চণ্ডিপাশা চরপাড়া গ্রামের মাঠজুড়ে এখন সবুজের সমারোহ। মাচায় মাচায় ঝুলছে শিম। ভোর হলেই কৃষকেরা জমিতে নেমে পড়েন। কেউ শিম তোলেন, কেউ ব্যস্ত বাছাই ও বাজারজাত করার কাজে। কারণ বাজারে যখন সিমের সরবরাহ তুলনামূলক কম, তখন আগাম উৎপাদনের কারণে ভালো দামও পাচ্ছেন তারা।
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার চণ্ডিপাশা ইউনিয়নের চণ্ডিপাশা চরপাড়া গ্রামের কৃষকদের কাছে আগাম শিম এখন শুধু একটি সবজি নয়, বাড়তি আয়ের অন্যতম পথ। অল্প জমিতে তুলনামূলক কম খরচে চাষ করে কয়েক গুণ বেশি আয় করার সুযোগ থাকায় দিন দিন বাড়ছে আগাম শিম চাষ।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আট থেকে দশ বছর আগে এ গ্রামে আগাম জাতের শিম চাষ শুরু হয়। প্রথম দিকে কয়েকজন কৃষক পাবনা থেকে বীজ এনে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করেন। ফলন ও লাভ ভালো হওয়ায় তাদের সাফল্য দেখে অন্যরাও আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এখন গ্রামের অনেক কৃষকই আগাম শিম চাষ করছেন। কেউ কেউ নিজেরাই বীজ সংরক্ষণ করে পরের বছর জমিতে ব্যবহার করছেন।
কৃষক গিয়াস উদ্দিন এবার ২০ শতক জমিতে আগাম শিম চাষ করেছেন। তার হিসাব অনুযায়ী, চাষে খরচ হয়েছে প্রায় ছয় হাজার টাকা। ইতোমধ্যে তিনি ৩০ হাজার টাকার শিম বিক্রি করেছেন। জমিতে আরও প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার শিম বিক্রি করতে পারবেন বলে তার আশা। অর্থাৎ পুরো হিসাব মিললে ২০ শতক জমি থেকে তার মোট বিক্রি দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। খরচ বাদ দিলে লাভের পরিমাণও দাঁড়াবে উল্লেখযোগ্য অঙ্কে।
গিয়াস উদ্দিন বলেন, গত সাত বছর ধরে তিনি আগাম জাতের শিম চাষ করছেন। প্রতি বছরই ভালো ফলন ও দাম পাওয়া যায়। এ কারণে এখন তিনি নিয়মিত এ জাতের শিম চাষ করেন।
গিয়াস উদ্দিনের পাশের জমিতেই আগাম শিম চাষ করেছেন ফারুক মিয়া। ৩৫ শতক জমিতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। এরই মধ্যে তিনি ৩০ হাজার টাকার শিম বিক্রি করেছেন। জমিতে আরও প্রায় দুই লাখ টাকার শিম বিক্রি হবে বলে আশা করছেন তিনি।
ফারুক মিয়া জানান, প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি আগাম শিম চাষ করছেন। আগাম শিম বাজারে তুলতে পারলে দাম ভালো পাওয়া যায়। তাই অন্য ফসলের তুলনায় এ চাষে লাভের সম্ভাবনা বেশি। শুধু গিয়াস উদ্দিন ও ফারুক মিয়া নন, একই গ্রামের কৃষক ফয়সাল মিয়াও ২৬ শতক জমিতে আগাম শিম চাষ করে কয়েক গুণ লাভের স্বপ্ন দেখছেন। তাদের সাফল্য দেখে গ্রামের আরও অনেক কৃষক এ চাষে যুক্ত হয়েছেন।

আগাম শিম চাষের শুরুটাও ছিল একেবারে স্থানীয় কৃষকদের উদ্যোগে। প্রথম দিকে পাবনা থেকে বীজ এনে চাষ করতেন তারা। পরে চাষের অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের জমির ভালো শিম থেকে বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ শুরু করেন। এখন অনেক কৃষকই নিজেদের সংরক্ষিত বীজ দিয়ে চাষ করছেন।
কৃষকদের ভাষ্য, এতে একদিকে বীজ কেনার খরচ কমেছে, অন্যদিকে এলাকার মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খেয়ে যাওয়া বীজ ব্যবহার করায় তাঁরা ভালো ফলনও পাচ্ছেন।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও চণ্ডিপাশা ব্লকের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্লক সুপারভাইজার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চণ্ডিপাশা এলাকার মাটি গ্রীষ্মকালীন আগাম শিম চাষের জন্য খুবই উপযোগী। বর্তমানে বাজারে শিমের চাহিদা বেশি থাকায় কৃষকেরা ভালো দাম পাচ্ছেন। উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে সবজি প্রণোদনা, রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে কিভাবে ফসলকে রক্ষা করবে সে
বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি আগাম সবজি চাষ কৃষকের আয় বাড়ানোর একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। বিশেষ করে বাজারে যখন কোনো সবজির সরবরাহ কম থাকে, তখন আগাম উৎপাদিত সবজি কৃষককে তুলনামূলক ভালো দাম এনে দেয়।
চণ্ডিপাশা চরপাড়ার মাঠে এখন সেই হিসাবই যেন দৃশ্যমান। কয়েকজন কৃষকের হাত ধরে শুরু হওয়া আগাম শিম চাষ ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামজুড়ে।
সাখাওয়াত হোসেন হৃদয়/আরকে
