বিজ্ঞাপন

সাত বছরে সর্বনিম্ন, রাজশাহী বোর্ডে এসএসসির ফলে বড় ধস

সাত বছরে সর্বনিম্ন, রাজশাহী বোর্ডে এসএসসির ফলে বড় ধস

সাত বছরের সর্বনিম্ন এসএসসির ফলাফল রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে। ২০২০ সালে যেখানে পাসের হার ছিল ৯০ দশমিক ৩৭ শতাংশ, সেখানে ২০২৬ সালে নেমে দাঁড়িয়েছে ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে। শতাংশের হিসাবে ২০২০ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে পাসের হার কমেছে প্রায় ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ।

রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের সাত বছরের তুলনামূলক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের পাসের হার শুধু গত বছরের তুলনায়ই কমেনি, বরং এই সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২৫ সালে পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানেই কমেছে ১৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

পাসের হারে ওঠানামা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বড় পতন

বোর্ডের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ সালে পাসের হার ছিল ৯০ দশমিক ৩৭ শতাংশ।  করোনাকালীন ২০২১ সালে এটি বেড়ে সর্বোচ্চ ৯৪ দশমিক ৭১ শতাংশ হয়। এরপর ২০২২ সালে নেমে আসে ৮৫ দশমিক ৮৮ শতাংশে। ২০২৩ সালে সামান্য বেড়ে ৮৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ, ২০২৪ সালে আরও বেড়ে ৮৯ দশমিক ২৬ শতাংশ হয়। কিন্তু ২০২৫ সালে বড় ধাক্কায় তা নেমে আসে ৭৭ দশমিক ৬৩ শতাংশে। আর সবশেষ ২০২৬ সালে ১৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে।

অর্থাৎ পাসের হার প্রতিবছর ধারাবাহিকভাবে কমেনি; মাঝখানে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। তবে ২০২০ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত সাত বছরের সামগ্রিক হিসাবে প্রবণতাটি স্পষ্টতই নিম্নমুখী।

পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে, তবে ফলের পতন আরও বেশি

২০২০ সালে রাজশাহী বোর্ডে পরীক্ষার্থী ছিল ২ লাখ ২ হাজার ২২৯ জন। ২০২৬ সালে সেই সংখ্যা কমে হয়েছে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯৫২ জন। অর্থাৎ পরীক্ষার্থী কমেছে ২৩ হাজার ২৭৭ জন।

অন্যদিকে পাসের সংখ্যা ২০২০ সালে ছিল ১ লাখ ৮০ হাজার ৯০২ জন। ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে মাত্র ১ লাখ ১২ হাজার ৮৬ জনে। অর্থাৎ ছয় বছরের ব্যবধানে পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৬৮ হাজার ৮১৬ জন।

২০২৬ সালে পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিল ২ হাজার ৯০৮ জন। ২০২৫ সালে অনুপস্থিত ছিল ২ হাজার ৪৮২ জন, ২০২৪ সালে ১ হাজার ৯২৪ জন, ২০২৩ সালে ২ হাজার ৭০৫ জন, ২০২২ সালে ২ হাজার ২১০ জন, ২০২১ সালে ২ হাজার ৪৮৩ জন এবং ২০২০ সালে ১ হাজার ৪৪ জন।

মেয়েদের পাসের হারও কমলেও ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে

মেয়েদের ফলাফলেও সাত বছরে উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে। ২০২০ সালে মেয়েদের পাসের হার ছিল ৯১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ২০২১ সালে তা বেড়ে ৯৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ হলেও ২০২২ সালে ৮৬ দশমিক ১৭ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৯০ দশমিক ০৮ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৯১ দশমিক ৯০ শতাংশ, ২০২৫ সালে ৮২ দশমিক ০১ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে নেমে দাঁড়িয়েছে ৭০ দশমিক ৭৩ শতাংশে।

অন্যদিকে, ছেলেদের পাসের হার ২০২০ সালে ছিল ৮৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ, ২০২১ সালে ৯৪ দশমিক ০৪ শতাংশ, ২০২২ সালে ৮৫ দশমিক ৬২ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৮৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৮৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ, ২০২৫ সালে ৭২ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে মাত্র ৫৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

অর্থাৎ ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে মেয়েদের পাসের হার কমেছে ২১ দশমিক ১২ শতাংশ, আর ছেলেদের কমেছে ৩২ দশমিক ০৪ শতাংশ। চলতি বছরও মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে ১৩ দশমিক ৪০ শতাংশ এগিয়ে।

জিপিএ-৫- প্রাপ্তিতে বড় পতন

পাসের হারের পাশাপাশি জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২০ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ২৬ হাজার ৬৪৭ জন। ২০২১ সালে এই সংখ্যা বেড়ে ২৭ হাজার ৯০৯, ২০২২ সালে ৪২ হাজার ৫১৭, ২০২৩ সালে ২৬ হাজার ৮৭৭, ২০২৪ সালে ২৮ হাজার ৭৪, ২০২৫ সালে ২২ হাজার ৩২৭ এবং ২০২৬ সালে মাত্র ১৬ হাজার ১১৩ জন।

অর্থাৎ ২০২০ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী কমেছে ১০ হাজার ৫৩৪ জন। যা প্রায় ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ কম। চলতি বছর জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রী ৮ হাজার ৯৯১ জন এবং ছাত্র ৭ হাজার ১২২ জন।

শতভাগ পাস করা স্কুলও কমেছে ব্যাপকভাবে

বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে ৩০৮টি বিদ্যালয় থেকে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছিল। ২০২১ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩৯৮টি, ২০২২ সালে ১৪৭টি, ২০২৩ সালে ১৭৮টি, ২০২৪ সালে ২৮৯টি, ২০২৫ সালে ৯৯টি এবং সবশেষ ২০২৬ সালে ছিল মাত্র ৩৫টি।

অন্যদিকে, কোনো শিক্ষার্থী পাস না করা বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২০২০ ও ২০২১ সালে ছিল শূন্য। ২০২২ সালে ২টি, ২০২৩ সালে ১টি, ২০২৪ সালে ২টি, ২০২৫ সালে শূন্য এবং সবশেষ ২০২৬ সালে ৫টি বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি। শূন্য থেকে ১০ শতাংশ ফল করা বিদ্যালয়ও ২০২৬ সালে বেড়ে ১১টিতে দাঁড়িয়েছে। এর আগের বছরগুলোতে এই সংখ্যা ছিল শূন্য।

নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের হিসাবেও একই চিত্র

বোর্ডের পরিসংখ্যানে নিয়মিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৬ সালে নিয়মিত পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৪৫ জন। উপস্থিত ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৭০৫ জন এবং অনুপস্থিত ছিল ১ হাজার ৮৪০ জন। নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের মধ্যে পাস করেছে ৯৫ হাজার ১১৭ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬ হাজার ৪৭ জন।

২০২৫ সালে নিয়মিত পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার ৯২৮ জন, উপস্থিত ১ লাখ ৬৬ হাজার ১৩১, অনুপস্থিত ১ হাজার ৭৯৭ এবং পাস করেছে ১ লাখ ২৭ হাজার ২২৪ জন; জিপিএ-৫ পেয়েছে ২২ হাজার ২০৮ জন। ২০২৪ সালে নিয়মিত পরীক্ষার্থী ১ লাখ ৯৮ হাজার ২৮০, উপস্থিত ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫০, অনুপস্থিত ১ হাজার ২৩০, পাস ১ লাখ ৫৯ হাজার ৩৩ এবং জিপিএ-৫ ২৭ হাজার ৯৮০। ২০২৩ সালে নিয়মিত পরীক্ষার্থী ১ লাখ ৮১ হাজার ২৫৬, উপস্থিত ১ লাখ ৭৯ হাজার ৪৯১, অনুপস্থিত ১ হাজার ৭৬৫, পাস ১ লাখ ৫৭ হাজার ৯৮৮ এবং জিপিএ-৫ ২৬ হাজার ৮১২।

২০২২ সালে নিয়মিত পরীক্ষার্থী ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮৩৬, উপস্থিত ১ লাখ ৮৫ হাজার ৬৯, অনুপস্থিত ১ হাজার ৭৬৭, পাস ১ লাখ ৫৮ হাজার ৪৬৩ এবং জিপিএ-৫ ৪২ হাজার ২৭৫। ২০২১ সালে নিয়মিত পরীক্ষার্থী ১ লাখ ৮৮ হাজার ৫১০, উপস্থিত ১ লাখ ৮৬ হাজার ৫০৯, অনুপস্থিত ২ হাজার ১, পাস ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৯০ এবং জিপিএ-৫ ২৭ হাজার ৮৯১। ২০২০ সালে নিয়মিত পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৮৩ হাজার ৯৬৬, উপস্থিত ১ লাখ ৮৩ হাজার ২৯৭, অনুপস্থিত ৬৬৯, পাস ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬১৭ এবং জিপিএ-৫ ২৬ হাজার ৭৪।

বড় প্রশ্ন উঠছে ফলের ধারাবাহিক অবনতি নিয়ে

সব মিলিয়ে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের সাত বছরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে পরীক্ষার্থী কিছুটা কমলেও পাসের সংখ্যা ও পাসের হার কমেছে অনেক বেশি। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী কমেছে, শতভাগ পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যা কমেছে এবং কোনো শিক্ষার্থী পাস না করা বিদ্যালয়ের সংখ্যাও বেড়েছে।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৮৯ দশমিক ২৬ শতাংশ থেকে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ২০২৬ সালে পাসের হার ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে নেমে আসা রাজশাহী বোর্ডের এসএসসি ফলাফলের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা। ২০২৫ সালে সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ফলের যে রেকর্ড তৈরি হয়েছিল, এক বছর পরই তা আরও নিচে নেমেছে। ২০২৬ সালের ফলাফলকে তাই শুধু এক বছরের ফল বিপর্যয় নয়, বরং ২০২০-২০২৬ সময়কালের সামগ্রিক ফলাফলের নিম্নমুখী প্রবণতার সবচেয়ে স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ইফরাত জেরিন বলেন, বর্তমান সরকার যেটা চাচ্ছেন, কোয়ালিটি এডুকেশন, কোয়ান্টিটেটিভ না। কোয়ালিটেটিভ এডুকেশনতো দেখতে গেলে আসলে আমরা এইদিকের সংখ্যার দিকে বেশি নজর দেই। তাহলে কোয়ালিটি আসাটা একটু কঠিন হতে পারে। সেই কারণেই সরকার চাচ্ছেন আমরা কোয়ালিটির দিকে নজর দেই।

শাহিনুল আশিক/এসএইচএ