বিজ্ঞাপন

গ্যাস সংকটে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিসিক কারখানাগুলোতে উৎপাদন ধস

গ্যাস সংকটে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিসিক কারখানাগুলোতে উৎপাদন ধস

গ্যাসের তীব্র চাপজনিত সমস্যায় ভয়াবহ স্থবিরতা নেমে এসেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিসিক শিল্পনগরীতে। প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাহিদা মেটাতে না পারায় গ্যাসভিত্তিক কারখানাগুলোতে উৎপাদন কমে গেছে প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে একদিকে যেমন কারখানা মালিকদের লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে, অন্যদিকে আয় কমে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় পড়েছেন দৈনিক মজুরিভিত্তিক হাজারো শ্রমিক ও কর্মচারী। 

এদিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও অন্তত দুই থেকে তিন মাস সময় লাগবে বলে জানিয়েছে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিসিক শিল্পনগরীতে বর্তমানে বিভিন্ন পণ্য প্রস্তুতকারী ৬৮টি কারখানা চালু রয়েছে। এর মধ্যে চাল, অটো ফ্ল্যাট মিলস, রি-রোলিং মিলস, কেমিক্যাল, খাদ্য ও প্রসেসিং শিল্পসহ ২৪টি কারখানা সম্পূর্ণ গ্যাসভিত্তিক। নিয়ম অনুযায়ী কারখানাগুলোতে পুরোদমে উৎপাদন চালু রাখতে অন্তত ১৫ পিএসআই (PSI) চাপের গ্যাসের প্রয়োজন হয়। কিন্তু গত এক মাস ধরে কারখানাগুলো প্রয়োজনীয় গ্যাসের চারভাগের একভাগও পাচ্ছে না। বর্তমানে মাত্র ৩ থেকে ৫ পিএসআই চাপে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যা দিয়ে ভারী যন্ত্রপাতি ও কারখানা চালু রাখা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

​গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে কারখানার দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর। একাধিক কারখানার শ্রমিকরা জানান, উৎপাদন কমে যাওয়ায় কারখানায় কাজের ওভারটাইম বা নিয়মিত শিফট বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে তাঁদের দৈনিক আয় অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে।

​বিসিকের একটি গুনা তৈরির কাজ করা শ্রমিক জুয়েল বলেন, আমরা দিন আনি দিন খাই। কাজ থাকলে টাকা পাই, কাজ না থাকলে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়। গ্যাসের প্রেসার না থাকায় দিনভর মেশিন বন্ধ থাকে। কারখানা মালিক কাজ দিতে পারছেন না, ফলে দিনে যে টাকা পাই তা দিয়ে পরিবার চালানো ও চাল-ডাল কেনাই এখন দায় হয়ে পড়েছে।

​অন্য একটি কারখানার মেকানিক ও নিয়মিত কর্মচারী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, উৎপাদন বন্ধ থাকলেও আমাদের কারখানা ছেড়ে যাওয়ার উপায় নেই। আবার মালিকও লোকসান গুনে কতদিন আমাদের বেতন টেনে যাবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। এভাবে চলতে থাকলে কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে আর আমরা বেকার হয়ে পড়ব।

কারখানা মালিকরা জানিয়েছেন, প্রতি মাসে কারখানা পরিচালনা, বিদ্যুৎ বিল, ব্যাংক ঋণ এবং শ্রমিকদের বেতন বাবদ মোটা অঙ্কের টাকা গুণতে হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসায় ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা দূরের কথা, দৈনন্দিন পরিচালনা ব্যয় মেঠাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।

শিল্পনগরীর এক ভুক্তভোগী আরমান ক্যামিকেল কারখানা মালিক পক্ষ থেকে  মো. রাকিবুল ইসলাম বলেন, গ্যাসের চাপ থাকার কথা ১৫ পিএসআই, সেখানে আমরা পাচ্ছি মাত্র ৩ থেকে ৫। এই সামান্য গ্যাসে বিশাল মেশিন চালানো সম্ভব নয়। এতে কাঁচামাল নষ্ট হচ্ছে এবং মেশিনের যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসায় প্রতি মাসেই আমাদের লাখ লাখ টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে। দ্রুত সমাধান না হলে কারখানা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না।

সামগ্রিক সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিসিক শিল্পনগরীর সহ-মহাব্যবস্থাপক মো. রোকন উদ্দিন ভূইয়া জানান, গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পনগরীর কারখানাগুলোর উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে—এ বিষয়ে আমরা পুরোপুরি অবগত। কারখানাগুলোর উৎপাদন সচল রাখতে বিসিকের পক্ষ থেকে বাখরাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষের সাথে সার্বিক যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। আমরা তাদের অনুরোধ করেছি যেন বিসিকের জন্য দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

এদিকে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. শফিকুল হক ফোনে জানান, জেলাজুড়ে গ্যাসের সার্বিক চাপ কম থাকায় এই সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও প্রায় দুই থেকে তিন মাস সময় লাগবে।

​তিনি আরও জানান, বিসিক শিল্পনগরী এবং স্থানীয় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত চাপযুক্ত গ্যাস সরবরাহের জন্য পৃথক একটি ডেডিকেটেড পাইপলাইন স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই আলাদা পাইপলাইনের কাজ সম্পন্ন হলে বিসিকের শিল্পকারখানাগুলো স্থায়ীভাবে গ্যাস সংকট থেকে মুক্তি পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন এই কর্মকর্তা।

আরকে

বিজ্ঞাপন