মানিকগঞ্জের সিংগাইর পৌরসভায় সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে ধরা পড়ে পৌর রাজস্ব কোষাগরের ফেরত দিয়েছেন পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা ইরানি আক্তার। এ ঘটনায় তাকে শোকজ করা হয়েছে এবং তিন দিনের মধ্যে জবাব চাওয়া হয়েছে। তবে এর আগেও অন্য একটি বিলের কর্মকান্ডে শুধুমাত্র শোকজ করেই তদন্ত শেষ করেছে সাবেক পৌর প্রশাসক কামরুল হাসান।
জানা যায়, জানা গেছে, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে সিংগাইর পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডে নতুন স্থাপনার তালিকা প্রস্তুত এবং বার্ষিক হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণের লক্ষ্যে জরিপ পরিচালনা করা হয়। প্রায় এক মাস ধরে পৌরসভার ২০ থেকে ২২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন। এ কাজে প্রত্যেকের জন্য দৈনিক ৫০০ টাকা করে ভাতা নির্ধারণ করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, জরিপকাজের বিল অনুমোদনের সময় সিংগাইর পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা ইরানি আক্তার, কর নির্ধারক মো. সোলাইমান সিদ্দিকীকে চাপ দিয়ে জোরপূর্বক কারসাজির মাধ্যমে অতিরিক্ত ৬৮ হাজার টাকার বিল সংযুক্ত করেন এবং ওই অর্থ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন। পরে বিষয়টি সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার প্রশাসক খায়রুন্নাহার (পপি) এর নজরে আসে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পর সংশ্লিষ্টদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হলে তারা অতিরিক্ত ৬৮ হাজার টাকার বিল করার বিষয়টি স্বীকার করেন বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসকের নির্দেশে গত ৪ আগস্ট অতিরিক্ত বিলের ৬৮ হাজার টাকা সিংগাইর পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত হিসাবরক্ষক মকুল মিয়ার মাধ্যমে পৌরসভার রাজস্ব কোষাগারে জমা দেওয়া হয়।
অর্থ আত্মসাতের পর ৫৫ হাজার টাকা নেন পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা ইরানি আক্তার, অন্যদিকে কাজের স্বরূপ সাবেক হিসাবরক্ষক আনিসকে দেন ৫ হাজার টাকা এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত হিসাব রক্ষক মুকুলকে দেন ৮৩০০ টাকা। টাকা বাটোয়ার একটি নথী এসেছে এই প্রতিবেদকের হাতে। সেখানে প্রত্যেকের নামের বিপরীতে টাকার পরিমাণসহ তাদের স্বাক্ষর দেখা যায়।
এর আগে, গত বছর (২০২৫) ইরানি আক্তার ও তৎকালীন কম্পিউটার অপারেটর মিলে চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট ফ্রি দেখিয়ে ৫০ টাকা করে তুলে আত্মসাৎ করেন। যার অর্থ একসময় গিয়ে দাঁড়ায় এক লাখ দশ হাজার টাকা। পরবর্তীতে বিষয়টি জানতে চাইলে তৎকালীন পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ কামরুল হাসান টাকাগুলো পৌর রাজস্ব কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং তাকে শোকজ করেন।
আইনে বলা আছে, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ (The Prevention of Corruption Act, 1947) ৫(২) ধারা (দুর্নীতিমূলক অসদাচরণ) অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি অর্থ বা সম্পদ নিজের কিংবা অন্যের লাভের জন্য আত্মসাৎ বা অপচয় করেন, তবে সেটি এই ধারার অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড। এর পাশাপাশি অপরাধের সাথে জড়িত অর্জিত অর্থ বা অবৈধ সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত (Confiscation) করার নির্দেশ দিতে পারে আদালত।
পৌরসভার নিরাপত্তা প্রহরী বলেন, ‘আমরা অ্যাসেসমেন্টের কাজ করছি, আমাগো চুক্তি আছিল ৫০০ করে ট্যাকা দিব। আমরা কাজটা করছি কাজ করার পরে মাঝখানে একটা বিল দিলো। ফাইনাল বিল করছে সেই বিলের সময় ইরানি আক্তার সাইন করে না, সে কইতাছে আমারে ৭০ হাজার ট্যাকা দেওন লাগবো। ৭০ হাজার ৭০ হাজার কইরা কমপক্ষে দুই মাস চলে গেল তাও আমাকে বিল দেয় না। সর্বশেষ চাপ দিয়া ৬৮ হাজার টাকা নেয়। পরে বিলে সাইন দিয়া সবার ট্যাকা দিয়া, অতিরিক্ত ট্যাকা সে নিজের জন্য রাইখা দিছে। এর আগেও জালিয়াতি করে এক লাখ দশ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে ধরা পড়ার পর আবার ফেরত দেয়। এই পৌরসভায় যে দুর্নীতিগুলো হচ্ছে- তার কোনো বিচার নাই।’
নথিতে সাবেক হিসাবরক্ষক আনিসের নামে ৫ হাজার টাকা উল্লেখ থাকলেও তিনি ইতোমধ্যে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া পৌরসভায় বদলি হয়েছেন।
পাঁচ হাজার টাকা গ্রহণ ও অতিরিক্ত বিল এটাচমেন্টের বিষয়ে জানতে চাইলে, হিসাব রক্ষক আনিসুর রহমান বলেন, আমি এই বিল পাস করানোর আগেই বদলি হয়ে চলে এসেছি। আর পাঁচ হাজার টাকা আমাকে সোলাইমান দিয়েছে। তবে আমি নিতে চাইনি, আমি ক্ষুব্ধও হয়েছি তাদের উপর এই কারণে।
অন্যদিকে, ৮৩০০ টাকার প্রসঙ্গে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত হিসাবরক্ষক মুকুল বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। তবে আমি জানি ইরানি বেগম অ্যাসেসমেন্ট এর টাকা নিছে। সেটা প্রশাসক জানার পর আবার ফেরত দিছে। ওই ৮ হাজার টাকার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আর ফাইলে আগেই সাইন করা ছিলো আমার। পরে যখন জানতে পারলাম এরকম, তখন আমরা সবাই জানলাম সে আসলে টাকা নিছে। পরে প্রশাসক তাকে শোকজ করেছে। শোকজ করার পর তিনি টাকা ফেরত দিয়েছেন এইটুকুই জানি আমি।’
তিনি আরও জানান, ঘটনাগুলো তার দায়িত্ব গ্রহণের আগেই ঘটেছে এবং পরে তিনি জানতে পারেন তার নাম ব্যবহার করে এসব জালিয়াতি করা হয়েছে।
কর নির্ধারক মো. সোলাইমান সিদ্দিকী জানান, আমাদের পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা ইরানি আক্তার ৬৮ হাজার টাকা নিজে নিয়েছেন। আগে যে অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিলেন, তাকে দিয়েছে পাঁচ হাজার টাকা। বর্তমান যে অ্যাকাউন্ট্যান্ট আছেন তাকে দিয়েছেন আট হাজার টাকা এবং নিজে রেখেছেন ৫৫ হাজার টাকা। বিষয়টি আমি জানতে পেরে প্রশাসক স্যারের শরণাপন্ন হই। তাকে বিষয়টি বলার পর তিনি নিজে এসে হিসাব দেখলেন সত্যিই গরমিল। পরে উনি নির্দেশ দিয়ে গেলেন তিন কার্য দিবসের ভেতর টাকাগুলো জমা দিয়ে যেতে।
পরে উনি দ্রুত এসে টাকাগুলো জমা দিয়ে গেছেন। অ্যাকাউন্ট্যান্ট এর কাছে জমা ভাউচারগুলো আছে। উনি (ইরানি আক্তার) যে টাকাগুলো নিয়েছেন, রেজিস্ট্রার স্বাক্ষর করে নিয়েছেন। ওই রেজিস্ট্রারটি উনার বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেন, উনার বাসায় নিয়ে যাওয়ার পর রেজিস্ট্রার দেখে, রেখে যেতে বলেন। পরে আমি রেখে আসি। এখন ওনার কাছে রেজিস্ট্রার চাই, উনি বলেন আমার কাছে রেজিস্ট্রার নাই। একেবারে আমার ওপর জুলুম ও চাপ সৃষ্টি করছেন তিনি। তবে আমার কাছে সেই রেজিস্ট্রারের ফটোকপি আছে।
তিনি আরও বলেন, যে কয়জন লেবার আমি খাঁটিয়েছি, তাদের মাস্টাররোল প্রস্তাব করি। পরে বিষয়টি সচিব ম্যাডামের সাথে আলোচনা করি। তখন তিনি আমাকে বলেন, আপনার এখান থেকে আমাকে কিছু টাকা পয়সা দিতে হবে। তখন আমি বললাম, আমি কীভাবে দিব এটা জানি না, আমার যেকজন লেবার খাটছে ওই কয়জনের টাকা দিতে পারব। তারপর উনি বলল ঠিক আছে, একাউন্টসে উনি বলে দিলেন। তার বলে দেওয়ার পর তারা মাস্টার রোল বানাইছে। তারপর উনি অতিরিক্ত ৬৮ হাজার টাকা নিয়েছেন।
এবিষয়ে জানতে পৌরসভায় গিয়ে ইরানি আক্তারকে অফিস টাইমে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘রবিবারে অফিসে আসেন বলব আমি। এখান কি এগুলো বলা যায়? আমি যে ৬৮ হাজার টাকা নিছি, কীভাবে নিছি, আমার কাছে কোনো ইয়ে আছে যে আমি নিতে পারি, তাহলে আমি সবই নিয়ে যেতে পারি। চেক কখনোই আমার নামে হয় না।’এই বলে তিনি লাইন কেটে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এবিষয়ে সাবেক সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক মো. কামরুল হাসান বলেন, এর আগে ইরানি আক্তারকে অর্থ আত্মসাতের দায়ে শোকজ করা হয়েছিল। পরে তিনি আত্মসাৎকৃত টাকা পৌর রাজস্ব কোষাগারে জমা দিয়েছিলেন। আমিতো বদলি হয়ে আসছি, নথি দেখা ছাড়া টাকার হিসাব সঠিকভাবে বলতে পারছি না। তবে এই বিষয়টি সবাই জানে।
বর্তমান সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক খায়রুন্নাহার পপি বলেন, আমাদের পৌরসভার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অ্যাসেসমেন্ট কার্যক্রম চলছিল। তার অংশ হিসেবে অ্যাসেসমেন্ট কার্যক্রম যখন শেষ হয়েছে তখন আমি অ্যাসেসমেন্ট শাখাটা পরিদর্শন করি। পরিদর্শনকালে আমি লেবার বিলের অসংগতি পাই। পরে ওইটা নিয়ে উদঘাটন করে ৬৮ হাজার টাকার একটা গরমিল পাই। পরে দেখা গেল পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মাস্টার রোল দেখিয়ে টাকা তুলে নিয়েছেন। পরে উনাকে বললাম, আপনি টাকা নিয়েছেন টাকাগুলো কোষাগারে জমা দিন। পরে টাকাগুলো কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। এর পরবর্তীতে তাকে শোকজ করা হয়েছে তিন কার্য দিবসের ভেতরে তিনি তার উত্তর দেবেন। পরবর্তীতে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করব। কর্তৃপক্ষ যদি মনে করে তাহলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেবে।
সাইফুল ইসলাম/এসএইচএ
