দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার পর আগামী ১০ আগস্ট মধ্যরাত থেকে আবারও কাপ্তাই হ্রদে শুরু হচ্ছে মৎস্য আহরণ। মাছ শিকার ও বিপণন ঘিরে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলে, মাছ ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট শ্রমিকরা।
কাপ্তাই হ্রদের বিভিন্ন জেলেপাড়া থেকে মাছ অবতরণ ঘাট, সবখানেই এখন ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য। কেউ ব্যস্ত নতুন জাল তৈরিতে, কেউ পুরোনো ছেঁড়া জাল সেলাইয়ে। পাশাপাশি নৌকা ও ইঞ্জিনচালিত বোট মেরামতের কাজও চলছে। মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য ড্রাম, বরফসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও প্রস্তুত করছেন ব্যবসায়ীরা।
প্রায় ৭২৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের কাপ্তাই হ্রদটি মৎস্যসম্পদের বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি জলভান্ডার হিসেবে পরিচিত। মাছের প্রজনন ও পোনা সংরক্ষণের লক্ষ্যে প্রতি বছর কাপ্তাই হ্রদে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মাছ আহরণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। প্রথম দফায় ৩১ জুলাই পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কাচকি ও কার্পজাতীয় মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ২৭ জুলাই জেলা প্রশাসনের জরুরি সভায় তা আরও ১০ দিন বাড়ানো হয়।

দীর্ঘ এই নিষেধাজ্ঞার সময়ে মাছ আহরণ বন্ধ থাকায় জেলে ও মৎস্য খাতের সঙ্গে জড়িত অনেক শ্রমিকের আয়-রোজগার বন্ধ ছিল। তাই নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকা জেলেদের পাশাপাশি মাছ ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের মধ্যেও ফিরেছে ব্যস্ততা।
সংশ্লিষ্টদের আশা, এবার নতুন মৌসুমে বিপুল পরিমাণ মাছ পাওয়া যাবে।
জেলে ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বর্তমানে কাপ্তাই হ্রদে পানির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকায় মাছের প্রজনন ও পোনা বৃদ্ধির পরিবেশ অনুকূলে ছিল। ফলে মৌসুমের শুরুতেই মাছের উৎপাদন বাড়ার প্রত্যাশা করছেন তারা।

মৎস্য ব্যবসায়ী জাফর ইকবাল বলেন, প্রতিবছরের ন্যায় এবারও কাপ্তাই হ্রদে মৎস্য আহরণে নিষেধাজ্ঞা ছিল। আগামী ১০ তারিখ দিবাগত রাতে নিষেধাজ্ঞা শেষ হবে। এ কারণে ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতিও ভালো। সবাই যার যার মতো প্রস্তুতি নিয়েছেন। পাশাপাশি কার্পজাতীয় মাছগুলোও বড় হওয়ার জন্য যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছে। তাই এবার সব ব্যবসায়ীই আশা করছেন খুব ভালো ব্যবসা-বাণিজ্য হবে।
আরেক মৎস্য ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইছহাক বলেন, মাছের আকার বড় হলে জেলেরাও ভালো দাম পাবেন, ব্যবসায়ীরাও লাভবান হবেন। আর মাছের আকার ছোট হলে জেলে ও ব্যবসায়ী উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এছাড়া আমাদের এখানে যেসব কর্মচারী রয়েছেন, নিষেধাজ্ঞার তিন মাস তারা খুব কষ্টে ছিলেন। ব্যবসায়ীদেরও তো আয় বন্ধ ছিল। তারা নিজেরা চলবেন, নাকি কর্মচারীদের চালাবেন? জেলেদের মতো কার্ডধারী এসব কর্মচারীর প্রতিও সরকার একটু নজর দিলে ভালো হয়।

কাপ্তাই হ্রদের জেলে শিমুল বিশ্বাস বলেন, এ বছর হ্রদে অনেক পানি হয়েছে। তাই ভালো মাছ পাওয়া যাবে বলে আশা করছি। আমরা পুরোনো জাল সেলাই করেছি এবং নতুন জালও তৈরি করেছি। মাছ আহরণের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নিয়েছি। আশা করছি চাপিলা, রুই, কাতলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ জালে ধরা পড়বে।
এদিকে কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণকে ঘিরে রাঙামাটি মৎস্য অবতরণ ঘাটসহ বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) উপকেন্দ্রগুলোতেও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের রাঙামাটি ব্যবস্থাপক কমান্ডার মো. ফয়েজ আল করিম জানান, ১১ আগস্ট সকাল থেকে ল্যান্ডিং কার্যক্রম শুরু হবে। ল্যান্ডিং কার্যক্রম শুরু করার জন্য আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি চলমান রয়েছে। সব উপকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রস্তুত রাখা হচ্ছে, যাতে নির্ধারিত সময়ে অবতরণ কার্যক্রম শুরু করা যায়।
২০২৫ সালের ২ আগস্ট কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণ শুরুর পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) আওতাধীন বিভিন্ন অবতরণকেন্দ্র থেকে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন মাছ আহরণ করা হয়েছে। এসব মাছ বিক্রি করে সরকার ১৯ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব পেয়েছে।
মোস্তফা কামাল রাজু/এমএসএ
