ফরিদপুরে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন সরকারি শিশু পরিবারে (বালিকা) এক ১৪ বছর বয়সী কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনায় গঠিত চার সদস্যের তদন্ত কমিটি ঘটনার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে। তদন্তে শিশু পরিবারের কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে চরম অবহেলা ও উদাসীনতা, ভুক্তভোগী কিশোরীর অসহায় মানসিক ও পারিবারিক বাস্তবতা এবং অভিযুক্ত দর্জি ব্যবসায়ীর বিকৃত মানসিকতাকে এ ঘটনার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ২৯ জুলাই তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জেলা প্রশাসক মো. মাজহারুল ইসলামের কাছে জমা দেয়। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) এ বিষয়ে জানা গেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির তত্ত্বাবধায়কসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে যে ধরনের দায়িত্বশীলতা ও সংবেদনশীলতা প্রত্যাশিত ছিল, তার কোনো কার্যকর প্রতিফলন পাওয়া যায়নি। বরং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে উদাসীনতা এবং শুধু চাকরি করার মানসিকতাই পরিলক্ষিত হয়েছে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, নিবাসী কিশোরীদের একটি অংশের মানসিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত অস্থির বা ‘ডেসপারেট’ ধরনের। অথচ তাদের চলাফেরা ও আচরণের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। অনেক নিবাসী একা বা দলবদ্ধভাবে প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে গভীর রাতে ফিরে এলেও তা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে অনুপস্থিতির বিষয়ে বারবার জানানো হলেও তত্ত্বাবধায়কের পক্ষ থেকে ফলপ্রসূ কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, একজন নিবাসী কিশোরী ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি কর্তৃপক্ষ এত দীর্ঘ সময়েও জানতে না পারা তাদের সীমাহীন গাফিলতিরই প্রমাণ।
তদন্ত কমিটি দ্বিতীয় কারণ হিসেবে ভুক্তভোগী কিশোরীর পারিবারিক ও মানসিক অবস্থার কথা উল্লেখ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিশোরীটি অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত অসচ্ছল পরিবারের সন্তান। মায়ের মৃত্যুর পর সৎ মায়ের সংসারে বেড়ে ওঠার কারণে তার মধ্যে ভিন্নধর্মী মানসিকতা তৈরি হয়। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও ভালোবাসার অভাব তাকে কারও সহানুভূতির প্রতি অত্যন্ত নির্ভরশীল করে তোলে। ফলে কোথাও সামান্য সহানুভূতির আশ্বাস পেলেই সঠিক-ভুল বিচার না করে সেটিকেই আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করার প্রবণতা তৈরি হয়, যা অজান্তেই তাকে ভ্রান্ত পথে নিয়ে যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তৃতীয় কারণ হিসেবে অভিযুক্ত দর্জি ব্যবসায়ীর বিকৃত রুচি ও ধর্ষকামী মানসিকতাকে দায়ী করেছে তদন্ত কমিটি।
ঘটনার তদন্তে নেতৃত্ব দেওয়া কমিটির আহ্বায়ক অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) সুস্মিতা সাহা বলেন, তদন্তের সময় কমিটির কাছে মনে হয়েছে, শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব একজন নারীর ওপর ন্যস্ত থাকলে তা অধিক কার্যকর হবে। পাশাপাশি নিবাসীদের মাসে অন্তত একবার নিয়মিত শারীরিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে শিশু পরিবারের (বালিকা) দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবহেলার প্রমাণ পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে সার্বক্ষণিক একজন নারী কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটিতে আগত দর্শনার্থী ও অন্যান্য ব্যক্তিদের প্রবেশ-নিয়ন্ত্রণে একটি তদারকি কমিটি গঠনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার সুপারিশও করা হয়েছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন আমি আগেই পেয়েছি এবং ওই প্রতিবেদনের সঙ্গে আমার সুপারিশ সংযুক্ত করে ঢাকায় ইতোমধ্যে পাঠিয়ে দিয়েছি। এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়কসহ ছয় কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শেষে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে প্রতিবেদন সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়েছে।
প্রসঙ্গত, শহরের টেপাখোলা মহল্লায় অবস্থিত সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা)-এর এক নিবাসী ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা—এ তথ্য গত ৫ জুলাই প্রকাশ্যে আসে। পরদিন ৬ জুলাই শিশু পরিবার (বালিকা)-এর তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আরিফ হোসেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন। এরপর ৭ জুলাই জেলা প্রশাসক মো. মাজহারুল ইসলাম চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুস্মিতা সাহা। সদস্যসচিব ছিলেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার জান্নাতুল সুলতানা। অপর দুই সদস্য ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. আজমীর হোসেন এবং সিভিল সার্জনের প্রতিনিধি মেডিকেল কর্মকর্তা (ডিআরএস) নূপুর পাল। ১৩ জুলাই থেকে কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে।
এ ঘটনায় সমাজসেবা অধিদপ্তর সাময়িকভাবে যে ছয় কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বরখাস্ত করেছে তারা হলেন—সহকারী পরিচালক ও শিশু নিবাসের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আরিফ হোসেন, তত্ত্বাবধায়ক মো. হাবিবুর রহমান, কম্পিউটার অপারেটর আবীর দাস, মেট্রন-কাম-নার্স মনি আক্তার এবং আয়া শামসুন্নাহার আক্তার ও তানিয়া তাজরীন।
জহির হোসেন/আরকে
