসহ বেশ কয়েকজন। তারা ৩-৪ জনকে উদ্ধারও করেন। কিন্তু আকস্মিক গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে রিয়াদ, সাকিবসহ অনেকে আটকা পড়ে আগুনে পুড়ে মারা যান।

জাবির হোটেলের অগ্নিকাণ্ডে নিহত আরেকজন খালিদ হাসান শান্ত। তার মা খাদিজা বেগম জানান, শান্ত তার একমাত্র ছেলে। ১৬ বছর বয়সে মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায় সে। 

তিনি আরও জানান, শান্ত কোথাও আড্ডা দিতো না। তেমন কোনো বন্ধুও ছিলো না। মাদরাসা আর বাড়িই ছিলো তার আসা-যাওয়ার জায়গা। জুলাই মাসে আন্দোলনের সময় সে প্রায়ই মিছিলে যেতো।

খাদিজা বেগম বলেন, বিকেলে টিভিতে দেখতে পাই শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে। পরে হোটেল জাবিরে আগুনে পুড়ে মানুষ মারা যাওয়ার কথা শুনতে পেয়ে রিকশা নিয়ে শান্তর বাবা ও আমি বের হই, কিন্তু ছেলের খোঁজ পাইনি। 

তিনি জানান, তাদের ভাগনে সোহাগ মালয়েশিয়া থেকে প্রথম জানতে পারেন শান্তর মৃত্যুর কথা। কারণ শান্তর পকেটে মুঠোফোন ছিল। সে সময় মালয়েশিয়া থেকে শান্তর মুঠোফোনে ফোন করেছিলেন সোহাগ। হাসপাতালের এক কর্মী ফোন ধরে শান্তর মরদেহ মর্গে আছে বলে জানান। 

তিনি বলেন, পরে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে রাত ১০টার দিকে মর্গে ছেলের লাশ দেখতে পাই।

আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিহতদের বেশির ভাগই আন্দোলনকারী। ভাঙচুর আর অগ্নিসংযোগের সময় অনেকেই কৌতূহলবশত অগ্নিসংযোগকারীদের সঙ্গে হোটেলে প্রবেশ করেন। প্রায় দুই শতাধিক আন্দোলনকারী হোটেলটির বেজমেন্টে ঢুকেই সিঁড়ি বেয়ে ১৪ তলা পর্যন্ত উঠে যান। একপর্যায়ে নিচে থাকা বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীদের মধ্যে কয়েকজন পেট্রল দিয়ে আগুন দিতে শুরু করেন। পর্যায়ক্রমে তারা কয়েকটি তলায় আগুন ধরিয়ে দেন। এতে দাউ দাউ করে পুরো ১৪ তলাই কয়েক মিনিটের মধ্যে জ্বলতে থাকে। এতে ওপরে থাকা বেশির ভাগ আন্দোলনকারী বের হতে পারেননি। ফলে আগুনের ধোঁয়ায় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আটকে থেকে তারা মারা যান।

আন্দোলনে অংশ নেওয়া মারুফ হোসেন বলেন, আমাদের আন্দোলনে কিছু উগ্র ছেলে ছিল। বিজয় মিছিলে সাধারণ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে তারাও জাবির হোটেলে ঢুকে পড়ে। আমরা মূলত হোটেলটি দেখতে সেখানে গিয়েছিলাম। তবে ওই ছেলেরা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বিভিন্ন তলায় চলে যায়। কেউ কেউ আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে আমার কয়েকজন বন্ধু আটকা পড়ে আগুনে পুড়ে মারা গেছে।

এ ঘটনার ১৫ দিন পর ১৯ আগস্ট হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনালে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে ২৪ জনকে হত্যার অভিযোগে অজ্ঞাত ২০০ জনকে আসামি করে মামলা করেন শাহীন চাকলাদারের চাচাতো ভাই যশোর সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান তৌহিদ চাকলাদার।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, ৫ আগস্ট বিকেল ৩টার দিকে গানপাউডার ও পেট্রল নিয়ে হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনালের মধ্যে প্রবেশ করে ২০০ জন দুর্বৃত্ত। প্রথমে লুটপাট শুরু করে। দুর্বৃত্তরা হোটেলের ক্যাশ ভোল্ট ভেঙে ৯০ লাখ টাকা লুট করে। ১০০টি ফ্রিজ, ১০০টি স্মার্ট টেলিভিশন, ৪৫০ কিলোভোল্টের দুটি জেনারেটর এবং হোটেলের স্টোরে রাখা বিভিন্ন ধরনের মালামাল ও আসবাবসহ মূল্যবান সম্পদ লুট করে। এরপর গানপাউডার ও পেট্রল দিয়ে হোটেলের ১ তলা থেকে ১৬ তলা পর্যন্ত আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে ওই হোটেলে থাকা ইন্দোনেশিয়ার এক নাগরিকসহ ২৪ জন পুড়ে মারা যান।

এদিকে ঘটনার দুই বছরেও মামলার কূলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ। আবার এ বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দিতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সর্বশেষ এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী বাবুল হোসেন। 

তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। তবে জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার সময়কার বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে হোটেলের ভেতরের ঘটনা হওয়ায় এখনো প্রকৃত আসামিদের শনাক্ত করা যায়নি। তবে আমাদের অনুসন্ধান চলছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর পাওয়ার পর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে যশোর শহরে মিছিল বের করে ছাত্র-জনতা। ওই মিছিল থেকে বিক্ষুব্ধ লোকজন চিত্রা মোড়ে অবস্থিত হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনালে ভাঙচুর শুরু করে। দ্বিতীয় দফায় বিকেল ৪টার দিকে লোকজন সেখানে আগুন ধরিয়ে দেয়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও পরদিন মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে পুরোপুরি আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ওই ঘটনায় ২৪ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার এক নাগরিকও ছিলেন। এ ঘটনায় আহত হন আরও ২৩ জন।

অন্যদিকে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর নিশ্চিত হওয়ার পর শহরের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা তৈরি হলে কেন্দ্রীয় বিএনপির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বর্তমান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠে নামেন। প্রশাসনিক শূন্যতার মধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকায় বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয় ও সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তায় নেতাকর্মীদের নিয়ে কাজ করেন তিনি। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয় বলে দাবি দলীয় নেতাদের।

আরএআর