বিজ্ঞাপন

ভরা মৌসুমেও নদীতে ইলিশের আকাল, জীবিকার সংকটে ভোলার ২ লাখ জেলে

ভরা মৌসুমেও নদীতে ইলিশের আকাল, জীবিকার সংকটে ভোলার ২ লাখ জেলে

আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসকে ধরা হয় ইলিশের ভরা মৌসুম। তাই বহু আশা নিয়ে ভোলার মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশ ধরতে গিয়েছিলেন জেলেরা। কিন্তু কাঙ্খিত ইলিশ না পেয়ে চরম হতাশা নিয়ে তীরে ফিরছেন তারা। এভাবে যতোই দিন যাচ্ছে ততোই বাড়ছে জেলার ২ লক্ষাধিক জেলের ঋণের বোঝা।

অন্যদিকে সরবরাহ কম থাকায় অনেকটা অলস সময় পাড় করছেন নদী-তীরবর্তী মাছঘাটগুলোর আড়তদাররা। এতে নদীর ডুবোচরে ইলিশের গতিপথ বাধাগ্রস্তসহ নানা কারণকেই দুষছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভোলা মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার ২৮৩ জন। এর মধ্যে ভোলা সদর উপজেলায় জেলে রয়েছেন ২২ হাজার ৪১২ জন, দৌলতখানে ২৪ হাজার ৩ জন, বোরহানউদ্দিনে ১৯ হাজার ৮৩৮ জন, তজুমদ্দিনে ১৯ হাজার ৫৭২ জন, লালমোহনে ২৪ হাজার ৮০৬ জন, চরফ্যাশনে ৪৪ হাজার ৩১১ জন ও মনপুরা উপজেলায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন ১৫ হাজার ৩৪১ জন। যারা সরাসরি নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের রুটিরুজি মেঘনা তেঁতুলিয়া নদীতে মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল।

সরেজমিনে সদর উপজেলার মেঘনা নদী-তীরবর্তী ভোলারখাল ও তুলাতুলির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদী-তীরবর্তী এলাকার জেলে ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নিরব দীর্ঘশ্বাস আর হা-হুতাশ। কারো মুখে নেই হাসি। অনেক জেলে নদীতে গিয়ে কাঙ্খিত ইলিশ না পেয়ে তীরে ফিরে আর নদীতে যাচ্ছেন না। অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও দিনের পর দিন প্রতি ট্রিপে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জাল-ট্রলার নিরাপদ স্থানে উঠিয়ে রেখেছেন অনেক জেলে। এতে যেন নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দশা ভোলার জেলেদের। এ ছাড়া সরবরাহ কম থাকায় আড়রতগুলোতেও নেই ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাক। 

নদীতে জেলেদের জালে কাঙ্খিত ইলিশ ধরা না পড়ার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় ছোট-বড় মাছের আড়ত ও খুচরা মাছ বিক্রির বাজারগুলোতে। এক কেজি ওজনের প্রতিটি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ২০০ টাকা, ৮-৯০০ গ্রাম ওজনের ২৬-২৭০০ টাকা, আর ৭৫০ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২৪৫০ টাকায় প্রতিকেজি। 

জেলে মো. নুরউদ্দিন, বশির ও ইলিয়াস ঢাকা পোস্টকে  বলেন, আষাঢ় ও শ্রাবণ হইলো নদীতে ইলিশের ভরা মৌসুম। নদীতে মাছ ধইরাই সংসার ও ঋণের কিস্তিসহ সবকিছু ভালো চালাতাম। বছরের অন্যান্য মাসে আশানুরূপ ইলিশ না পেলেও গত ৫-৬ বছর আগেও এ সময়ে আমরা নদীতে গিয়ে কিছুটা হলেও আশানুরূপ ইলিশ পেতাম। একই নদী, একই জাল কিন্তু ইলিশ তো নাই। একেকবার নদীতে গেলে ট্রলারের জ্বালানি তেলসহ অন্তত ২-৩ হাজার টাকা টাকা খরচ হয়, বিপরীতে মাছ পাই ৩-৪ হাজার টাকার, এতে দেখা যায় প্র‍তি ট্রিপে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা করে দেন হইতেছি।’

জেলেরা বলেন, ‘এভাবে আর সম্ভব না, ঋণের বোঝা ভারী হচ্ছে দিনে দিনে। তারপরও গত এক মাস ধরে দু-এক দিন পরপর নদীতে মাছ ধরতে গিয়েও হতাশা নিয়ে ফিরতে হচ্ছে। ট্রলারের প্রতিজন জেলের সংসারে ৫-১০ পর্যন্ত সদস্য আছে,তা ছাড়া প্রত্যেকের দেনা তো আছেই। তবে বঙ্গোপসাগর মোহনার পর থেকে অর্থাৎ সাগরের দিকে গেলে কাঙ্খিত ইলিশ জালে ধরা পড়লেও ট্রলার ছোট হওয়ায় আমরা সেখানে গিয়ে ইলিশ ধরতে পারি না।’ 

তারা আরও বলেন, ‘নদীতে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে সরকার আমাদেরকে চাল দেয়। কিন্তু এখন যে আমাদের দুর্দশা চলছে সে খবর কেউই নেয় না। সরকারের কাছে আমরা সহযোগিতা চাই, নাহলে এ পেশায় টিকে থাকতে পারবো না।’

মাঝি মো. মাহাবুব, আলাউদ্দিন, কামাল ও জুয়েল বলেন, ‘অনেক আশায় লাখ লাখ টাকার জাল-ট্রলার নিয়ে নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে হতাশা নিয়ে তীরে ফিরতে হয় আমাদের। আগে নদীতে একবার জাল ফেললে যে পরিমাণে ইলিশসহ অন্যান্য মাছ পেতাম এখন ৪-৫ বার নদীতে জাল ফেললেও সে পরিমাণে ইলিশ মাছ পাই না। অন্যদিকে খরচও বাড়েছে। ধারদেনা করে জাল-ট্রলার করেছি, কিন্তু দেনা শোধ দিতে পারছি না। কী করবো বুঝতেছি না। কাঙ্খিত মাছ না পেয়ে অনেকেই নদীতে মাছ ধর‍া বাদ দিয়ে বিকল্প কাজের খোঁজে ঢাকা-চট্রগ্রাম চলে যাচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে আমাদেরকেও তাদের পথ ধরতে হবে।’

আড়তদার আব্দুল খালেক মেম্বার ও মো. আলমগীর বলেন, ‘নদীর এরকম পরিস্থিতি গত ৪-৫ বছরের মধ্যেও দেখিনি, মাছ কম ধরা পড়লেও এতটা কম পড়েনি। এ পরিস্থিতিতে বর্তমানে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা-মাওয়াসহ দেশের বিভিন্ন মোকাম থেকে দাদন এনে জেলেদেরকে দিয়েছি, কিন্তু জেলেরা আড়তে কাঙ্খিত পরিমানে ইলিশ আনতে পারে না, আমরাও মোকামে পাঠাতে পারছি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘মাছের দাম বেশি, তবে দাম বেশি হলেও লাভ নাই, কারণ সরবরাহ খুবই কম। জেলেদের পরিস্থিতি দেখে তাদেরকেও দাদনের টাকা শোধ করার চাপ দিতে পারছি না, মোকামে তো বোঝে না। কবে নাগাদ জেলেদের জালে কাঙ্খিত ইলিশ ধরা পড়বে আর আমাদের ব্যবসা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে তাও জানি না, আমরা খুবই হতাশ।’ 

এ বিষয়ে ভোলার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হুসাইন ঢাকা পোস্টকে বলেন, আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে সব মৌসুমে নদীতে ইলিশের চিত্র এক থাকে না, কমবেশি হয়। আর কিছুদিন না গেলে বোঝা যাবে না আসল চিত্রটা। ধারণা করা হচ্ছে, ডুবোচরের কারণে ইলিশের গতিপথে পরিবর্তন হচ্ছে, রয়েছে নদী দূষণ, অবৈধ জালের প্রভাব ও জাটকা-মা ইলিশ নিধন, এসব কারণে হয়তো ভরা মৌসুমেও জেলেরা ভোলার মেঘনা-তেতুলিয়া নদীতে গিয়ে কাঙ্খিত ইলিশ পাচ্ছেন না। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো।

দেশে ইলিশের মোট ছয়টি অভয়াশ্রম রয়েছে। এরমধ্যে দুটি হচ্ছে ভোলার মেঘনা-তেতুঁলিয়ার ১৯০ কিলোমিটার এলাকা। মেঘনা নদীর ইলিশা থেকে চরপিয়াল পর্যন্ত ৯০ কিলোমিটার ও তেঁতুলিয়া নদীর ভেদুরিয়া থেকে চর রুস্তম পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার।

মো. খাইরুল ইসলাম/এএমকে