ছয়টি শিক্ষক পদের বিপরীতে শিক্ষক আছেন মাত্র দুইজন। তাদের একজনকে আবার সামলাতে হচ্ছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব। ফলে প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের পাঠদানও চালাতে হচ্ছে একই ব্যক্তিকে। কোথাও তিনজন শিক্ষককে প্রতিদিন নিতে হচ্ছে প্রায় ১০টি করে ক্লাস। আবার কোথাও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক উপজেলা সদরে সভায় গেলে বিদ্যালয়ের পাঠদানই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
ময়মনসিংহের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর এমন চিত্র বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। জেলার ২ হাজার ১৪০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১ হাজার ২৪২টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ জেলার প্রায় ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মাত্র ৮৯৮টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন, যা মোট বিদ্যালয়ের প্রায় ৪১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলোতে সহকারী শিক্ষকের ৮৫৩টি পদও শূন্য রয়েছে।
ফলে অনেক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি নিয়মিত পাঠদান করতে হচ্ছে। কোথাও আবার শিক্ষকসংখ্যা এতটাই কম যে একাধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে পাঠদান করতে হচ্ছে।
দুই শিক্ষকেই চলছে স্কুল
ময়মনসিংহ সদর উপজেলার পয়েস্তির চর তারাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুমোদিত শিক্ষকের পদ ছয়টি। কিন্তু কর্মরত আছেন মাত্র দুইজন। বিদ্যালয়টিতে ২০১৮ সালে শিক্ষার্থী ছিল ২২৩ জন। চলতি বছর সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ১১২ জনে। কাগজপত্রে ১১২ জন শিক্ষার্থী থাকলেও বিদ্যালয়ে উপস্থিতিও খুবই কম পাওয়া যায়।
শিক্ষক সংকটের কারণে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে পাঠ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে সহকারী শিক্ষক মাহবুবা আক্তার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বলেন, শিক্ষক সংকট তাদের প্রধান সমস্যা। দুইজন শিক্ষক দিয়ে স্কুলে ক্লাস করা খুব কঠিন। এলাকাটি দরিদ্র হওয়ায় শিক্ষার মানও খুবই কম। করোনার সময় স্কুল বন্ধ থাকায় আশপাশের মাদরাসাগুলোতে শিক্ষার্থীরা চলে যায়। পরে তারা আর ফেরেনি।
তিন শিক্ষককে নিতে ১০টি ক্লাস
বোররচর মৃধাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৪ সালে। বিদ্যালয়টির অনুমোদিত শিক্ষক পদ ছয়টি হলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র তিনজন। প্রধান শিক্ষক ও দুইজন সহকারী শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। ২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য হওয়ার পর থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন শাকিলা আক্তার।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছরে শিক্ষার্থী সংখ্যাও কমেছে। ২০১৯ সালে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ২৩২ জন। বর্তমানে রয়েছে ১৬৫ জন।
শাকিলা আক্তার বলেন, তিনজন শিক্ষক দিয়ে পুরো বিদ্যালয় চালাতে হচ্ছে। প্রত্যেক শিক্ষককে প্রতিদিন প্রায় ১০টি ক্লাস নিতে হয়। এতে কাজের চাপ অনেক বেড়ে যায়। এর প্রভাব পাঠদানের মান ও শিক্ষার্থীদের ওপরও পড়ছে।
প্রধান শিক্ষক মিটিংয়ে, বন্ধ স্কুল
মুক্তাগাছা উপজেলার ১১৯ নম্বর গোলাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও শিক্ষক সংকট প্রকট। গত ৩০ জুলাই বিকেল সোয়া ৩টার দিকে বিদ্যালয়ে গিয়ে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। অথচ বিদ্যালয় ছুটি হওয়ার কথা সোয়া ৪টায়।
শিক্ষা বিভাগের নথি অনুযায়ী, বিদ্যালয়টিতে অনুমোদিত শিক্ষকের পদ ছয়টি। কর্মরত আছেন মাত্র দুইজন। ২০১৮ সালে প্রধান শিক্ষক বদলি হওয়ার পর থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন আইয়ুব আলী।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক উপজেলায় মিটিংয়ে যাওয়ায় বিকেল ৩টার দিকে বিদ্যালয় ছুটি হয়ে যায়।
চলতি বছর বিদ্যালয়টিতে ১৫২ জন শিক্ষার্থী থাকার কথা জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আইয়ুব আলী। তিনি জানান, শিক্ষক সংকট থাকায় পরিস্থিতি সামলাতে সমস্যা হচ্ছে। পাঠদানের পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজও করতে হয় তাকে। উপজেলায় কোনো মিটিংয়ে গেলে স্কুল চালাতেও সমস্যা হয়।
সাত পদের বিপরীতে চার শিক্ষক
৩০ জুলাই বিকেল ৩টা ৩৫ মিনিটের দিকে বিন্নকুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়েও শিক্ষক সংকটের চিত্র দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের ছুটি দিয়ে বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন শিক্ষকরা। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোদ্দাছেরুল হক তখন উপজেলায় মিটিংয়ে ছিলেন। বিদ্যালয়টিতে সাতজন শিক্ষকের স্থলে কর্মরত আছেন মাত্র চারজন।
সহকারী শিক্ষক নুসরাত আহমেদ বলেন, প্রধান শিক্ষক না থাকায় তাদের নানামুখী সমস্যা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। প্রধান শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।
এক মাসের মধ্যে সংকট কমার আশা
ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, জেলায় কিছু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে। তবে সরকার নতুন শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে পদায়ন সম্পন্ন হলে এ সংকট অনেকটাই দূর হবে।
তিনি বলেন, শিক্ষক সংখ্যার ভারসাম্য আনতে প্রয়োজন অনুযায়ী বদলি ও সংযুক্তির ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
প্রধান শিক্ষক শূন্যপদের বিষয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, পদোন্নতি-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে অনেক বিদ্যালয়ে চলতি দায়িত্বে কার্যক্রম চলছে। গ্রেডেশন তালিকা প্রস্তুতের কাজ শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই নিয়মিত পদোন্নতির মাধ্যমে এসব পদ পূরণ করা হবে।
তবে ততদিন পর্যন্ত জেলার ১ হাজার ২৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের কাঁধেই থাকছে প্রশাসনিক দায়িত্ব ও পাঠদানের বাড়তি চাপ।
সাখাওয়াত সুমন/আরএআর
